এখনও অপেক্ষা করে থাকি, কোন অসময়ে সেই উদাত্ত কণ্ঠে ডাক শুনব
অনিল চট্টোপাধ্যায়
শক্তি যদি শুধুই কবি হত তাহলে কি সেটা খুব ভাল ব্যাপার হত? আমার তো মনে হয় অনিল চট্টোপাধ্যায়ের থেকেও বাজে ব্যাপার হত সেটা। বয়সে কিছুটা বড় হবার সুবাদে, তাছাড়া এমনিতেও ছোট ভায়ের মত ভালবাসি শক্তিকে। ওর ভিতরে যে একটা দুষ্টু ছেলেমানুষ ‘শক্তি’ বাস করে সেই ওকে আমাদের কাছে বড় হতে দেয় না কখনও। সেই সহজ সরল দুষ্টু ছেলেমানুষ শক্তিকে বড্ড ভালবাসি আমি। ও এমনই যে ওকে ভাল না বেসে পারি না। ওকে এমন ভালবাসি বলেই বোধহয় এই জীবনটাকেও ভালবাসতে ইচ্ছা করে।
শক্তির সম্বন্ধে বলতে গেলে অনেক ছোট ছোট কথাই আজ বলতে হয়। প্রথমদিকের শক্তির বোহেমিয়ন জীবনযাত্রার ধাক্কা অন্য অনেকের মতনই আমাকেও যে সামলাতে হয়নি তা নয়। কতবার যে প্রতিজ্ঞা করেছি, নাঃ আর নয়। শক্তির সঙ্গে কোন সম্পর্কই রাখব না আর। কিন্তু তা হয়নি, আবার ছোটভাই হিসেবে ওর ছোটখাট আবদার বা দুষ্টুমি মেনে নিতে হয়েছে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও। পরের দিনের শক্তির একাগাল নিষ্পাপ হাসি আর মিষ্টি করে ডাকা সেই “অনিলদা রাগ করেছ নাকি? ধুস্” এর সামনে বার বারই অসহায় হয়ে পড়েছি। সত্যিই রাগ করে থাকতে পারিনি ওর উপর!
আমার দীর্ঘ অভিনয় জীবনে বহু মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। তাদের অনেকের সঙ্গেই মাঝেমধ্যে দেখাসাক্ষাৎ কুশল বিনিময় হয় কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই যে এদের মধ্যে কেউই শক্তির মত কিছুটা জবরদস্তি আর বাকি সবটাই শিশুর সারল্যে ভালবাসা কেড়ে নিতে পারেনি। আজ শক্তি নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যজগতে একটা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে কিন্তু সেটা আমার কাছে কোন বড় ব্যাপার নয়, শক্তি শুধু শক্তি বলেই চিরকাল আমার কাছে যা ছিল আজও ঠিক তাই আছে।
আরও পড়ুন
সামনে বিনয়ের অবতার, আসলে মিটমিটে শয়তান
অভিনেতা হিসেবে চিত্রাভিনয় এবং চিত্রজগতের যাবতীয় কর্মকাণ্ডর সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছি সারাজীবন। সাহিত্যপ্রেমী হবার দরুন কাব্য, সাহিত্যে আমার যথেষ্ট উৎসাহ আছে, এইসবের সঙ্গে আমার খুব বেশি সরাসরি সম্পর্ক ছিল না তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি আমার জীবনের বাইরে যদি কিছুমাত্র সাহিত্য বা কাব্যের স্পর্শ থাকে তা শক্তিই এনে দিয়েছে আমার জীবনে। বিশেষ বিশেষ মরসুমে নানান রকম বিচিত্রানুষ্ঠান, নানা সম্মেলন টম্মেলন বিভিন্ন জায়গায় হয়ে থাকে বলে শুনেছি কিন্তু সে সম্বন্ধে আমার কোন সম্যক জ্ঞান ছিল না আর কখনও কোন কিছুতে অংশগ্রহণও করিনি আমি। বছর ছ-সাত আগের একটা ঘটনার কথা বলি- আগের সারাদিন এবং রাতের শিফটেও শুটিং করে বাড়ি ফিরে পরের দিন ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়েছিল। শুনলাম কারা সব এসে বসে আছেন আমার জন্যে। উঠে চোখমুখে জল দিয়ে বসার ঘরে এসে দেখি শক্তি, সঙ্গে সৌমিত্র মিত্র আর অপরিচিত এক ভদ্রলোক। পরিচয় হল, ভদ্রলোকের নামটা মনে নেই, বার্নপুর থেকে এসেছেন। কথাবার্তা হতে লাগল, শক্তি চুপচাপ বসে্ শ্রোতার ভূমিকায়। মাঝে মাঝেই দেখি সৌমিত্র বলছে, শক্তিদা কথাটা বলো না। শক্তি মুখ খুলল-বার্নপুরে ভারতী ভবন নামক একটি সংস্থা প্রতিবছর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে, বেশ নামী আর বড়সড় ব্যাপার। এই ভদ্রলোক তার পক্ষ থেকে আমাকে নিমন্ত্রণ জানাতে এসেছেন। বললাম-সে তো ভাল কথা, করুক না ভারতী ভবন অনুষ্ঠান। কিন্তু আমি সেখানে যাব কেন তা তো বুঝছি না। শক্তি চুপ। ভদ্রলোক কাঁচুমাচুভাবে কটি পোস্টার বার করে দেখালেন। শিল্পী অনিল চট্টোপাধ্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার কথা তাতে ছাপা হয়েছে এবং বার্নপুরের সর্বত্র তা নাকি বিতরণও করা হয়ে গিয়েছে অর্থাৎ কাজকর্ম সবই শ্রীমান শক্তি আমার তরফ থেকে সেরে রেখেছে। আমাকে না জানিয়েই কথা দিয়ে ফেলেছে শক্তি। ছোটভাইয়ের দেওয়া কথার দায় রাখাতে অগত্যা আমাকে যেতেই হয় বার্নপুর। আগেই বলেছি এই বিষয়ে কোন ধারনাই ছিল না আমার। নির্দিষ্ট সময়ে হাওড়া স্টেশনের বড়ঘড়ির নিচে গিয়ে দেখি সমস্ত কলকাতার সব বাঘা বাঘা শিল্পীরা সদলবলে চলেছেন বার্নপুর। নানা বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও কিভাবে বার্নপুরে গিয়ে পৌঁছলাম, সবার সঙ্গে একত্রে থাকলাম (যদিও কর্তৃপক্ষ আমার জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন) স্থানীয় মানুষ জনের সঙ্গে পরিচিত হলাম এবং সর্বোপরি অল্পসময়ের সামান্য প্রস্তুতি নিয়ে সার্থক একটি অনুষ্ঠানের অংশীদার হলাম সে আলাদা গল্প, তাতে আর শক্তির কোন ভূমিকা নেই। তবে শুধু শক্তির জন্যই সেবার চেনাজানা জগতের বাইরে নতুন রকমের কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। গীতি আলেখ্য মত হয়েছিল একটা, তাতে সংলাপে অংশ গ্রহণ করেছিলাম আমি ও রাজু, মানে রাজেশ্বরী রায়চৌধুরী।
আরও পড়ুন
‘নিজের জীবনটাকেই শক্তি বাজি ফেলল’
তারপর কিন্তু শক্তি উধাও। ওর আর দেখা নেই। বেশ কিছুদিন পরে হঠাৎই আবার দেখা হয়ে গেলে দিল্লি এয়ারপোর্টে, সঙ্গে মীনাক্ষী। দুজনেরই হাতে ভারী ভারী গরম জামাকাপড়। শুনলাম কিছুদিনের জন্য ইউরোপ সফর করে বাড়ি ফিরছে ওরা। মীনাক্ষীকে জিজ্ঞেস করলাম- ‘দুষ্টুমি টুষ্টুমি করেনি তো ছেলেটা’? মীনাক্ষীর মুচকি হাসি। উত্তর দিল শক্তি- ‘বিদেশ যাব আর দুষ্টুমি করব না তা হয় নাকি? একটু আধটু দুষ্টুমি তো করেইছি। ওটা কোন ব্যাপারই না।’
আমি কিন্তু এখনও অপেক্ষা করে থাকি কোন অসময়ে সেই উদাত্ত কণ্ঠে ডাক শুনব –‘অনিলদা বাড়ি আছো?’
শক্তির জন্য তো অপেক্ষা করা যায়ই।
(ঋণ – ‘শক্তির কাছাকাছি’ সংকলন গ্রন্থ)