বাঙালির সংবাদপত্র চর্চায় ‘বঙ্গদূত’

১৮২৯ সালে প্রকাশিত হতে শুরু করে এই সংবাদপত্রটি

ব্যক্তি-সম্পাদক ছাড়া বাংলার সংবাদপত্র ইতিহাস আলোচনা এককথায় অসম্পূর্ণ৷ যেমন বলা যায় রামমোহন রায়ের কথা৷ ১৮২১ সালে তার প্রকাশিত পত্রিকা সংবাদ-কৌমুদী এবং ১৮২২তে প্রকাশিত ফারসী সংবাদপত্র মিরাৎ-উল-আখবর-এ প্রকাশিত বহু প্রবন্ধ বিদেশী শাসকের রোষের কারণ হয়ে উঠেছিল৷ অন্যদিকে আবার মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় দাঁড়ির প্রসঙ্গে বিদেশী সম্পাদক, বাকিংহামের সংবাদপত্র ক্যালকাটা জার্নাল-কেও বন্ধ করার দাবি উঠেছিল৷ পরবর্তী সময়ে ভারতের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য অস্থায়ী গর্ভনর জেনারেল জন অ্যাডাম জারি করেন অ্যাডামস রেগুলেশন৷ যে দমননীতি আইনে রুপান্তরের আগে চন্দ্রকুমার ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামমোহন রায়, হরচন্দ্র ঘোষ, গৌরীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রতিবাদ করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন৷ অসন্তুষ্ট রামমোহন এরপর মীরাৎ-উল-আখবর প্রকাশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়ে সংবাদপত্র প্রকাশনার জগত থেকে সরে যান৷ কিন্তু সরাসরি যুক্ত না থাকলেও তিনি পরোক্ষে সংবাদপত্রের কাজে উৎসাহ দিতেন এবং লিখতেনও৷ তাঁর বন্ধু এবং সমর্থকেরা তাই সক্রিয় ভূমিকায় এগিয়ে আসায় এবং প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের চেষ্টার ফলশ্রতিস্বরুপ, ১৮২৯ সালে প্রকাশিত হতে শুরু করে বাংলা সাপ্তাহিক বঙ্গদূত৷ এর পরিপূরক হিসেবে ইংরেজীতে প্রকাশিত হত বেঙ্গল হেরাল্ড৷

বঙ্গদূত পত্রিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন সার্জন আর. মন্টগোমারী মার্টিন, দ্বারকানাথ এবং প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রেভারেণ্ড নীলরতন হালদার, রাজকৃষেণ সিং এবং পরোক্ষে অবশ্যই রামমোহন রায় স্বয়ং৷ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন নীলরতন হালদার এবং তার অবসর গ্রহণের পর ভোলানাথ সেন সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন৷ পত্রিকা প্রকাশ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ১৮৩০সালে নতুন করে আবার লাইসেন্স নেওয়া হয়৷ ভোলানাথ সেনের মৃত্যুর পর সম্পাদক হন মহেশচন্দ্র রায়৷

ভারতবর্ষ তথা বাংলার স্থানীয় সংবাদ বঙ্গদূতে মুখ্যত প্রকাশ পেলেও, বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে তার ব্যাপকতা ছিল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও৷ যেমন রাশিয়ায় যুদ্ধ, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে দেশের অর্থনীতি, সরকারী আইন-বিধি-নিষেধ প্রভৃতি সবই পত্রিকায় পেশ করা হত৷ বাংলার জমির গুরুত্ব তথা মূল্যবৃদ্ধি, সেইসঙ্গে শহরের শ্রীবৃদ্ধির সাথে অর্থনৈতিক উন্নতি তথা কর্মসংস্থানের ফলে অর্থনৈতিক বিকাশ-প্রভৃতির সার্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থানের কারণ ও তার প্রেক্ষিতকে ধরার চেষ্টা করেছিল বঙ্গদূত৷ পত্রিকা মনে করেছে, এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভবের আগে দেশের সম্পদ মুষ্টিমেয় লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল, যাদের হাতে সাধারণ মানুষ মানসিক ও শারীরিক কষ্ট স্বীকার করেছে৷ এবং এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে ইংরেজ শাসনের ফলে৷ বঙ্গদূতের উপস্থাপনার নীতি অবশ্য এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ছিল৷ কারণ, ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসার অধিকার রদের সঙ্গেই ভারতে আসা বেসরকারি মূলধনের বিস্তারের পক্ষেও পত্রিকা কথা বলেছিল৷ আবার অন্যদিকে, ভারত ও বাংলায় আসা ইউরোপীয় নীলচাষের মালিকদের পক্ষ সমর্থন করে বঙ্গদূত মত দিয়েছিল, এর ফলে ভারত ও ইংল্যান্ড উভয়েই লাভবান হয়েছে৷ চাষের ফলে জমিও হয়েছে উর্বরা৷ অর্থাৎ সংবাদপত্রের স্বাধীন মত প্রকাশের দিক থেকে বঙ্গদূতের অবস্থান ছিল খানিকটা সাহসী এবং একইসাথে বিতর্কিত৷ কারণ বাংলার নীলচাষিদের ওপর এই বিদেশীদের অত্যাচারের কাহিনী মনে করলে বঙ্গদূতের মতবাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে৷ তবে সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতা তথা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে কোন বিতর্কের কতটা যৌক্তিকতা আছে সে নিয়ে কিন্তু বিতর্ক উনবিংশ শতকেও ছিল, আজও আছে৷ পরিচালনাগত বৈশিষ্ট্যের এইরকম উদাহরণেই এক-একটি সংবাদপত্র পাঠকের মনে আলাদা করে জায়গা ধরে রাখে৷

রেভারেণ্ড লং সাহেবের ১৮৫৯ সালের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১৮৫৩-৫৪ সালে ১৯টি বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হত, যার মোট প্রচার সংখ্যা ছিল ৮১০০৷ ধর্ম-সমাজ-সংস্কারমনস্ক ভাবনাচিন্তা থেকেই জাতীয়তাবোধ ও স্বদেশীজাগরণের বীজবপন হয় এই সময়েই৷ সমকালীন পত্রপত্রিকাগুলি এই বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেই দু’টি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়৷ একটি রক্ষণশীল তথা প্রাচীনপন্থী৷ অন্যটি উদারপন্থী বা সংস্কারপন্থী৷ শুধু সংবাদপত্র নয়, সেই সময়ের হিন্দু সমাজও এই দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে৷ বঙ্গদূত তখন পরিচিত অন্যতম উদারমতালম্বী সংস্কারপন্থী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংবাদপত্র হিসেবে৷ সেই বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখতে গিয়ে নানান প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার স্বপক্ষে বঙ্গদূত সমর্থন জানিয়েছিল৷ সময়বিশেষে তা বিতর্ক তৈরী করলেও সমাজে নতুন ও যৌক্তিকতাপূর্ণ সঠিক চিন্তাভাবনার একটা পরিসর তৈরী করে দিয়েছিল কিন্তু বঙ্গদূত পত্রিকা৷ বিতর্কের সাথে নিরপেক্ষতার এই অবস্থান সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে আজও খানিকটা আপেক্ষিক, অনেকসময় ব্যতিক্রমীও৷ এই ব্যতিক্রমে সর্বজনগ্রাহ্য যুক্তির জায়গাটা যত বড় হবে ততই সবার মঙ্গল৷

Developed by DXDasia