সর্পাঘাতের চিকিৎসায় বিপ্লব আনছে ন্যাশানাল মেডিকেল কলেজ

প্রাণ বাঁচবে হাজার হাজার মানুষের

ইতিহাস গড়ছে ক্যালকাটা ন্যাশানাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এক বিশেষ ট্যাবলেটের ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করতে চলেছেন তাঁরা। যা সাপে কাটার ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ট্রায়াল সফল হলে যুগান্ত আসবে চিকিৎসাবিদ্যার জগতে।

ভারতে সাপের উৎপাত এক বড়ো সমসা। আজকের যুগেও এদেশে সাপের পুজো হয়, সাপের গর্তে দুধ ঢালেন ভক্তরা। অনেকেই জানেন না, ভারতকে বলা যেতে পারে সারা পৃথিবীর মধ্যে সর্পাঘাতের রাজধানী। সঠিক তথ্যের অভাবে কিংবা পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রত্যেক বছর প্রায় ৫০ হাজার লোকের মৃত্যু হয় সাপের কামড়ে। গরিব কৃষক এবং পশুপালক শ্রেণির মধ্যে সর্পাঘাত অবহেলা করার প্রবণতা রয়েছে। বেশির ভাগ সময় যিনি সর্পদংশনের শিকার হন, তাঁর ওপর সংসারের রোজগার নির্ভর করে। এইসব লোকের মৃত্যু হলে ভয়াবহ দারিদ্রের মধ্যে পড়ে গোটা পরিবার। 

সাপের বিষ প্রতিরোধ করার নতুন ট্যাবলেটের নাম ‘ভ্যারেসপ্ল্যাডিব’। ন্যাশানাল মেডিকেল কলেজের সঙ্গে যৌথভাবে এটি নিয়ে গবেষণা করছে মার্কিন সংস্থা ওফিরেক্স ইনকর্পোরেশন। তাঁদের মতে এই ট্যাবলেট ব্যবহার করা সহজ, প্রভাব স্থায়ী, দাম সাধ্যের মধ্যে এবং বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বিষ রুখতে সক্ষম। ইন-ভিট্রো ল্যাবের পরীক্ষায় এটি ব্যবহার করে সাফল্য মিলেছে। ইঁদুর এবং শুয়োরের ওপর প্রয়োগ করে তাদের প্রাণ বাঁচানো গিয়েছে। সাপ কামড়ালে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কামড়ের মুহূর্ত থেকেই বিষের ভিতরে থাকা প্রোটিন এবং অন্যান্য অণুর মিশ্রণ শরীরের ক্ষতিসাধন করতে থাকে, যতক্ষণ না অ্যান্টিবডি গিয়ে বিষাক্ত পদার্থকে ধ্বংস করে। অনেক সময়েই অ্যান্টিবডি প্রয়োগ করতে যথেষ্ট দেরি হয়ে যায়। ফলে রোগী আর প্রাণে বাঁচেন না।

২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অফিসিয়ালি স্বীকার করে যে ক্রান্তীয় অঞ্চলে সর্পাঘাত একটি অবহেলিত ব্যাধি। যে কারণে উদ্ভাবনী গবেষণার খাতেও খুব বেশি খরচ হয় না। গবেষকরা এখন সাপের কামড়ে ড্রাগ ব্যবহারের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। অ্যান্টিবডির বদলে ড্রাগের প্রয়োগ নতুন নয়। বিংশ শতকের শেষে অণুবিজ্ঞান এবং জিন প্রযুক্তির জগতে বিপ্লব আসে। বিজ্ঞানীরা সাপের বিষের মধ্যে থাকা ক্ষতিকারক উপদানগুলি চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। তখন থেকেই সর্পাঘাতের চিকিৎসায় ড্রাগ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 

গবেষক এবং সরীসৃপ বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রচলিত অ্যান্টিভেনামের মতো কোনো ড্রাগই সাপের বিষকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে পারে না। কিন্তু রোগীকে শরীরে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, যাতে তিনি হাসপাতালে যাওয়ার সময় পান। তবে অসাধ্যসাধন করতে পারে ‘জাদু’ ওষুধ ভ্যারেসপ্ল্যাডিব। সাপের কামড় খাওয়া ব্যক্তিকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনে। বিষের ক্ষতিকারক উপাদানগুলিকে নষ্ট করে দেয়।

প্রকল্পটির ট্রায়াল ফেসিলিটেটর স্নেহেন্দু কোনার জানিয়েছেন, পূর্ব ভারতের একমাত্র কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে ন্যাশানাল মেডিকেল। গবেষণা পরিকাঠামো এবং সাপে কামড়ানো রোগীর সংখ্যা দেখে এই প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ট্রায়াল হবে ৭২ জনকে নিয়ে। ৩৬ জনকে পাওয়া হবে প্লেসিবো অর্থাৎ যার কোনো ঔষধী গুণ নেই। বাকি ৩৬ জনের ওপর ভ্যারেসপ্ল্যাডিব প্রয়োগ করা হবে। সবারই নিয়মিত রক্তপরীক্ষা করা হবে। পর্যবেক্ষণ করা হবে, ভ্যারেসপ্ল্যাডিব ওরাল পিল বিষের প্রভাব কতটা কমাতে পারে। ট্রায়াল সফল হলে বহু হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচবে।  
 

Post Tags
Developed by DXDasia