শান্তিনিকেতনে মনন ও শিল্পচর্চার এক নতুন পরিসর

বিনোদবিহারী মুখার্জি আর্কাইভস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার

বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়

মেলাবেন তিনি মেলাবেন

শিল্পচর্চায় গবেষণার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ কলা ভবন প্রতিষ্ঠার সূচনা লগ্নেই তা অনুধাবন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেকারণেই প্রবাসে থাকাকালীন ভিয়েনার শিল্প ঐতিহাসিক স্টেলা ক্রামরিশের বক্তৃতা শুনে তাঁকে শান্তিনিকেতনে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উন্মত্ত পৃথিবীতে চূড়ান্ত আর্থিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি গবেষণার কাজ শেষ করেছিলেন স্টেলা। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতীয় শিল্প সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনা করেছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, আর সেখানেই আসে প্রথম অ-ইউরোপিয় নোবেলজয়ীর আমন্ত্রণ।

কলা ভবনের শিল্প ইতিহাস বিভাগের তত্ত্বাবধানে, মৃণালিনী মুখার্জী ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে বিনোদবিহারী মুখার্জি আর্কাইভস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার।

উনবিংশ শতক থেকে শিল্প ইতিহাস চর্চার আঁতুড় ঘর ছিল জার্মানি আর অস্ট্রিয়া। ভিয়েনা স্কুল অফ আর্ট হিস্ট্রি-র অন্যতম কাণ্ডারি এলয়িস রাইগেল, শিল্পের আঙ্গিকবাদী আলোচনার পথ প্রশস্ত করার সঙ্গে সঙ্গে, শিল্প ইতিহাসের যাত্রাপথকে ইতালির প্রাণকেন্দ্র থেকে বের করে হল্যান্ডের অভিমুখে নিয়ে যান। স্টেলার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক জোসেফ স্ট্রাইগোস্কি প্রথম অ-পাশ্চাত্য শিল্প ইতিহাসকে সবার গোচরে নিয়ে আসেন। শিল্প ইতিহাস চর্চায় বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের এই তুলনামূলক ঐতিহ্যকেই শান্তিনিকেতনের নীল গগনের সোহাগ-মাখা সকাল-সন্ধ্যাবেলার সঙ্গী করে তোলেন স্টেলা। তিনি যে সব ছাত্রদের শিল্প ইতিহাসের পাঠ পড়ান তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিনোদবিহারী মুখার্জি। কলা ভবনের ছাত্র ও শিক্ষকদের মনে গথিক শিল্পকলা থেকে কিউবিজম – এই বিস্তারিত পর্বের শিল্প ইতিহাসের ধারণা তৈরি করে দেন স্টেলা। পাশ্চাত্যের শিল্পীদের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য, সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ানের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ভাস্কর্যে ভারতীয় শিল্পীদের রূপকল্পনার তাৎপর্য ও আঙ্গিকের বিশ্লেষণ – এই সব কিছু নিয়ে কলা ভবনে শিল্প ইতিহাস চর্চার এক বিরল পরিসর তৈরি করে দেন তিনি।

BBMARC উদ্বোধনের আমন্ত্রণপত্র  

এই গবেষণাঋদ্ধ শিল্প ইতিহাস চর্চার বুনিয়াদ ছিল বলেই হিন্দি ভবনের দেওয়াল জুড়ে মধ্যযুগীয় সন্তদের ভিত্তিচিত্র রচনার সময় এশিয়া ও ইউরোপীয় চিত্রের শৈল্পিক মেলবন্ধন ঘটাতে পেরেছিলেন বিনোদবিহারী। ১৯৪৬-৪৭ সালে তৈরি এই ভিত্তিচিত্রে বিনোদবিহারীর যে প্রিয় ছাত্রটি কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি হলেন কে জি সুব্রমনিয়ন, সকলের প্রিয় মানিদা। উনিশশো চল্লিশের দশকে সুদূর মাদ্রাস থেকে শান্তিনিকেতনে শিল্পচর্চার পাঠ নিতে এসেছিলেন সুব্রমনিয়ন। তারপরে আবার পড়াতে এসেছিলেন আশির দশকে। সেসময় শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীতে যে বাড়িটি তিনি কিনেছিলেন বসবাসের জন্য, অধ্যাপনাকাল শেষ হলে সেই ‘কৈলাস’ নামের বাড়িটি কলা ভবনের শিল্প ইতিহাস বিভাগকে দান করে যান তাঁর প্রিয় শিক্ষক বিনোদবিহারীর নামে একটি সংরক্ষণ ও গবেষণাগার তৈরি করার জন্য। এভাবেই তৈরি হল বিনোদবিহারী মুখার্জি আর্কাইভস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, সংক্ষেপে বিবিএমএআরসি (BBMRC)। মানিদার জন্মশতবর্ষে কলা ভবনের গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মনন ও শিল্পচর্চার এক নতুন পরিসর। 

আর এক আরম্ভের জন্য

শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র ভবন হল বিশ্ব ভারতীর প্রথম সংরক্ষণ ও গবেষণাগার। যা রবীন্দ্রপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদযোগে রবীন্দ্রতিরোধানের পরবর্তী বছরেই তৈরি হয়েছিল। রবীন্দ্রগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি থেকে শুরু করে রবীন্দ্র-চিত্রাবলী সব কিছুই এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। দেশ-বিদেশের গবেষকদের কাছে এ হল এক বিশ্ববিদ্যাতীর্থপ্রাঙ্গন। বিনোদবিহারীর কন্যা ও মানিদার ছাত্রী মৃণালিনী মুখার্জিও চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে তাঁর বাবার কাজ সংরক্ষণের একটা উপায় করে যেতে। মৃণালিনীর মৃত্যুতে সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় মৃণালিনী মুখার্জী ফাউন্ডেশন। বিনোদবিহারী মুখার্জি আর্কাইভস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার-এর প্রথম পাঁচ বছরের ব্যয়ভারের দায়িত্ব নেয় এই ফাউন্ডেশন। 

বিনোদবিহারীর চারশটিরও বেশি কাজ বিবিএমএআরসি-র হাতে তুলে দিয়েছে মৃণালিনী মুখার্জি ফাউন্ডেশন।

ডঃ অংশুমান দাশগুপ্ত কলা ভবনের শিল্প ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে, বিশ্ব ভারতী ও বিবিএমএআরসি-র মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তাঁরই তত্ত্বাবধানে বিবিএমআরসি-র দায়িত্ব সামলাচ্ছেন নবনিযুক্ত ডকুমেন্টেশন ও আর্কাইভ অফিসার ডঃ সম্পূর্ণা চক্রবর্তী, যিনি কলা ভবনেরই প্রাক্তনী। বিনোদবিহারীর চারশটিরও বেশি কাজ বিবিএমএআরসি-র হাতে তুলে দিয়েছেন মৃণালিনী মুখার্জি ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি পরিষদ। আপাতভাবে এই অমূল্য শিল্প সংগ্রহ কলা ভবন মিউজিয়ামে রাখা হয়েছে। বিবিএমএআরসি-তে রয়েছে মানিদার নিজস্ব গ্রন্থাগারের সমস্ত বই ও অন্যান্য নথিপত্রের অপরিমেয় সম্ভার। আগামী দিনে এখানে গবেষণা করার জন্য আবেদন প্রক্রিয়ার বিষয়ে জানানো হবে।

১ অগাস্ট ২০২৪, পূর্বপল্লীর কৈলাস ভবনে বিনোদবিহারী মুখার্জি আর্কাইভস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সম্পন্ন হল কলা ভবন তথা বিশ্ব ভারতীর ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী ও শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় অনুচিত্র গবেষক ও মহারাজা সওয়াই মান সিং ২য় সংগ্রহালয়ের প্রাক্তন নির্দেশক ডঃ অশোক কুমার দাস, মানিদার কন্যা উমা পদ্মনাভন, বিশ্ব ভারতীর শিল্প ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও কলা ভবনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ রামন শিব কুমার, কলা ভবনের প্রাক্তনী শ্যামলী দাস এবং মৃণালিনী মুখার্জী ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি ভোমা পদ্মনাভন।

সূচনা

বিনোদবিহারীর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, কে তাঁর প্রকৃত শিক্ষক? মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু? কলা ভবনের গ্রন্থাগার? নাকি শান্তিনিকেতনের রুক্ষ প্রকৃতি? ছোটোবেলা থেকে ক্ষীণদৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন হওয়ার দরুণ সকলের থেকে আলাদা হতে হয়েছ বিনোদবিহারীকে। একাকীত্বই তাঁকে বইয়ের কাছে নিয়ে যায়। আত্মানুসন্ধানের মধ্য দিয়ে তিনি বর্হিবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। অধ্যাপক শিবদা জানালেন, সত্তর দশকে তাঁর ছাত্রাবস্থায় তিনি বিশ্ব ভারতীর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার তথা কলা ভবনের গ্রন্থাগার থেকে শিল্পচর্চার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই নিতে গিয়ে দেখেছেন, সেই সব বই তাঁর আগে যিনি পড়েছেন, তিনি বিনোদবিহারী। ভিক্টোরিয় যুগের শিল্প সমালোচক জন রাস্কিনের রচনাসমগ্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়া ছিল তাঁর। শিবদা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন, যে সময়ে ভারতে  বামপন্থী ধারার শিল্প সমালোচক জন বার্জারের বই বহুপঠিত হননি সে সময়েই বিনোদবিহারীর তা পড়ে হয়ে গেছে। বাহ্যিক দৃষ্টিশক্তির দীনতার জন্য ঔপনিবেশিক শাসকের ষড়যন্ত্রে রচিত মন্বন্ত্বর, হিন্দু-মুসলমানের জাতিগত বিদ্বেষ, দাঙ্গা ও দেশভাগের পর্বে বিনোদবিহারী আর সকলের মত সোচ্চার হতে পারেননি। কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিতে তিনি অনুভব করেছিলেন এক অন্য স্বর। স্বাধীনতা লাভের পর্বে ভারতীয় বহুত্ববাদের সেই বহুস্বরকে তিনি প্রকাশ করেন হিন্দী ভবনের ভিত্তিচিত্রে। চুন, বালি, সিমেন্ট, প্লাস্টারের মায়ার খেলায় যে ছবি তিনি এঁকেছিলেন, তার প্রতিটি পরতে ছিল এক চিন্তকের অভিনিবেশ। বিবিএমএআরসি-র দ্বার উদ্ঘাটিত হল এই উদ্দেশ্য নিয়ে যে একদিন কেউ এখানে এসে ভারতশিল্পের বহুস্বর পর্যালোচনা করে শিল্পজিজ্ঞাসার এক অনির্দেশ্য পথে পাড়ি দেবেন।

_____________
ছবি: অগ্রনীল মণ্ডল

Developed by DXDasia