নজরুল ইসলামের কাছেই শিখছেন নজরুল সঙ্গীত। গাইছেন “ভুলি কেমনে…”
দর্জিপাড়ার সেই মেয়েটা একা একা গান গাইতেন বাড়ির দোতলায়। রেওয়াজ চলত বেশ নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশে। সাজগোজে পরিপাটি শৌখিন ছাপ। সদ্য পাটভাঙা সাদা তাঁতের শাড়ি, হাতে ক’য়ের গাছা সোনার চুড়ি, গলায় মোটা সোনার হার, চোখে মোটা কাচের চশমা। বিকেলে এক চিলতে বারান্দায় এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন। অভিমান কখনও পিছু ছাড়েনি যে! আকাশে উড়ে যাওয়া পাখিদের দলই যেন তাঁর একমাত্র বন্ধু।
তিনি আঙ্গুরবালা। বাংলার বুলবুল। রসিক লোকেদের কানে সুরের মধু ঢালা ছিল তাঁর স্বভাব। যার কানে সেই সুর একবার গেছে সে কোনদিনই আর ভুলতে পারেনি। গ্রামোফোনের টার্নটেবলে ঘুরতে থাকা সেই কালো গালার রেকর্ডে যখন শুরু হচ্ছে আঙ্গুরবালার গান, তখন সে গানের আকুতি কিংবা মাদকতা মুগ্ধ করত সব বয়সের শ্রোতাদের। মিস আঙ্গুরবালা ছিলেন কিছুটা অভিমানী এবং অহংকারীও। সে কালে মেয়েদের গান গাওয়াটা সমাজ ভালো চোখে দেখত না। সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে গান গাওয়াটাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। গানই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম প্রেম।
১৯০০ সালে আঙ্গুরবালার জন্ম উত্তর কলকাতার কাশীপুরে। ছোটবেলাটা কেটেছিল শ্যামপুকুর অঞ্চলে। তাঁর বাবার দেওয়া নাম প্রভাবতী। ডাক নাম নেড়া। ছোটবেলায় লেখাপড়া শুরু দর্জিপাড়ায় জয়রাম মিত্র স্ট্রিটের একটি মিশনারি স্কুলে। শোনা যায় তিনি মেধাবী ছাত্রী ছিলেন আর সেইজন্য স্কুল থেকে পেয়েছিলেন ডবল প্রোমোশন।
দর্জিপাড়ার স্কুলে পড়ায় সময় এক দিন আঙ্গুরবালা আর তাঁর বন বিজু, স্কুলে যাওয়ার পথে একটি বাড়ির জানালার সামনে ভিড় দেখে আর গানের গানের আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। দেখেছিলেন, ভিতরে একটা যন্ত্র চলছে, আর একটি মেয়ের গান শোনা যাচ্ছে। দেখে দুই বোন অবাক হয়ে ভেবেছিল যে একটি মেয়েকে নিশ্চয়ই ওই যন্ত্রটির ভিতরে হাত পা কেটে বন্দী করে রাখা হয়েছে, আর সেই গান করছে! গ্রামোফোন সম্পর্কে তাঁর সেই ধারনা বহুদিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পরে সে যুগের বিখ্যাত গায়ক মন্তাবাবু ও জিতেন ঘোষ আঙ্গুরবালার গান শুনে তাঁকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান রেকর্ড করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ব্যস! গান রেকর্ড করার কথা শুনেই আঙ্গুরবালা আঁতকে উঠেছিলেন। মনে পড়ে গিয়েছিল ছেলেবেলার সেই ধারণাটা। মনে মনে খুব ভয়ও পেয়েছিলেন। রাজি হলেন অবশেষে। আঙ্গুরবালা শুরু করলেন ‘বাঁধো না তরী খানি’ গানটি। গান শেষ হতেই সাহেব বলে উঠলেন, “ওয়ান্ডারফুল, ওয়ান্ডারফুল! গান রেকর্ড হয়ে গেছে।” আঙ্গুরবালা হতবাক! গান রেকর্ড করার ভয় কেটে যাওয়ায় সে দিন আরও কয়েকটি গান রেকর্ড করেছিলেন। এই তাঁর প্রথম রোজগার। সেদিন সাহেবদের থেকে চল্লিশ টাকা সাম্মানিক হিসাবে পেয়েছিলেন। প্রভাবতী হয়ে গেলেন আঙ্গুরবালা। কিছু দিনের মধ্যেই আঙ্গুরবালার গানের রেকর্ড ছেয়ে গিয়েছিল গোটা বাংলায়। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তাঁর গানের রেকর্ডই সব থেকে বেশি বিক্রি হত। প্রতি মাসে কম করে তিন-চারটি রেকর্ড প্রকাশিত হত। সে যুগে এটা একটা বড় ব্যাপার ছিল।
এক এক করে শিখলেন ঠুমরী গজল দাদরা কীর্তন। আর শিখেছিলেন নজরুলগীতি, তাও আবার স্বয়ং কাজী নজরুলের কাছেই। বিশেষ উল্লেখযোগ্য, ১৯২৮ সালে নজরুলের কথায় সুরে ও পরিচালনায় তিনি রেকর্ড করেছিলেন ‘ভুলি কেমনে আজও যে মনে’ গানটি। ক্রমেই আঙ্গুরবালা হয়ে উঠেছিলেন নজরুলের গানের এক অপ্রতিদ্বন্ধী শিল্পী। সারা জীবনে হিন্দি, বাংলা উর্দু ভাষায় অসংখ্য গান রেকর্ড করেছেন। আর সেই সব অনবদ্য গানই তাঁকে ‘বাংলার বুলবুল’ এবং ‘কলকাত্তা কি কোয়েল’ খেতাবও দিয়েছিল।
পরিণত বয়সে এসে আঙ্গুরবালা বাজার ধরলেন। বাড়ল পারিশ্রমিক। মুজরার দক্ষিণা হয়ে গেল তিরিশ হাজার টাকা। আঙ্গুরবালা এতটাই জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন যে তাঁর নাম লেখা শাড়ি বাজারে বেরিয়েছিল, আর সেকালের মহিলারা সেই শাড়ি পরতেন নানারকম আচার-অনুষ্ঠান বা বিয়েবাড়িতে। এমনকি সেকালের নাম করা পানের দোকানে পাওয়া যেত খানদানি আঙ্গুরবালা পান।
নিজের জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখতে পারেন ক’জন শিল্পী! আঙ্গুরবালা পেরেছিলেন। ওই জেদি অভিমানী মেয়েটা সঙ্গীতকে ধারণ করতে শিখেছিলেন। নজরুল ইসলামের সাহচর্যে এসে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। অবসরে সেই এক চিলতে বারান্দা, আকাশ আর একঝাঁক পাখিদের উড়ে যাওয়া। এই দৃশ্যের মধ্যেও কি সুর নেই? আছে। আমাদের প্রতিদিনের কানে কানে কখনও না কখনও সেই সুর বেজে ওঠে। আঙ্গুরবালা গ্রাস করেন আমাদের।