সংখ্যাগুরুর গণতন্ত্র– বিপজ্জনক খুড়োর কল

পৃথিবীতে সংখ্যালঘুরা বহু ক্ষেত্রেই নিরাপদ থাকছেন না। গণতন্ত্র কি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ?

গত ১৩ নভেম্বর, মায়ানমার থেকে কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা বিতারণে নীরব থাকা, সেনা বাহিনীকে সমর্থন করার অভিযোগে অং সান সু চিকে দেওয়া ‘অ্যামবাসাডোর অফ কনশায়েন্স’ সম্মান ফিরিয়ে নিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তিনি শান্তির জন্য নোবেল পেয়েছিলেন। দাবি উঠেছে (নিয়ম না থাকলেও) সেই পুরস্কারও ফিরিয়ে নেওয়ার। কিন্তু প্রশ্ন হল, মায়ানমারের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের নেত্রী সু চি কি তাঁর দেশে অপ্রিয় হয়েছেন রোহিঙ্গা বিতারণের জন্য? না হননি। সে দেশের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষই রোহিঙ্গা বিতারণের পক্ষে। যেমন অপ্রিয় হননি শ্রীলঙ্কার তামিল হত্যাকারীরা। তাহলে তো বলতে হয়, রোহিঙ্গা বিতারণ একটি গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত, যা সে দেশের সেনা বাস্তবে রূপায়ণ করেছে। গণতন্ত্রের এটা একটা খারাপ দিক। সংখ্যাগুরুর গণতন্ত্রের হাতে এই পৃথিবীতে সংখ্যালঘুরা বহু ক্ষেত্রেই নিরাপদ থাকছেন না। গণতন্ত্র কি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ? এই প্রশ্নটা কিন্তু উঠছে।

২০০২ সালে যখন গোধরা পরবর্তী গুজরাট দাঙ্গায় কয়েক হাজার সংখ্যালঘুর মৃত্যু হল, তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহের কথায়, “হিন্দুত্বের নামে যে পিশাচ নৃত্য দিয়ে নতুন সহস্রাব্দের উদ্বোধন হয়েছিল গুজরাটে, তার একটা বৈশিষ্ট্য মনে রাখার মতন। বৈশিষ্ট্যটা এই যে, গণহত্যাকে সেখানে মহোৎসবে পরিণত করা হয়। …হত্যা এক্ষেত্রে নির্লজ্জ, নির্ভয়, অবাধ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। …নাগরিক মারণযজ্ঞে রাষ্ট্রযন্ত্রের অকপট সহযোগিতা …কৃতিত্বের পুরস্কারস্বরূপ গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনে সেই (অভিযুক্ত) ঘাতকদেরই অবিসংবাদিত সাফল্য…।” এই দাঙ্গার পরের ভোটে  বিপুল ভোটে জিতে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হলেন নরেন্দ্র মোদী। ঘটনাচক্রে গত ১৩ নভেম্বর, ১৯১৮, দাঙ্গায় নিহত কংগ্রেস সাংসদ এহেসান জাফরির স্ত্রী জাকিয়া জাফরির অভিযোগ, গুজরাট দাঙ্গায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিষ্ক্রিয় ছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট সেই বিষয়ে শুনবে বলেছে। ২০১২ সালে, বর্তমানে সিবিআইয়ের বিতর্কিত গুজরাট ক্যাডারের অফিসার রাকেশ আস্থানার নেতৃত্বে গঠিত ‘সিট’ বলেছিল, নরেন্দ্র মোদী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন দাঙ্গা থামাতে। যদিও সম্প্রটি এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার, লেফট্যানেন্ট জেনেরাল জামির উদ্দিন শাহ, তাঁর লেখা ‘সরকারি মুসলমান’ নামের বইয়ে অভিযোগ করেছেন, তিনি বাহিনী নিয়ে দাঙ্গা থামাতে আমদাবাদ গিয়েছিলেন সরকারি নির্দেশে। কিন্তু তাঁর বাহিনীকে গাড়ি না দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল আমদাবাদে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তখন, এক গভীর রাতে তাঁর বাড়িতে গিয়েও দেখাও করেছিলেন। কিন্তু কোনও কাজ হয়নি।

যে মুখ্যমন্ত্রীর আমলে এত বড় দাঙ্গা হয়ে গেল, তাঁর দলকে ভোটে জিতিয়ে আনা, সেই একই মুখ্যমন্ত্রীকে ফের মুখ্যমন্ত্রী হতে সাহায্য করা মানে তো বলা যায় দাঙ্গার পিছনে গণতান্ত্রিক সমর্থন ছিল। গণতন্ত্রে সংখ্যালঘুদের বিপদটা এখানেই। সংবিধান একজন সংখ্যালঘুকে, সংখ্যাগুরুর যে কোনও প্রতিনিধির মতোই একই সম্মান দেয়। কিন্তু আমাদের সংখ্যাগুরু পরিচালিত গণতন্ত্র সংবিধানের এই আদর্শকে অনেক ক্ষেত্রেই যথাযোগ্য সম্মান করছে না, এমন নজির অসংখ্য।

বিদ্যাসাগর যখন বালিকা বিবাহ বন্ধ করতে আইন করছেন, তখন এই আইন না করার জন্য বিভিন্ন দরখাস্তে যত স্বাক্ষরকারী ছিলেন, পক্ষে অত স্বাক্ষরকারী ছিলেন না। কিন্তু সেই আইন হয়েছিল, কারণ তখন আজকের গণতন্ত্র ছিল না। থাকলে হয়তো আটকে যেত, যেভাবে সংসদে আটকে আছে মহিলা বিল। যেভাবে কার্যত আটকে আছে সুপ্রিম কোর্টের শবরীমালা রায়।

সংবিধান কোনও রাজনৈতিক দলেরই আদর্শ নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নিজেদের আদর্শ এবং অ্যাজেন্ডা নিয়ে চলে। সংবিধানের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলির শ্রদ্ধা, দায়বদ্ধতা বাড়লে হয়তো এই সমস্যা কিছুটা দূর করা সম্ভব। এর বাইরে এই সমস্যা থেকে মুক্তির উত্তর সম্ভবত কারও জানা নেই।

 

(মতামত লেখকের নিজস্ব)  

Developed by DXDasia