আমি চাই, মানুষ এভাবেই মনে রাখুক আমার বাবাকে – অনিতা বসু পাফ

তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেইয়ে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় নেতাজির, চিতাভস্ম রাখা হয় টোকিয়োর রেনকোজি মন্দিরে

কলেই জানেন, চলতি বছরে পালিত হচ্ছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। ভাবলে বিস্ময় জাগে, আবার কিছুটা আনন্দও, যে তাঁকে শুধু ইতিহাসের নায়ক হিসেবেই মনে রাখেননি তাঁর দেশবাসী। আজও তিনি শ্রদ্ধা, সমীহ, এমনকি ভালোবাসারও পাত্র, বহু আবেগ জড়িয়ে তাঁর নামের সঙ্গে। অবশ্যই এই সবই তাঁর প্রাপ্য, তবে তাঁর চলে যাওয়া এবং ভারত স্বাধীন হওয়ার অনেক পরে আসা প্রজন্মও যে তাঁর আশ্লেষে এতটা আবদ্ধ, তা স্বতঃসিদ্ধ নয়।

ভারতের স্বাধীনতার স্বার্থে নিজের অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত জীবনে অসংখ্য বলিদান দিয়েছেন নেতাজি। সেই কৈশোরে কলেরা রোগীদের সেবা দিয়ে শুরু। তারপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ছাত্রনেতা হিসেবে বর্ণবিদ্বেষী প্রফেসর ওটেনের সঙ্গে সংঘর্ষ। এতটাই, যে ওটেনকে শারীরিক নিগ্রহ করার ঘটনায় সম্পূর্ণ সায় ছিল তাঁর, সম্ভবত অংশগ্রহণও। ফলস্বরূপ কলেজ থেকে বহিষ্কার, যদিও সৌভাগ্যক্রমে তাতে বিদ্যাচর্চায় ব্যাঘাত ঘটেনি। পরবর্তী জীবনে প্রভূত অর্থ এবং সম্মানের লোভ ত্যাগ করে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে অস্বীকার করেন। জানতেন, তাঁর সহ নাগরিকদের প্রতি অসম্মানজনক এই প্রতিষ্ঠানে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন না।

বিলেত থেকে ভারতে ফিরে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের একনিষ্ঠ নেতা। বারবার জেলে যেতে হয় তাঁকে, যার ফলে স্বাস্থ্য ভেঙে যায় চিরদিনের মতো। দেশ থেকে একরকম নির্বাসিত, সুতরাং চিকিৎসা করাতে হয় ইউরোপেই। তবে এই সুযোগে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বার্তা পৌঁছে দেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এদিকে ভারতে দুবার কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন, দ্বিতীয়বার মহাত্মা গান্ধির বিরোধিতা সত্ত্বেও। তবে সেবার গান্ধি এবং কংগ্রেসের রক্ষণশীল অংশের দৌলতে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়, ফলত কংগ্রেসের সদস্য হয়ে থাকলেও দলের মধ্যেই বাম-ভাবাপন্ন অংশের প্রতীক হয়ে ওঠেন তিনি, যা পরবর্তীকালে হয়ে দাঁড়ায় ফরওয়ার্ড ব্লক।

ইউরোপে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নেতাজি আশা করেছিলেন, ব্রিটেনের শত্রু রাষ্ট্রগুলি ভারতের স্বাধীনতার লড়াইকে সমর্থন জানাবে। সুতরাং আরও অনেক নেতার মতোই ১৯৪০ সালে ফের একবার ব্রিটিশদের হাতে বন্দি হওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, দেশের বাইরে গিয়ে এই সমর্থন জোগাড় করতে হবে। এরপরেই ঘটে ইতিহাস বিখ্যাত সেই অভিযান, গৃহবন্দি অবস্থা থেকে আফগানিস্তানের কাবুলে পলায়ন। অসীম বিপদসঙ্কুল সেই যাত্রাপথের কিছুটা পায়ে হেঁটেও যেতে হয় তাঁকে। সেখান থেকে জার্মানির বার্লিন এবং ইন্ডিয়ান লিজিয়ন-এর স্থাপনা।

যুদ্ধের ওঠাপড়ায় পশ্চিমের রঙ্গমঞ্চে যখন মনে হতে লাগল যে ভারতীয় স্বার্থের বিপক্ষে যাচ্ছে যুদ্ধের গতি, তখন পূর্ব এশিয়ায় ফিরে আসার এক অতি বিপজ্জনক প্রস্তাব পেলেন নেতাজি, জার্মানি এবং জাপানের তরফে। সূত্রপাত ঘটল আরও এক দুঃসাহসিক অভিযানের, যার ফলে ডুবোজাহাজে চেপে পূর্ব এশিয়ায় ফিরে এসে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (আইএনএ)-র নেতৃত্ব গ্রহণ করে নির্বাসনে থেকেই অস্থায়ী ভারত সরকার গঠনের ঘোষণা করলেন তিনি। জাপানি সেনাবাহিনির সাহায্যে ভারতের সীমান্তও পেরোলেন, কিন্তু যুদ্ধে জয়লাভ হল না, বর্ষা এবং ভাগ্যদেবী বাদ সাধলেন। ওদিকে ১৯৪৫-এর অগাস্ট মাসে হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমা পড়ার পর জাপানের আত্মসমর্পণের ফলেও আইএনএ-র অভিযানে ইতি টানতে হল।

অধুনা তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেইয়ে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় নেতাজির। তাঁর চিতাভস্ম রাখা হয় টোকিয়োর রেনকোজি মন্দিরে, যা তখন জাপানিরা একটি সাময়িক পদক্ষেপ বলেই জানত।

ভারতের স্বাধীনতা লাভ দেখে যেতে পারেননি আমার বাবা। দেশভাগের বীভৎসতার যে অশেষ যন্ত্রণা, তা তাঁকে কতটা আঘাত করত, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারি না আমরা। তিনি মনে করতেন, শুধুমাত্র আইন অমান্য আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা আসবে না, সশস্ত্র বিপ্লবও প্রয়োজন, কিন্তু স্বাধীন ভারতীয়রাই স্বাধীন ভারতীয়দের বিরুদ্ধে লড়ছে, এই পরিণতি তাঁর গভীর মনকষ্টের কারণ হত। এই পরিণাম কি তিনি আটকাতে পারতেন? আমরা জানি না।

স্বাধীনতা প্রবলভাবে কামনা করেছিলেন অসংখ্য ভারতীয়। প্রায় সকলেই আশা করেছিলেন রাজনৈতিক – এবং আইএনএ-র ক্ষেত্রে সামরিক – সাফল্য আসবে। ভরসা ছিল, এই সাফল্য এলে দেশের সামনে খুলে যাবে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, অনেকটা সহজ হয়ে যাবে কঠিন পরিস্থিতি। আজ পেছন ফিরে দেখলে মনে হয়, হয়তো কিছুটা অবাস্তব ছিল এই আশা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও একই রকম আর্থ-সামাজিক জড়তার বহুবিধ চিহ্ন দেখেছি আমরা। তবে ভারতের ক্ষেত্রে এছাড়াও ছিল দেশভাগের ফলে একদিকে হিন্দু-মুসলমানের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, অপর দিকে একাধিক ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। যুদ্ধ এবং অস্ত্র সংগ্রহের খাতিরে দুই দেশেরই সীমিত পুঁজির অপব্যয়।

নেতাজি তাঁর নানা ভাষণে এবং লেখায় যে দেশের মানবসম্পদের “অসম্পূর্ণ ব্যবহার”-এর কথা বারবার বলেছেন, তাই কি অতিক্রম করতে পেরেছে ভারত? পেরেছে জাতপাতের সুদৃঢ় শৃঙ্খল ছিঁড়ে বেরোতে? নেতাজি মনে করতেন, ভারতের পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠী এবং নারীশক্তির বিকাশ ঘটানো অবশ্য প্রয়োজন। আমার মতে, বেশ খানিকটা অগ্রগতি সত্ত্বেও এই দুই ক্ষেত্রে আরও সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। 

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এটা বলাই যায় যে ভারত নানা ক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছে। তবে দারিদ্র্য বা নিরক্ষরতা দূরীকরণ তো কোনও ম্যাজিক নয়। ভারতের সামনে যে চ্যালেঞ্জ, তা আজও বর্তমান। ব্রিটিশ শাসক ভারত ছেড়ে যাওয়াতেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়নি, তা তো আর বলে দিতে হয় না। ভারতের নাগরিকদের বিপুল প্রতিভা এবং মস্তিষ্ক শক্তির উপযুক্ত ব্যবহার যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে বিরাট সহায়, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। জনসংখ্যার নিরিখে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র ভারত। নিঃসন্দেহে তা যেমন গর্বের বিষয়, তেমনই একথাও অনস্বীকার্য যে আজও দেশের এক বিরাট অংশ দারিদ্র্য কবলিত, পালানোর পথ নেই।

নেতাজির দূরদর্শিতা এবং ন্যায়পরায়ণতা তাঁর মনে এই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল যে, দেশ এবং দেশবাসীর স্বার্থে কোনও বলিদানই অসম্ভব নয়। গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ হলেও সমস্ত ধর্মমতের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ সহিষ্ণুতা। হয়তো নিজের ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল বলেই অন্যান্য মতকে সঙ্গে নিয়েই দেশের ভবিষ্যতের জন্য নিজস্ব রেখাচিত্র নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। অত্যন্ত আধুনিক মনের মানুষ ছিলেন, কিন্তু নিজের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং মনস্তাত্বিক শিকড় হারিয়ে ফেলেননি কখনোই।

প্রতিটি যুগেরই নির্দিষ্ট কিছু সমস্যা, বিপদ, চ্যালেঞ্জ থাকে। সকলকেই নিজের মতো করে সেগুলির মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু কিছু মানুষ বরাবরই আছেন, যাঁরা অন্যদের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা পান। আমি মনে করি, নেতাজি যে যুগের মানুষ, তার সঙ্গে আজকের যুগের অনেক ক্ষেত্রে তফাৎ থাকলেও তিনি বর্তমান প্রজন্মের আদর্শ হতে পারেন। তাঁর বা তাঁর সমসাময়িক অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর মতো ত্যাগ শিকার করার ক্ষমতা, নিষ্ঠা, সামর্থ্য বা ইচ্ছা হয়তো আমাদের নেই, হয়তো আমরা মানুষ হিসেবে তাঁদের সমকক্ষ নই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমরা আমাদের সাধ্যমতো সমাজের বা ব্যক্তির সেবা করব না। নিজের পারিপার্শ্বিকের উপকার করতে পারার যে সন্তুষ্টি, তা থেকে নিজেদের বঞ্চিত করব কেন? এর দ্বারা তো সমাজেরও ভালো হবে।

পরিশেষে বলি, নেতাজির জীবনের অন্তত তিনটি প্রধান ধারা আজও আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিকঃ

নেতাজি তথা আইএনএ-র সর্বধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সমস্ত সদস্যের একে অপরের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ভারতে ধর্মীয় মতের ভিত্তিতে হিংসার ঘটনা বারবার ঘটেছে। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত, কথায় এবং কাজে।

লিঙ্গ সমতা এবং নারীমুক্তির কথা বরাবর বলতেন নেতাজি। আজ সারা পৃথিবীতে নারীবিরোধী অপরাধের তালিকায় ভারতের নাম একেবারে প্রথম সারিতে। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত, কথায় এবং কাজে।

নিপীড়িত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভেদাভেদের তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি। কিন্তু আজও তথাকথিত শিক্ষিত এবং সুশীল সমাজ সেই বিভাজনকারী মনোভাবের শিকার। দারিদ্র্য, অসুখ এবং শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একমাত্র অস্ত্র হল উন্নত শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থা। কারণ সমাজের তথাকথিত উন্নত বর্গেরও বোঝা উচিত, অসাম্য এবং বিভাজন শেষ পর্যন্ত সমগ্র সমাজের পক্ষেই ক্ষতিকারক। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত, কথায় এবং কাজে।

*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। 

Developed by DXDasia