কাঁধ থেকে পালকি নামিয়ে রাখলেন বেয়ারারা, কলকাতা দেখল প্রথম ধর্মঘট

২০০ বছর আগে কলকাতায় দশ হাজারেরও বেশি পালকি বাহক ছিলেন

“পালকি চলে/ পালকি চলে/ গগন তলে/ আগুন জ্বলে/ স্তব্ধ গাঁয়ে/ আদুল গায়ে/ যাচ্ছে কারা/ রোদ্র সারা…।”

লকাতার পরিবহণ (Transport of Kolkata) তখন পালকির কাঁধে ভর করে চলত। হঠাৎ একদিন থেমে গেল এই ছন্দবদ্ধ ধ্বনি। কাঁধ থেকে পালকি নামিয়ে রাখল বেয়ারার দল। দিনটা ১৮২৭ সালের ২৪ অগাস্ট। ২০০ বছর আগে এই দিনে হরতাল ডেকেছিলেন পালকি (Palanquin) বাহকরা। কলকাতা দেখল প্রথম ধর্মঘট।

ধর্মঘট (Strike) শব্দের সঙ্গে কলকাতাবাসীর সম্পর্ক নিবিড়। কলকাতায় একটা সময় ধর্মঘট ছিল রুটিন রাজনৈতিক কর্মসূচি। কিছুদিন আগেও কলকাতার বাতাসে কান পাতলে শোনা যেত- “চাকা ঘুরবে না, চিতা জ্বলবে না, ধোঁয়া উঠবে না,/ আজ হরতাল, আজ চাকা বনধ!”

ইদানীং তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। কিন্তু পাঁচ-ছয়ের দশকে খাদ্য আন্দোলন, সাতের দশকের উত্তাল বাংলা, তারপর বাম জমানায় একাধিক ইস্যুতে হরতাল-ধর্মঘট কিংবা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম (Singur-Nandigram) পর্ব—বাংলা বনধ শব্দবন্ধ আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল।

তখন যাতায়াত বলতে মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল পালকি। কলকাতায় তখন ১০ হাজারের বেশি পালকি বাহক বা বেয়ারা ছিলেন। যাঁরা কাঁধে করে পালকি নিয়ে ছুটে বেড়াতেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। হঠাৎই একদিন পালকিবাহকরা সমস্বরে বলে ওঠেন, পালকি চলবে না।

কিন্তু এই ধর্মঘটের শুরু কবে বাংলায়? কারা করেছিলেন? কী হয়েছিল? সেই ইতিহাস জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় ২০০ বছর। ১৮২৭ সালের ২৪ অগাস্ট। তখন যাতায়াত বলতে মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল পালকি। কলকাতায় তখন ১০ হাজারের বেশি পালকি বাহক বা বেয়ারা ছিলেন। যাঁরা কাঁধে করে পালকি নিয়ে ছুটে বেড়াতেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। হঠাৎই একদিন পালকিবাহকরা সমস্বরে বলে ওঠেন, পালকি চলবে না।

এই কাহিনি পুরোনো কলকাতার (Kolkata), যখন কলকাতায় আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ছিল জনবসতির। দলে দলে জাহাজে করে ব্রিটিশ সাহেব-মেমরা এসে নোঙর ফেলছিলেন চাঁদপাল ঘাটে। সেই সময় কলকাতার বেশ কিছু অঞ্চল ছিল জঙ্গলে ভর্তি। বিশেষ করে দক্ষিণ মধ্য ও উত্তর কলকাতা বিস্তৃত ছিল এই জঙ্গল। এতে ভর্তি ছিল খুনে ডাকাত ও বন্য জন্তু। লাল পাগড়ি মাথায় বেঁধে, লাল তিলক কপালে এঁকে হাতে লাঠি ও বল্লম নিয়ে এই ডাকাতদের দল সাধারণ মানুষের পথ আটকে দাঁড়াত। চলত লুঠপাঠ, এমনকি খুন করা হত মানুষকে। আজ ইতিহাসের দায় মিটিয়ে হারিয়ে গেছে পালকি, তবে রয়ে গেছে সাহিত্যের পাতায়।

“এমন সময় ‘হাঁরে রে রে রে রে’
ঐ যে কারা আসতেছে ডাক ছেড়ে।
তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে
ঠাকুর দেবতা স্মরণ করছ মনে,
বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে
পালকি ছেড়ে কাঁপছে থরোথরো।”

রবীন্দ্রনাথের ‘বীরপুরুষ’ (Birpurush) কবিতায় এভাবেই পালকির ওপর ডাকাতের আক্রমণের বর্ণনা পাওয়া যায়। ব্রিটিশদের সময়কার এই কলকাতায় কালীঘাট ছিল এক পুন্যস্থান। কিন্তু উত্তর কলকাতায় বসবাসকারী সাহেব- মেমদের কালীঘাট অঞ্চলে যেতে হলে পার করতে হত চৌরঙ্গির অঞ্চলে থাকা এক বিশাল জঙ্গল। সেই সময় কলকাতার বুকে চৌরঙ্গি বলে কোনো জায়গা ছিল না। যাতায়াতের অন্যতম বাহন ছিল পালকি। কিন্তু খুনে ডাকাতদের ভয়ে জঙ্গলের পথ মাড়াতে চাইতেন না পালকি বেয়ারারা। যদিও বা তাঁরা এই পথে পালকি নিয়ে যেতেন তাহলে বিশাল অর্থ দাবি করতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজের জন্য সাহেবদের প্রায়শই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কালীঘাটে যেতে হত। কিন্তু পালকি বেয়ারারা অত্যধিক ভাড়া দাবি করায় সাহেবরা ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন।

ব্রিটিশদের সময়কার এই কলকাতায় কালীঘাট ছিল এক পুন্যস্থান। কিন্তু উত্তর কলকাতায় বসবাসকারী সাহেব- মেমদের কালীঘাট অঞ্চলে যেতে হলে পার করতে হত চৌরঙ্গির অঞ্চলে থাকা এক বিশাল জঙ্গল। সেই সময় কলকাতার বুকে চৌরঙ্গি বলে কোনো জায়গা ছিল না। যাতায়াতের অন্যতম বাহন ছিল পালকি।

পালকি বেয়ারাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে কোম্পানি এক নিয়ম লাগু করে। কোম্পানি জানিয়ে দেয় পালকি বইতে গেলে বেয়ারাদের নিতে হবে লাইসেন্স, হাতে পরতে হবে কোম্পানির নম্বর দেওয়া ব্যাজ। যাতায়াতের মাশুল হবে ঘণ্টা পিছু। কোম্পানির ফতোয়া মানতে রাজি ছিলেন না বেয়ারারা। তাঁরা মনে করছিলেন হাতে ব্যাজ পরা মানে জাত খোয়ানো। এর ফলে তাঁরা সমাজে ব্রাত্য হয়ে যাবেন বলে আশঙ্কা করেছিলেন। উপরন্তু ব্যাজের জন্য কোম্পানিকে কোনও অর্থ দিতেও রাজি ছিলেন না পালকি বেয়ারারা। সেদিন কোম্পানির লাল চোখকে চ্যালেঞ্জ করলেন তাঁরা।

পালকি বেয়ারারা একসঙ্গে পালকি বওয়া বন্ধ করে দেন। পালকি না পেয়ে বিপাকে পড়েন সাহেবরা, পরিস্হিতি মোকাবিলায় তৎপর হয় কোম্পানি। ইতিমধ্যে কলকাতার ময়দানে মিটিং করে প্রায় ১২,০০০ পালকি বেয়ারা। তাঁরা মিটিং করে দল বেঁধে হাজির হন ম্যাজিস্ট্রেটের দরবারে। সব কথা শুনে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যাজের দাম মকুব করে দেন। ১৮২৭ সালের এই ঘটনা কলকাতা শহরের প্রথম এই ধর্মঘট নিয়ে তর্কের অন্ত নেই। পালকি ধর্মঘট ওঠার পেছনে চমকপ্রদ কাহিনি রয়েছে। এই সময় কলকাতার পালকি বেয়ারাদের অধিকাংশ ছিল ওড়িয়া। ধর্মঘটে যে পালকি বেয়ারারা গিয়েছিলেন তাঁরা সকলেই ছিলেন ওড়িয়া। এই ধর্মঘটের সুযোগ নিয়ে কলকাতায় প্রবেশ ঘটে বিহারের হিন্দুস্হানি রাউনিদের। এঁরা এসে ওড়িয়া বেয়ারাদের না ছোঁয়া পালকি চওড়া কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। শেষে অচলাবস্থা কাটাতে উদ্যোগী হয়েছিলেন ব্রাউনলো নামে এক ইউরোপীয়। শহরে পরিত্যক্ত জুড়িগাড়ির চাকার অভাব ছিল না। সেখান থেকে চাকা নিয়ে সাহেব বসালেন নিজের পালকিতে। বেয়ারার বদলে সেই চাকা লাগানো পালকি টেনে নিয়ে যেত আরবি ঘোড়া। সেই দেখে অনেক সাহেবরাই এই বন্দোবস্ত শুরু করেন। শহরজুড়ে ছেয়ে যেতে থাকে ওই গাড়ি।

পরে অবশ্য পালকি বাহকেরা তাঁদের ধর্মঘট তুলে নিয়েছিলেন। ফের কলকাতা সচল হয়েছিল। তবে সেটাই ছিল কলকাতার প্রথম ধর্মঘট। থমকে গিয়েছিল কলকাতা। কলকাতায় ফের সরগরম হয়েছিল পালকি বেয়ারাদের ডাক। এক ঘুমন্ত শহর থেকে ফের যেন জেগে উঠেছিল সেদিনকার কলকাতা।

পালকি বেয়ারারা একসঙ্গে পালকি বওয়া বন্ধ করে দেন। পালকি না পেয়ে বিপাকে পড়েন সাহেবরা, পরিস্হিতি মোকাবিলায় তৎপর হয় কোম্পানি। ইতিমধ্যে কলকাতার ময়দানে মিটিং করে প্রায় ১২,০০০ পালকি বেয়ারা। তাঁরা মিটিং করে দল বেঁধে হাজির হন ম্যাজিস্ট্রেটের দরবারে।

আজ সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে পরিবহণ। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় যেমন পালকি বাহকদের কোম্পানিকে চ্যালেঞ্জ করার কথা রয়ে গিয়েছে, তেমনি বেয়ারাদের হুনহুনা এখনও খুঁজে পাওয়া যায় সাহিত্য, সিনেমায়। সত্যজিতের সিনেমায় স্বমহিমায় ঠাঁই পেয়েছে পালকি। তিনি ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবির চিত্রনাট্যে পালকির কথা উল্লেখ করেছিলেন। চিত্রনাট্যের ভাষায়, “দূর থেকে ওস্তাদি গানের শব্দ ভেসে আসে। দুজনের দৃষ্টি ঘুরে যায় সেই দিকে। পালকি চেপে ওস্তাদ গাইতে গাইতে চলেছেন। তাঁর সঙ্গে বাজিয়ের দল এবং অন্যান্যরা মিছিল করে চলেছেন। মিছিল গুপী-বাঘার সামনে দিয়ে চলে যায়।”

পৃথিবী বদলে গেছে, রাজাদের রাজত্ব গেছে, গেছে জমিদারের জমিদারিও। যানবাহনে এসেছে বিবর্তন। রেলগাড়ি, মোটরগাড়ি, রিকশা ইত্যাদি কত রকমের যানবাহন গ্রাম-শহরের পথে পথে। এসব যানবাহনে ধনী-গরিব সবাই চলাচল করতে পারেন। ইতিহাসের দায় মিটিয়ে তাই হারিয়ে গেছে পালকি। শেষ হয়েছে কাহারদের রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা কষ্টের জীবন। পালকির স্থান এখন ইতিহাসের পাতায়, সিনেমার পর্দায় আর জাদুঘরে। বেয়ারাদের হরতাল কলকাতার ইতিকথায় যোগ করে রেখেছে এক প্রতিস্পর্ধী আখ্যান।

____

তথ্যসূত্রঃ
আনন্দবাজার পত্রিকা
Historical Leftovers – WordPress.com

Post Tags
Developed by DXDasia