শাহ জালাল সিলেটে থেকে গেলেও তাঁর সঙ্গীদের পাঠিয়ে দেন নানা স্থানে
ভারতবর্ষের সুলতান তখন ছিলেন খিলজী আলাউদ্দিন। সেসময় আরব থেকে ধর্ম প্রচার করতে ভারতে এসেছিলেন হজরত শাহ জালাল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ৩১৩ জন সঙ্গী। সেসময় বর্তমান বাংলাদেশের সিলেটের রাজা ছিলেন গোবিন্দ। হজরত শাহ জালাল ধর্ম প্রচারের জন্য সেখানে যেতেই শুরু হয় যুদ্ধ। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যাচ্ছে, সেই যুদ্ধের মূল কারণ ছিল, তখন সিলেটের একাংশের জায়গিরদার আলি মোসলেম বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে রাজা গোবিন্দের মনোমালিন্য। মোসলেম তখন মুরিদ হয়েছিলেন হজরত শাহ জালালের। তারপরই যুদ্ধ। যুদ্ধে পরাজিত হন রাজা গোবিন্দ। শাহ জালাল সিলেটে থেকে যান, কিন্তু তাঁর সঙ্গীদের পাঠিয়ে দেন নানাস্থানে তাঁর ২২ জন সঙ্গী এসেছিলেন বঙ্গদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে। তারমধ্যে ছিলেন পীর ইলিয়াস রাজী। তাঁরা প্রথমে এসে উঠেছিলেন বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগণার হাড়োয়ার কাছে রায়কোলায়। সেসময় রায়কোলার নাম ছিল দেবদাসপুর। এখানে এসে তাঁরা বাংলা শিখতে শুরু করেন, ধীরে ধীরে সুফিবাদ ও ইসলামের প্রচার করতে থাকেন তাঁরা। তখনই দলিত, নিপীড়িত, হিন্দু সমাজে অবহেলিত মানুষ তাঁদের কথায় আর আপন করে নেওয়ার পদ্ধতি, অলৌকিক ক্ষমতা দেখে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে, তখন বসিরহাট মহকুমার হাড়োয়া, বাদুড়িয়া, স্বরূপনগর, বারাসাতের দেগঙ্গা ও তার আশপাশের এলাকায় ৩১৩ জন পীর ধর্ম প্রচার শুরু করেন, ফলে এই অঞ্চলে হিন্দু জনসংখ্যার তুলনায় মুসলমান বেশি। পীর ইলিয়াস রাজী এসেছিলেন বাদুড়িয়ায়। তাঁর মাজার রয়েছে আঁধারমাণিক গ্রামে। তখন এখানকার জমিদার ছিলেন ব্রাক্ষ্মণ রায়চৌধুরিরা, তাঁদের সঙ্গে বিবাদ শুরু হয় তাঁর। পীর ইলিয়াসের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে যখন দলেদলে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলেন তখন তাঁকে বন্দী করে নিলেন রায়চৌধুরীরা। পীরের স্থান হল অন্ধকার কারাগারে। লোকমুখে শোনা যায়, কারাগারের ভেতর থেকে তখন জ্যোতি বের হতে থাকে। তা দেখে ভয় পেয়ে যান জমিদাররা। রানি নিজে সেই জ্যোতি দেখে পীর সাহেবেকে মুক্ত করতে নির্দেশ দেন। তারপর থেকে গ্রামের নাম হয় আঁধারমাণিক। শোনা যায় পাশের জমিদার রাজা দক্ষিণ রায়ও ভয় পেয়ে যান। তখন প্রজারা ধীরেধীরে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করেছে। এটা মেনে নিতে পারেননি রাজা দক্ষিণ রায়। শুরু হয় যুদ্ধ। পরাজিত হন রাজা। শোনা যায়, নদীতে জলে ডুবে আত্মঘাতী হন তিনি। গ্রামের পাশেই একসময় ছিল ইছামতী নদী, এখন তা অনেক দূরে চলে গেছে। পৌষ সংক্রান্তির রাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। প্রতিবছর এইদিনে তাই উরুস শুরু হয়। প্রতি শুক্রবার শয়েশয়ে মানুষ আসেন দরগায়, মানত করেন, রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জল, তেল, মাটি নিয়ে যান, গাছের প্রথম ফল দিয়ে যান দরগায়, গরুর প্রথম দুধ পীরের দরগায় উৎসর্গ করে তারপর বাড়িতে খেতে শুরু করেন, স্থানীয় মিষ্টি ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন প্রথম মিষ্টি রেখে যান দরগায়। বন্ধ্যা নারী-পুরুষ সন্তান লাভের আশায় এখানে আসেন।
জবরদস্ত এই পীরের প্রভাব গোটা মহকুমা জুড়েই। বারাসাত থেকে বাদুড়িয়ার বাস রয়েছে, শ্যামবাজার থেকেও সরাসরি বাস পাওয়া যায়, ট্রেনে হাবড়া বা মছলন্দপুর নেমে বাস পাওয়া যায়। বাদুড়িয়া অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু জায়গা। চারিদিকে ছায়া ঘেরা গ্রাম মাঝখানে শহর, এখানে থাকার হোটেল পাবেন। এখান থেকে যেতে পারবেন বাঁশের কেল্লা গড়ে বীর তীতুমীর যে গ্রামে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন সেই নারকেলবেড়েতে। সম্প্রতি বাদুড়িয়া অশান্ত হয়েছে ঠিকই, তবে এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র।