বইমেলাতে অতীতের বটতলা ও খোদাই গ্রন্থচিত্রণের প্রদর্শনী
“মচকানিতে চুন হলুদ, পুড়লে দেবে ছাগল দুধ
কাটলে চিতের পাতা চুর, পচলে কেটে করবে দূর….”
পুস্তকের নাম ‘যোষিদ্বিজ্ঞান – নারীকুলের অবশ্যজ্ঞাতব্য বিষয়সমূহ’। লেখক- বসন্তকুমারী দাসী। ১৮৭৫ সালে বরিশালের বটতলা-জাতীয় সস্তা ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত। চোর পঞ্চাশৎ থেকে পারস্য ইতিহাস, চন্দ্রকান্ত, অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর, দেবীযুদ্ধ, লায়লা মজনু, দশ অবতার, কলকাতার গুপ্তকথা, সচিত্র রতিশাস্ত্র, রাজরানি, রসমঞ্জরী – শুধু বরিশাল নয়, এমন নানা কিসিমের চটি ও চটুল বইয়ের ঘাঁটি, ‘বান্ধা বটতলা’ ছিল উত্তর কলকাতায়। শুধু তাই নয়, উনিশ শতকে বাংলার এই ছাপাখানার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কাঠখোদাই। বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সাযুজ্য রেখে শিল্পীরা বংশ পরম্পরা মেনে কারিগরি দক্ষতায় কাঠের ব্লক খোদাই করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেকালের জীবনযাত্রার ছবি, দেবদেবীর কাহিনি, পোট্রেট, সুসজ্জিত রমণী, ছোটো বড়ো অক্ষর এমনকি ভৌগলিক ম্যাপ। তাই অস্বীকার করা যায় না, বটতলা বাংলা বই ও প্রকাশনার ঐতিহ্য। এককালে বটতলা ছিল সাধারণ পাঠক আর বাঙালির কাছে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মুক্ত বিদ্যালয়। ২০২৫, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ ‘বটতলা’, যেখানে প্রদর্শিত হচ্ছে বাংলা মুদ্রণে বটতলা ও কাঠখোদাইয়ের ধারাবাহিক ইতিহাস।
প্রদর্শনীর এক কোণায় কাঠের ছাঁচ তৈরি করছেন সিঁথির বাসিন্দা শিল্পী উজ্জ্বল দাস। পছন্দ হলে তাঁর হাতে তৈরি কাঠের ছাঁচ কেনারও সুযোগ আছে। মিলছে উনিশ শতকের কাঠখোদাই কালী প্রিন্ট, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে!

বইমেলার তিন নম্বর গেট থেকে সোজা যে রাস্তা চলে গিয়েছে তার নাম ইঙ্গেবর্গ বাখম্যান সরণি। এই পথ ধরে সোজা এগিয়ে গেলে থিম কান্ট্রি জার্মানির প্যাভিলিয়ন। তার উল্টো দিকের মাঠে চলছে উনিশ শতকের খোদাই চিত্র প্রদর্শনী। গ্যালারির দেওয়ালে ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে বাংলায় মুদ্রণের ইতিহাস।
১৭৭৮ সালে প্রথমবার বাংলা হরফ ছাপা হয়েছিল কোনও বইতে। হুগলির ত্রিবেণীতে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেই প্রেস। ১৮১৮ সালে বাংলা বইতে স্থান পায় ছবি। কাঠের উপরে খোদাই করা ব্লকের মাধ্যমে চলত সেই মুদ্রণ। তেমন কয়েকটি ব্লকও স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।


উনিশ শতকের কাঠখোদাই কালী প্রিন্ট ও ১৭৭৮ সালে প্রথমবার বাংলা হরফ ছাপা বই
এসবের মাঝেই চোখ আটকে যেতে বাধ্য প্রদর্শনীর এক কোণে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বইমেলা বটতলা’। রয়েছে লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন। স্টলে বসেই কাঠের ছাঁচ তৈরি করছেন সিঁথির বাসিন্দা শিল্পী উজ্জ্বল দাস। তাঁর কথায়, গত প্রায় চার দশক ধরে এই কাজ করছেন। কলকাতায় নিজের দোকানও রয়েছে। কিন্তু এবার বইমেলায় হাজারো মানুষের সামনে নিজের শিল্পকর্ম তুলে ধরতে পেরে স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত তিনি। পছন্দ হলে তাঁর হাতে তৈরি কাঠের ছাঁচ কেনারও সুযোগ আছে স্টল থেকে। মিলছে উনিশ শতকের কাঠখোদাই কালী প্রিন্ট, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে!
এহেন প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কলেজ পড়ুয়ারাও। প্রদর্শনীতে চলা কাঠখোদাই কর্মশালা-য় হাতে কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল।

কাঠখোদাই-শিল্পী উজ্জ্বল দাস
এহেন প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কলেজ পড়ুয়ারাও। প্রদর্শনীতে চলা কাঠখোদাই কর্মশালা-য় হাতে কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল। নতুন প্রজন্মের কাছে বটতলা ও খোদাই শিল্পকে পুনরজ্জীবিত করারা এর থেকে ভালো পন্থা আর কী বা হতে পারতো!

খোদাই চিত্র কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির পড়ুয়ারা
_______
ছবি- নিজস্ব