রাষ্ট্রের হাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক কি আদৌ নিরাপদ?

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো চলছে পুরোপুরি অপেশাদার ঢঙে

সাত বছর ধরে নীরব মোদি ও মেহুল চোকসির বিভিন্ন সংস্থার কর্তারা পিএনবি–র একটি শাখা থেকে ১৪৩টি লেটার অফ আন্ডারটেকিং ও ২২৪টি লেটার অফ ক্রেডিট জোগাড় করে ফেললেন, যার প্রত্যেকটিই অবৈধ। এগুলো সবই এক ধরণের ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি, যা জমা রেখে বিদেশে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পাওয়া যায়। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ সাড়ে এগারো হাজার কোটি। দেশের সব থেকে বড় জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসার পর রাজনৈতিক তরজা জমে উঠল, যেন পাসিং দ্য পার্সেল খেলা চলছে। অবশ্যই খেলাটা শুরু করেন রাহুল গান্ধী, কিছু ক্ষুদ্র লাভের উদ্দেশ্যে। সঙ্গেসঙ্গে বিজেপিও জবাব দিতে নেমে পড়ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন। কংগ্রেস, বিজেপি, তৃতীয় ফ্রন্ট, কারও সরকার কোনওদিন ব্যাঙ্কের টাকা হাওয়া করে দেওয়ার খেলায় বিন্দুমাত্র বিঘ্ন ঘটায়নি। নরেন্দ্র মোদি নিজেকে চৌকিদার বলে দাবি করে একটু ফেঁসে গিয়েছেন। অন্যরা ভোজবাজি দেখেও দেখতেন না, নিজেদের চৌকিদার বলে দাবিও করতেন না। কিন্তু প্রশ্ন হল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক সরকারি কর্তাদের হাতে কি আদৌ নিরাপদ? নাকি এখনই এগুলিতে পেশাদার পরিচালক বসানো দরকার, এবং ব্যাপকভাবে বিভিন্ন স্তরে বদল ঘটিয়ে পেশাদারদের দিয়ে নজরদারির ব্যবস্থা করা দরকার, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ব্যাঙ্কের টাকা লুঠের জন্য মনমোহন সিং বা নরেন্দ্র মোদির দিকে সরাসরি আঙুল তোলা যায় ঠিকই, কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হয় না। এমন প্রমাণ তো নেই যে তাঁরা ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বা জালিয়াতির ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছেন। বিজয় মাল্যর ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে মনমোহন সিং ও তাঁর মন্ত্রীদের একটা ভূমিকা ছিল। এখন মাল্য এইভাবে দেশকে ঠকাবেন, এটা তাঁরা ভাবতে পেরেছিলেন কিনা সেটা বলা কঠিন। নরেন্দ্র মোদিও তাঁর বাড়ির অনুষ্ঠানে ‘মেহুলভাই’ বলে বিশেষ খাতির করেছিলেন মেহুল চোকসিকে, যিনি এই ১১,৪০০ কোটির জালিয়াতির মূল কারিগর বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা জানি না, কেন মনমোহন বা মোদি ভাল করে জেনেবুঝে না–নিয়ে এভাবে অসততার কারবারিদের সঙ্গে নিজেদের নাম জড়িয়ে ফেলেন। কিন্তু মনমোহন বা মোদি ব্যক্তিগতভাবে অসৎ এমন কোনও প্রমাণ কখনও পাওয়া যায়নি। তাঁদের কাছ থেকে তাই আরও অনেক বেশি বিচক্ষণতা কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু মূল বিষয়টা হল, রাজনৈতিক কর্তাদের থেকে অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে ব্যাঙ্ক এবং আয়কর–ইডি’র মতো সংস্থার কর্তাদের এবং অডিটরদের। রাজনৈতিক চাপান–উতোরে সেই সত্যটা চাপা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

নীরব মোদি–চোকসিদের অনেক হিরে–জহরত বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। তাতে ৫–৬ হাজার কোটি উদ্ধার হয়েছে, এমন দাবিও করা হচ্ছে। মনে হয়, এই দাবি অসার। মানুষ হিরের দাম জানেন না। এক লাখ টাকা দামের হিরে অনায়াসে দশ লাখ টাকায় বিক্রি করে এইসব হিরে ব্যাবসায়ীরা। ব্র্যারন্ডের দাম হয়, মূল পণ্যটার নয়। যাঁদের অনেক টাকা আছে, তাঁরা এভাবে ঠকতে পছন্দ করেন। অন্য লোকেদের দেখান কত নামী ব্র্যাবন্ডের কত দামি জিনিস ব্যবহার করছেন তাঁরা। কিন্তু সরকার হাতে পাওয়ার পর যখন নিলাম করবে তখন কী দাম পাওয়া যাবে তাতে ঘোর সংশয় রয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, টাকা যতটা উদ্ধার করা যায় করা হোক, কিন্তু সেটা মোটেই যথেষ্ট নয়। কী করে এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটল? একটি শাখার দু–তিন জন কর্মী সাত বছর ধরে অবৈধ ভাবে এত গ্যারান্টি ইস্যু করে গেলেন, অথচ ওপরতলা কিছু ধরতে পারল না, অডিটররা কিছু বুঝতে পারলেন না!‌ অন্য যে ব্যাঙ্কগুলো নিজেদের হংকং শাখা থেকে ওই গ্যারান্টির ভিত্তিতে ঋণ দিল, তাদের একবারও কোনও সংশয় হল না? রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কর্তারা কিছু বুঝতে পারলেন না? এমন তো নয় যে এরা সবাই নির্বোধ মানু্ষ। তাহলে সত্যটা কী?

সত্যটা হল, পিএনবি–র ওই ডেপুটি ম্যানেজার গোকুলনাথ শেট্টি ও কেরানি মনোজ খারাটের কারচুপি ঢাকার জন্য আরও শত শত মানুষ বিভিন্ন জায়গায় সক্রিয় ছিলেন। মুম্বইয়ের ব্র্যাডি হাউসের শাখা মূল যে কারচুপিটা করত তাহল এই গ্যারান্টিগুলো ব্যাঙ্কের কোর ব্যাঙ্কিং সফ্‌টঅয়্যারে রাখা হত না। কিন্তু সেগুলো আপলোড করে দেওয়া হোত সুইফ্ট (‌সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাঙ্ক ফিনান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন)‌–এর সিস্টেমে। ফলে সব ব্যাঙ্ক তা দেখতে পাচ্ছিল, কিন্তু পিএনবি–র নিজস্ব সিস্টেম তা দেখতে পাচ্ছিল না। এইখানেই অনেকগুলো প্রশ্ন। হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন যেখানে জড়িত, সেখানে পিএনবি–র কেউ সুইফ্ট আর কোর ব্যাঙ্কিংয়ের রেকর্ড মিলিয়ে দেখছিলেন না? এত টাকার দায় নেওয়া হচ্ছে কেন, সেটা সুইফ্ট থেকে দেখে প্রশ্ম তুলছেন না রেগুলেটররা? প্রশ্ন তুলছেন না অডিটররা? দেখতে পাচ্ছে না রিজার্ভ ব্যাঙ্ক? সম্ভব?এই ঘটনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, অসাধু চক্র কত বিস্তৃত। হয়তো হাজার হাজার মানু্ষ এর সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া যারা গ্যারান্টির ভিত্তিতে টাকা দিয়েছিল, তাদের টাকা শোধ হচ্ছে না এমন কি একবারও হয়নি? তেমন হলে সেই টাকা শোধ করবে পিএনবি। যেখানে কোর ব্যাঙ্কিং–এ কোনও রেকর্ড নেই, সেখানে কিসের ভিত্তিতে সেই টাকা শোধ হবে?  

পুরো বিষয়টা থেকে একটা কথা স্পষ্ট। যেহেতু শেয়ার–হোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না, তাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো চলছে পুরোপুরি অপেশাদার ঢঙে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এফ ইন্ডিয়া বলছে, ২০১২–১৩ থেকে ২০১৬–১৭, এই পাঁচ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর মোট ৬১,২৬০ কোটি টাকা অনাদায়ী ঋণে পরিণত হয়েছে। তথ্য বলছে, ২০১২–১৩ সালে অনাদায়ী ঋণে পরিণত হয় ৬,৩৫৭ কোটি টাকা। প্রতি বছর বাড়তে বাড়তে ২০১৬–১৭ আর্থিক বছরে সেই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭,৬৩৪ কোটি টাকা। এভাবে চলতে থাকলে একদিন ব্যাঙ্কে রাখা আমার–আপনার টাকা নিরাপদ থাকবে না। যদি না ব্যাঙ্কে পুরোদস্তুর পেশাদারদের নিয়ে এসে পুরো কাঠামো ঢেলে সাজা হয়, এবং অত্যন্ত শক্তপোক্ত, স্বাধীন ভিজিল্যান্স তৈরি করা হয়। এখনকার দিনে কিন্তু এমন নজরদারি ব্যবস্থা সহজেই করা সম্ভব যাতে নজরদারদের সঙ্গে মূল ব্যাঙ্কের কর্মীদের কোনও যোগাযোগই থাকবে না।

Developed by DXDasia