অনন্ত সিংহ ও একটি আত্মসমর্পণ

‘এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং সম্পূর্ণ গোপনীয়’

কেন ইংরেজদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন অনন্ত সিংহ? এই প্রশ্ন আজও কুয়াশায় ঘেরা। শুধু কিছু অনুমান উঁকি মারে, স্পষ্ট কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি মোটেই। তাঁর মতো দুর্ধর্ষ বীর আত্মসমর্পণ করলেন – এটা কি ফাঁসির হাত থেকে বাঁচার কৌশল?

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযানে মাস্টারদা সূর্য সেনের অন্যতম সহযোগী ছিলেন অনন্ত সিংহ। অবশ্য এর আগেও, ১৯২৩-এর ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম শহরের একপ্রান্তে বাটালি পাহাড় এলাকায় সরকারি রেলের টাকা লুণ্ঠন করেন তিনি ও তাঁর সহযোগীরা। অনন্ত সিং, দেবেন দে ও নির্মল সেন। সে সময় সুলুকবাহার এলাকায় ছিল বিপ্লবীদের সদর দপ্তর। ২৪শে ডিসেম্বর এই দপ্তরে পুলিশ হানা দেয়। ১৯২৪ সালে বিপ্লবী কাজকর্মের জন্যয় গ্রেপ্তার হয়ে চার বছর কারাগারে থাকেন অনন্ত। আর, মাস্টারদা অত্যন্ত ভরসা করতেন দুর্দম এই যুবককে। ১৯৩০-এর ১৮ এপ্রিল অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন ৬৫ জন যোদ্ধা। এদের একটি ছোট দলকে নেতৃত্ব দেন অনন্ত। চট্টগ্রাম চারদিনের জন্য ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ছিল। এই আক্রমণের সময় রাত্রের অন্ধকারে অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষ, আনন্দ গুপ্ত, জীবন ঘোষাল মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাই মূল দলটি ১৯শে এপ্রিল এঁরা সুলুকবহর পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আর এঁরা আত্মগোপন করার চেষ্টা করেন। চট্টগ্রাম থেকে আট মাইল দূরে পুটিয়ারি রেলস্টেশনে আসেন। এই সময় স্টেশন মাষ্টার এদের দেখে সন্দেহ করেন এবং টেলিগ্রাম করে দূরবর্তী স্টেশনগুলোতে জানিয়ে দেন। ফেনীতে রেলগাড়ি প্রবেশ করলে, অনন্ত সিং এবং গণেশ ঘোষ প্রকৃতির তাগিদে স্টেশনে নামেন। এরপর পুলিশ রেলগাড়িতে উঠে যাত্রীদের তল্লাসি শুরু করে। এই সময় অনন্ত সিংহ আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এরপর বাকি তিনজনের সাথে মিলিত হন চন্দননগরে।

এরপরই ঘটে সেই আশ্চর্য ঘটনা। ২৮ জুন, ১৯৩০-এ আত্মসমর্পণ করেন অনন্ত সিংহ। এই আত্মসমর্পণ সম্পর্কে গোয়েন্দা কর্মকর্তা লোম্যানকে এক চিঠিতে এই আত্ম সমর্পণের কথা জানিয়ে চিঠি লেখেন।

'প্রিয় মিঃ লোম্যান,
১৯৩০ সালের ২৮শে জুন আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব। আমি নিশ্চিন্ত যে, আমাকে গ্রেপ্তার করার সে সুযোগ তুমি হারাবে না। আমি তার জন্য প্রস্তুত। মনে কর না যে, আমি আত্মসমর্পণ করছি। লোকে কখন আত্মসমর্পণ করে? যখন সে একান্ত অসহায় বা আত্মরক্ষার কোন পথ পায় না, তখনই সে নত হয়।

আমি কি এখন অসহায়? না, কখনোই না। আমার আত্মরক্ষার অস্ত্র আছে, খরচ করার মতো প্রচুর অর্থ আছে, সহায়তা করার মতো লোকও আছে। বাংলা, বাংলার বাইরে বা ভারতের বাইরে থাকবার মতো আশ্রয়ও আছে। তবুও যে ধরা দিচ্ছি, তার কারণ কি? তুমি কি ভেবেছ আমার কাজের জন্য আমি অনুতপ্ত? না. কখনোই না। আমি একবিন্দু দুঃখিত নই। তবে কি উপর থেকে আমার ওপর কোন আদেশ এসেছে? না, এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং সম্পূর্ণ গোপনীয়।

বিদ্রোহী অনন্তলাল সিংহ

অথচ এরপরও শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে পারেননি তিনি। অনন্ত সিং ও অন্য নয়জনের দ্বীপান্তর হয়। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে আন্দামান সেলুলার জেলে অনশন ধর্মঘট শুরু হলে রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজী প্রমুখের চেষ্টায় বন্দীদের আন্দামান থেকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মুক্তিলাভ করেন।

‘আমার আত্মরক্ষার অস্ত্র আছে, খরচ করার মতো প্রচুর অর্থ আছে, সহায়তা করার মতো লোকও আছে। বাংলা, বাংলার বাইরে বা ভারতের বাইরে থাকবার মতো আশ্রয়ও আছে। তবুও যে ধরা দিচ্ছি, তার কারণ কি?’ – এই প্রশ্ন আমাদেরও। অনুতপ্ত যে তিনি হননি, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন পরের বাক্যেই। ‘তুমি কি ভেবেছ আমার কাজের জন্য আমি অনুতপ্ত? না, কখনোই না। আমি একবিন্দু দুঃখিত নই।’ তাহলে কেন? এ-আজও রহস্য। তিনি জেলে থাকাকালীন জেলের ভিতর সুড়ঙ্গ তৈরি করে বিস্ফোরক দিয়ে জেল উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, যদিও ডিনামাইট পাতার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন। এই ঘটনার ফলে সরকার ভীত হয়ে বিপ্লবীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। অনেকের মতে, এই আলোচনার ফলেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের মামলায় কারও ফাঁসি হয়নি।

তবে কি নিজের ও সহ-বিপ্লবীদের প্রাণ বাঁচাতেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন তিনি? তাঁর না-বলা থেকে এই সম্ভাবনাই উঁকি দেয় আমাদের মনে। ‘এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং সম্পূর্ণ গোপনীয়।’

Developed by DXDasia