ইউরোপের শিল্পীর তুলিতে বাংলার নকশিকাঁথা

মার্ক শাগাল-এর ‘The Birthday’(১৯১৫) ছবিটি আমাদের মনে কিছু প্রশ্ন জাগায়

ছবি আঁকার জগতে ‘দেওয়া-নেওয়া’ শব্দটির অর্থ সুদূরপ্রসারী। কারণ পৃথিবীর এক মানচিত্র থেকে অন্য মানচিত্রের এই দেওয়া-নেওয়া জাহাজের পালে বাতাস লাগিয়ে এগিয়ে যায়, এগিয়ে আসে। আর যাঁরা ছবি আঁকেন, ভাস্কর্য করেন তাঁরা যেন ঘটতে থাকা ঘটনার মাঝে ধ্যানী সাধুর মত ছিপটি ধরে বসে থাকেন, কাঙ্খিত জিনিসটি সুযোগ পেলেই তুলে নেওয়ার জন্য। তাই কখনও পূর্বের জিনিস পশ্চিমে কখনও বা পশ্চিমের জিনিস পূর্বে আসা যাওয়া করল। নিজেদের আপন ছন্দেই। সেটা উপনিবেশ তৈরির যুগ। কত জাহাজ অনুসন্ধান করতে লাগল নতুন নতুন ভূখণ্ডের। সেই খোঁজেই একদিন একদল বণিক এসে পড়ল ভারতবর্ষে। তখন এদেশে মোঘলদের শাসন। সম্রাট জাহাঙ্গীর প্রচুর উপঢৌকন পেলেন বিদেশি বণিকদের কাছ থেকে। সঙ্গে পেলেন কিছু বাইবেলের ছবি। ভালো লাগল তাঁর। দরবারের শিল্পীদের ডেকে বললেন – ‘এঁকে ফেলো তো বাবু বাইবেলের ছবিগুলি’। শিল্পীরাও বসে গেলেন রং তুলি নিয়ে। ছবির নকশা করা হাশিয়ার মাঝে দিব্যি ফুটে উঠল মা মেরি-র কোলে ছোট ফুটফুটে শিশু যিশুর। আদান-প্রদান শুরু হয়ে গেল। উলটো দিকে দেখা গেল সেই কোন সুদূর ডাচেদের আলোআঁধারি দেশের এক শিল্পী রেমব্রান্ট-এর হাতে জাহাজে চড়ে পৌঁছে গেল মুঘল সালতানাতের দিলবাহারি ছবি। সেখানে বসে বসে পৃথিবীর জোড়া খ্যাতি নিয়ে বারোক শিল্পী রেমব্রান্টও আঁকতে লাগলেন মুঘল রাজপুত্রদের ছবি।

আধুনিক যুগের সময়ে এসে কখনও দেখা গিয়েছে ভ্যানগগ কিংবা গগ্যাঁ নিজেদের শৈলীতে অভিনবত্ব আনতে মিশিয়ে দিয়েছেন জাপানি কাঠখোদাই চিত্রের নানা গোলপনা। আবার এমনও শোনা গিয়েছে পিকাসো কিংবা ফেরনদ লেজেঁর সংগ্রহ করেছিলেন কালীঘাটের চিত্র অথবা বটতলার কাঠখোদাই। সব দেখার যে অভিজ্ঞতা তার কিছু ধারণা ওঁদের ছবিকে দেখলেই পাওয়া যায়। এই সূত্র ধরেই মার্ক শাগাল-এর ‘The Birthday’(১৯১৫) ছবিটি আমাদের মনে কিছু প্রশ্ন জাগায়। শাগাল ছিলেন স্যুরিয়ালিজম শিল্পী। সেই রাস্তা ধরেই তাঁর ছবির চরিত্ররা মহাকাশচারীদের মত শূন্যে ভেসে বেড়ায়। নগর দেখে কখনও বা ঘর সাজায়, কখনও বা ভালোবাসা-বাসি করে। এইরকম একটি ভালবাসার ছবিটিতে হঠাৎ করেই যেন হাজির হয়ে গেল কলকা বোনা সেলাই জোড়া নকশি কাঁথার একফালি টুকরো। দেখে প্রশ্ন জাগে, বাংলামুলুকের জাহাজের ভোঁ কি শুনেছিলেন এই শিল্পী? কারণ চেহারাটি তো যেন নকসি কাঁথার কথাই বলতে চায়। বাকি মতামতের জন্য বিশেষজ্ঞদের দরজা খোলা রইল।

Developed by DXDasia