ময়টা সন্ধে৷ মাঠের অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি একটা অংশ দিয়ে ধীর অথচ দৃপ্ত পায়ে একা হেঁটে যাচ্ছেন এক বিশীর্ণ প্রৌঢ়৷ মুখ ভরা চাপ দাড়ি৷ কাঁধে একটা সাধারণ ঝোলা৷ আর তাঁকে একটু দূর থেকে শ্বাপদের মত নিঃশব্দে অনুসরণ করছে চারজন৷ তাদের চোখেমুখে একটা চাপা উত্তেজনার ভাব৷ সামান্য নার্ভাসনেসও৷ প্রৌঢ়কে আলাদা করে লক্ষ করে এরা তাঁর পিছু নিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হল৷ কিন্তু কিছুতেই একটা মোক্ষম মুহূর্ত জুটছে না৷ চারজনই একে অন্যকে খোঁচায়৷ ইশারায় স্থির করে উঠতে চায় দলের ঠিক কে লিড নেবে৷ তারপর তুলনামূলকভাবে ডাকাবুকো হিসেবে যার সুনাম সেই রোগাপাতলা ছেলেটাই গা ঝাড়া দিয়ে দ্রুতপায়ে বাকি তিনজনের দলটাকে ছেড়ে এগিয়ে যায়৷ ডানহাতটা আলগা করে নিজের ঝোলায় ঢুকিয়ে পজিশন নিয়ে নেয়৷ তারপর সংকোচ কাটিয়ে প্রৌঢ়র ঠিক পিছনে গিয়ে বলে ওঠে- ‘শুনছেন?’৷ পিছনে বাকি তিনজন রূদ্ধশ্বাস সে দৃশ্য দেখে৷ চাপদাড়ির ভদ্রলোক ভুরুটাকে সামান্য প্রশ্নচিহ্ন করে পিছু ঘুরতেই ছেলেটা ব্যাধের ক্ষিপ্রতায় ঝোলা থেকে একটা দুঃখী চেহারার হার্ডবাউন্ড বের করে করে খুব কষ্ট করে হলেও সপ্রতিভ স্বরে বলে- ‘একটা অটোগ্রাফ পাওয়া যাবে?’

বাংলা-বাজার তখনও থ্রিলার-তন্ত্র-ভূতপ্রেতের অবাধ চারণভূমিতে পরিণত হয়নি৷ সেলফিহীন সায়াহ্নে সে ছিলো সই শিকারীদের স্বর্ণযুগ৷ উৎসাহী পাঠকের ভিড়ে অথবা ভক্ত পরিবৃত অবস্থায় মেলা প্রদক্ষিণ করতে থাকা প্রিয় লেখক বা লেখিকাকে দূর থেকে এক ঝলক দেখেই পিছু নিত ঝানু সই শিকারীরা৷

ভদ্রলোক মুচকি হেসে বইটা হাতে তুলে নিচ্ছেন দেখে বাকি তিনজন সই শিকারী বুকে বল পায়৷ গুটি গুটি তারাও এগোয়৷ আর তারপর একজন ভয়ে ভয়ে বলে, “আমরা না একটা পত্রিকা করি৷ আপনি যদি এক কপি নিতেন….”৷ চশমার আড়াল থেকে চোখ সামান্য তুলে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করেন, “দাম কত?”৷ চারজন লজ্জাবনত৷ “না না! ছি ছি! আপনার থেকে দাম নেব কী করে! শুধু যদি একটু দেখতেন…৷’’
– “দাম নেবে না মানে! স্টুডেন্ট তো? পকেটের পয়সা গচ্চা দিয়ে পত্রিকা বের করছ আর দাম নেবে না?”

বুকপকেট থেকে একটা নোট বের করে সেই রোগাপটকা ডাকাবুকোর হাতে গুঁজে দিয়ে আবার সেরকমই ধীর অথচ দৃপ্ত পায়ে মেলার গেটের দিকে হেঁটে যান নবারুণ ভট্টাচার্য৷ আর চারজন তরুণ ‘বিপ্লবী’ স্থাণুবৎ হতভম্ব হয়ে দেখে তাদের প্রিয় উথালপাথাল লেখক গেটের বাইরে বইমেলা ফেরত হুল্লোড়ের ভিড়ে মিলিয়ে যাচ্ছেন…

অরণ্যের প্রাচীন নিয়মের মতো ডাকসাইটে লেখকদেরও মেলায় চারণক্ষেত্র আলাদা আলাদা৷ সাভানার কোন স্টল আলো করে বুদ্ধদেব গুহ বসবেন আর ম্যানগ্রোভের কোন প্রকাশনীর বাইরে পাওয়া যাবে শংকরকে-নিবীড় পাঠকের কণ্ঠস্থ ছিলো সেসব৷

সে এক যুগ ছিলো বইমেলার৷ অবশ্য এমনভাবে শুরু করলে নিজেকে স্বভাবতই প্রাগৈতিহাসিক বোধ হতে পারে, কিন্তু তবু বঙ্গপাঠকের হাতে তখনও সর্বশক্তিমান স্মার্টফোন ওঠেনি এবং অ্যালগোরিম ধ্বস্ত সোশ্যাল মিডিয়ার সনাতন কক্ষপথে পাক খেতে থাকা বাংলা-বাজার তখনও থ্রিলার-তন্ত্র-ভূতপ্রেতের অবাধ চারণভূমিতে পরিণত হয়নি৷ সেলফিহীন সায়াহ্নে সে ছিলো সই শিকারীদের স্বর্ণযুগ৷ উৎসাহী পাঠকের ভিড়ে অথবা ভক্ত পরিবৃত অবস্থায় মেলা প্রদক্ষিণ করতে থাকা প্রিয় লেখক বা লেখিকাকে দূর থেকে এক ঝলক দেখেই পিছু নিত ঝানু সই শিকারীরা৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের হাতে প্যাকেট জড়ানো উক্ত লেখকের সদ্য প্রকাশিত বই; তখনও তার গা থেকে বাঁধাইখানার গন্ধ যায়নি৷ এমনকী অদূরেই লেখক দৃশ্যমান হয়েছেন, অথচ হাতের কাছে তার কোনো বই না থাকায় তড়িঘড়ি নিজের ঘরে বইয়ের তাকে সযত্নে রেখে দেওয়া কোনো হার্ডবাউন্ডেরই দ্বিতীয় একটা কপি কিনে লেখকের নিজস্ব কলমের স্পর্শটুকু ধরে রাখার তাগিদে ছুট লাগিয়েছেন পাঠক, এমনটাও অহরহঃ ঘটেছে৷ অরণ্যের প্রাচীন নিয়মের মতো ডাকসাইটে লেখকদেরও মেলায় চারণক্ষেত্র আলাদা আলাদা৷ সাভানার কোন স্টল আলো করে বুদ্ধদেব গুহ বসবেন আর ম্যানগ্রোভের কোন প্রকাশনীর বাইরে পাওয়া যাবে শংকরকে-নিবীড় পাঠকের কণ্ঠস্থ ছিলো সেসব৷ (ঠিক স্টল বলা অবশ্য ভুল হবে৷ সাধারণত স্টলের ঠিক গায়ে, বোধহয় ডেকরেটরের থেকে ভাড়া করে আনা নেমন্তন্নবাড়ির মত সোফার বন্দোবস্ত থাকতো৷ সেখানেই বাহনের পিঠে বসা দেব অথবা সিংহাসনে বসা রাজার রোয়াবে বেস্টসেলার ঔপন্যাসিকদের দেখা মিলতো৷ অবশ্য বিনা বাউন্সারেই৷ তবে এই সোফার চলটা এখনও রয়ে গেছে৷)

এ হেন বইমেলার অবিসংবাদী রাজপুত্র অবশ্য ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়৷ তবে তাঁর নাগাল পাওয়া বড়ো সোজা কথা নয়৷ অজস্র পাঠক, ভক্ত ও উঠতি কবি সাহিত্যিক পরিবৃত হয়ে, হাসিমুখে অকাতরে সই বিলোতে বিলোতে তিনি এগোতেন৷ পরিচিত অপরিচিত সকলের কাছেই তিনি ‘সুনীলদা’৷ সে তালিকায় মায়ের হাত ধরে ‘কাকাবাবু সমগ্র’ বুকে জড়িয়ে রাখা মাথার দু’দিকে দুই ফুলকপি সদৃশ ঝুঁটি দোলানো মর্নিং সেকশন থেকে শিহরণ জাগানো বান্ধবীর ‘তোর জন্য হাঁদাভোঁদাই ঠিক!’ জাতীয় অপমানজনক প্যাঁক খেয়ে প্রতিশোধস্পৃহায় টগবগ করে ফুটতে থাকা কলেজ ফার্স্ট ইয়ারও উপস্থিত (হাতে বেশ কায়দা করে ধরা ‘একা এবং কয়েকজন’ অথবা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ আর জীবনে অ্যাম্বিশন থাকলে ‘যুবক যুবতীরা’৷ মেটে বা ধূসর জাতীয় সিরিয়াস রঙের পাটভাংগা পাঞ্জাবি হাতা পর্যন্ত গোটানো৷ তলার জিনস অবশ্য চারমাস কাচা হয়নি৷)৷ তবে এই ভিড় এবং সময় বিশেষে লেখক নিজেও অজান্তেই কিছু কিছু অনৈতিক আড়ালের সুযোগ করে দিতেন৷ সে সময় ওনার চেহারাখানাও বেশ ভারিক্কি৷ টিউশন কেটে মেলায় চালিয়াতি করে বেড়ানো আমার এক বন্ধুকে ‘ভালোবাসা খণ্ডকাব্য’-তে সই করিয়ে স্যাট করে লেখকেরই ঠিক পিছনে, সেই প্রবাদপ্রতিম হাওয়াইয়ান শার্টের ঝুলকে প্রায় পর্দার মত ব্যবহার করে লুকিয়ে পড়তে চাক্ষুষ দেখেছি৷ আসলে অদূরেই মূর্তিমান বিভীষিকার মতো বেচারার পিতৃদেবের আবির্ভাব ঘটেছিল৷ বইমেলার রাজপুত্র এক উটকো চিঁমড়ের এহেন উৎকট হাবভাবে কী ভেবেছিলেন সে তথ্য অবশ্য অজানা৷

তবে কোনো বিশুদ্ধ কবিকে নিয়ে এমন উন্মাদনা চোখে পড়েছে বলে মনে পড়ে না৷ হয়তো কবিতার পাঠক স্বভাব লাজুক! অথবা প্রাক সোশ্যাল মিডিয়া যুগে জলজ্যান্ত কবির চেহারা ঠিক কেমন হয় সে নিয়ে যে চালু ধারণা তার বাইরে বেশভূষা থাকলে চট করে কেউ ‘কবি’ হিসেবে ঠাহর করতো না! নতুবা জয়দেব বসুকে তো ঐ হাওয়াইয়ান শার্টেই মেলা দাপিয়ে বেড়াতে দেখেছি (বাজারে ব্যাপক জনশ্রুতি ছিল, সুনীল গাঙ্গুলি আর জয়দেব বসুর দর্জি নাকি এক!)৷ অথচ তখন তরুণ তরুণীদের মুখে মুখে ‘রোহিতাশ্ব’! আবার মিতভাষী, লাজুক স্টিরিওটাইপে খাপে খাপ বসে যাওয়ার জন্যই কি শঙ্খ ঘোষ বা জয় গোস্বামীকে চট করে চিনে ফেলত পাঠক?

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে তখন রাজ্য রাজনীতিতে চরম টালমাটাল চলছে৷ যুযুধান শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে গোটা বইমেলা৷ পাঠক, লেখক-সবাই সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখছে৷ জয় গোস্বামী লিখেছেন তাঁর বহু আলোচিত ‘শাসকদের প্রতি’৷ এমনই প্রেক্ষাপটে আবিষ্কার করা গেল প্রতিভাসের স্টলে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের মিনিবই ডজনে বিক্রি হচ্ছে৷ দুই বন্ধু৷ দুজনেরই পকেট ঢনঢন৷ কুড়িয়ে বাড়িয়ে স্থির হল যৌথভাবে এক ডজন কেনা হবে৷ তা নিয়ে স্টলের বাইরে আসতে না আসতেই প্রায় কুরুক্ষেত্র৷ বিষয়টা কিছুই না, একজন প্রস্তাব রেখেছে অর্বাচীনের মত ছ’টা-ছ’টায় ভাগ না করে প্রথমে এক ডজনই কেউ একটা নিয়ে যাক৷ তার পড়া হলে অন্যজন৷ দ্বিতীয়জনের সন্দেহবাতিক আত্মার এ প্রস্তাবে সায় নেই৷ তার ধারণা সবকটি কপি আত্মসাৎ করার অসৎ উদ্দেশ্যেই এ হেন প্রস্তাবনা (সে সন্দেহ অমূলক কি নয় তা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ৷)৷ এ নিয়ে ঝামেলা বাড়তে বাড়তে প্রথমটা খিস্তোখিস্তি, পরে প্রায় হাতাহাতি, মিনিবুকের শীর্ণকায় গোছাটি নিয়ে টাগ-অফ-ওয়ার, বাকি বইপত্র-ছাতা-ঝোলা সবই অভিঘাতে ছিটকে পড়েছে৷ সবটাই স্টলের সামনে৷ এমন সময় দুজনের খেয়াল হয়-মাত্র কয়েক হাত দূরেই জয় গোস্বামী কেমন এক আতঙ্ক মাখা দৃষ্টিতে ওদের দিকে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে আছেন৷ সেই অভ্রান্ত সোফায় বসে৷ সাথে সাথে জামা টামা ঠিক করে ফিটফাট হয়ে একজন আরেকজনের কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, “শিজ্ঞির পালা৷ নয়তো দেখলি কালই আরেকটা বই বেরুলো৷ নাম: শাসকদের প্রতি জুনিয়ার৷” প্রসঙ্গত প্রিয় কবিকে সেই প্রথম সামনাসামনি দেখেছিলাম৷

প্রিয় লেখক বা লেখিকার সঙ্গে সেলফির থেকেও, বইয়ের প্রথম পাতায় জ্বলজ্বল করতে থাকা আঁকাবাকা হরফে লেখা কয়েকটা অক্ষর এখনও জিতে যায় এখানে৷ জিতে গিয়ে বইয়ের তাকে অন্যান্য সই করা বইগুলোর কাছাকাছিই ঠাঁই পায়৷

এরূপ নস্টালজিয়া আক্রান্ত হয়ে লেখা শেষ করতে গেলে একটি দুটি নীতিবাক্য বা নিদেনপক্ষে ভবিষ্যতের আলোর দিশা জাতীয় দু-একটি কথা বলাই দস্তুর৷ তাই এ কথাও স্বীকার করতে হয়-বইমেলাই বোধহয় সেই একমাত্র এলাকা যেখানে হাজারটা পঞ্চাশ, ষাট এমনকী একশো এম পি রেজোলিউশনের ফোন ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও মানুষ এখনও আদি ও অকৃত্রিম খাতা-কলম আর অটোগ্রাফের বিস্মৃতপ্রায় জগতে ফিরে যায়৷ প্রিয় লেখক বা লেখিকার সঙ্গে সেলফির থেকেও, বইয়ের প্রথম পাতায় জ্বলজ্বল করতে থাকা আঁকাবাকা হরফে লেখা কয়েকটা অক্ষর এখনও জিতে যায় এখানে৷ জিতে গিয়ে বইয়ের তাকে অন্যান্য সই করা বইগুলোর কাছাকাছিই ঠাঁই পায়৷ সে সব সই দেওয়ার মানুষেরা আর কখনও বইমেলা আসবেন না৷ তাদের আর নতুন কোনো লেখাও বেরোবে না কোথাও৷ তবু বইয়ের তাকে এই মহীরূহসম মানুষদের ছোঁয়া পাতাগুলোর পাশেই অনায়াসে জেগে থাকে সদ্য যুবতীর এক ফর্মার প্রথম কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্রে লাজুক হরফে লেখা ‘ভালোবাসা সহ…’৷ এই বা কম কী!

Written by