গ্রাম বাংলার মাটির তৈরি খেলনায় লুকিয়ে আছে ঐতিহাসিক কাহিনি
বঙ্গের উত্তর মুলুকে এমন নকশাদার ঘোড়ার চলিত নাম ‘মালিক গাজির ঘোড়া’। ঢেউ খেলানো লাগাম, শরীর জোরা আলতো ছাপের গয়নার বয়ান যেন কথা কয়ে ওঠে দুলকি কিন্তু ঠারে ঠোরের চালে। এই ঠারে ঠোরের মধ্যে রয়েছে সুলতানি দেমাক আর বাদশাহি মেজাজ। মালিক গাজির ঘোড়াটি ঋজু ভঙ্গীতে গলা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন উটের জিন বয়ে আনা এক আরবি ঘোড়া। কোথায় যেন বাংলা গ্রামজীবনের হাতে টেপা ঘোড়ার থেকে অনেকটাই আলাদা। থানে কিংবা ছোটদের খেলার পুতুল হিসাবে এ ঘোড়ার চল এখনও বঙ্গের উত্তরপ্রান্তরে মায় ওই দিনাজপুর চত্বরে। রায়গঞ্জের বৃদ্ধ ভানু পাল মা-ঠাকুমার থেকে পাঠ পেয়ে আজও গাজি থানের ঘোড়া বানিয়ে চলেছেন নিজের হাতে মাটি মেখে।
যেদিন থেকে ঘোড়ার নামের সাথে মালিক গাজির বয়ান নামা জুড়ে গেল সেদিন থেকেই ঘোড়ার আড়ালে আবডালে লুকিয়ে রইল এক তুর্কি ভাগ্যান্বেষী সৈনিকের বঙ্গ বিজয়ের কাহিনি। নিছক ছাপোষা কোন সেনা ছিলেন না তিনি। বাদাউন থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত তাঁর ভয়াবহ বীরগাঁথা সকলেই জানেন। এই সৈনিকটির নাম- ইখতিয়ার উদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি। মাত্র দু’হাজার সেনা নিয়ে একের পর এক রাজ্য দখল করছিল সে। দেখতে দেখতে একটি দুর্গ দখল করে বখতিয়ার। স্থানীয় মানুষরা তাঁকে জানায়, না এটি কোন দুর্গ নয়। এটি বৌদ্ধদের নালন্দা মহাবিহার। ইতিহাসের খাতিরে গোটা আদত অঞ্চলের নাম হয়ে যায় ‘বিহার’। তাঁর পর শুরু হল তাঁর বাংলামুলুক পানে যাত্রা। এমন খবর দূত মারফত আগেই পেয়েছিলেন বাংলার রাজা লক্ষ্মণ সেন। তিনি তখন রাজধানী নবদ্বীপের চারপাশে ঘের দিতে ব্যস্ত। ওদিকে ঝাড়খণ্ডের গভীর জঙ্গল দিয়ে তখন ছুটে আসছে বখতিয়ারের সেনা দল। এখানেই ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। দেখা গেল নদিয়া অভিযান কালে তিনি এত দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে লাগলেন যে মাত্র আঠারো জন সৈন্য তাঁর সাথে পা মেলাতে পারে। লেখা হল “ He conquest Bengal at the head of 18 horse man .” ১২০৩ বখতিয়ারের বাংলা বিজয়। শুরু হল এই বিজয় উৎসবের গৌরবকে ধরে রাখতে বখতিয়ারের ভক্তদের দোয়া করার নানা আচার অনুষ্ঠান। সেই সূত্রেই শুরু হল তাঁর নামে মাটির ঘোড়া তৈরি। তাই আজও এমন ঘোড়াটি বখতিয়ারের ঘোড়া বা মালিক গাজির ঘোড়া নামেই বাংলা মুলুকে ছোটদের হাতের খেলার পুতুল হয়ে রয়ে গেল। ইতিহাসের খাতির মালিক গাজি ‘বখতিয়ার খলজি’র নাম।