সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৩১
স্বামী বিবেকানন্দের ইচ্ছের পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী পরমানন্দ, ১৯২৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রথম আনন্দ আশ্রম গড়ে তোলেন। লক্ষ্য ছিল, মেয়েদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি শিল্প কেন্দ্রীক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করে তোলা। স্বামী পরমানন্দর প্রচেষ্টায় এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সহায়তায় এর পর অবিভক্ত ভারতের ঢাকায় ১৯৩১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আনন্দ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হল। ক্যালিফোর্নিয়ার পর এটি হলো আনন্দ আশ্রমের দ্বিতীয় শাখা। স্বামী পরমানন্দ প্রয়াত হলে, চারুশীলা দেবী আনন্দ আশ্রমের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। এর পর দেশ স্বাধীন হলে আনন্দ আশ্রম পূর্ববঙ্গের ঢাকায় থেকে যায়। তবে ঢাকায় আনন্দ আশ্রম চালানো সম্ভব হচ্ছিল না, তাই ১৯৫১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আনন্দ আশ্রম চলে আসে ভারতের দমদমে। আনন্দ আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার নাকতলাতে জমি দান করার পর, সেটাই প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী ঠিকানা হয়।

আনন্দ আশ্রমে হোম, সাধারণ শিক্ষা, শিল্পকেন্দ্রীক শিক্ষাদান শুরু হয় মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার লক্ষ্যে। রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শে শিক্ষাদান চলতে থাকে। কালক্রমে সেই আনন্দ আশ্রমই, আনন্দ আশ্রম বালিকা বিদ্যাপীঠ (Ananda Ashram Balika Vidyapith) হিসেবে আজ একটি সরকার পোষিত উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে পরিণত হয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছে।
স্কুল সৃষ্টির এই ইতিহাস যিনি জানালেন, তিনি আনন্দ আশ্রম বালিকা বিদ্যাপীঠ স্কুলের এক প্রাক্তনী, অসীমা চক্রবর্তী। ‘আশ্রম মা’ চারুশীলা দেবীকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমি যখন আনন্দ আশ্রম বালিকা বিদ্যাপীঠে পড়ি, তখন আমেরিকা থেকে চারুশীলা দেবী মাঝে মাঝে স্কুলে আসতেন। গৈরিক পোশাক পরতেন। আমেরিকা থেকে আশ্রম মা এসেছেন শুনলেই দৌড়ে যেতাম তাঁকে দেখতে। আমরা প্রথম দিকে জানতামই না ওঁর নাম চারুশীলা দেবী, সেটা পরে বাবার কাছে জেনেছি। স্কুলে সবাই তাঁকে আশ্রম মা হিসাবেই জানতাম।”

১৯৭৪ সালে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করা স্কুলের এক ছাত্রী, মধুমিতা সেনগুপ্ত জানালেন, “আমাদের সময় সবকটা ক্লাস নিয়ম করে হত। স্কুল প্রাঙ্গণে বড়ো আম গাছ ছিল। সেই গাছের ছায়ায় আমাদের প্রার্থনা হত। পরীক্ষার ফলও খুব ভালো হত তখন। নবম, দশম, একাদশ নিয়ে হায়ার সেকেন্ডারি বলা হত। আমি কমার্স পড়তাম। শিক্ষিকারা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে পড়াতেন। আমি চারুশীলা দেবীকে দেখিনি, তবে তাঁকে আশ্রম মা বলা হত, সেটা আমরা জানি। আমাদের শিক্ষিকাদের কাছে তাঁর অনেক গল্প শুনেছি।”
তবে সময়ের সঙ্গে এখন অনেকটাই বদলেছে আনন্দ আশ্রম বালিকা বিদ্যাপীঠ। আনন্দ আশ্রম হোম আছে, এখনও সেখানে শিল্পকেন্দ্রীক শিক্ষা দেওয়া হয় কিন্তু আগের সেই সুরটা কোথায় যেন কেটে গেছে, বলছিলেন প্রাক্তনীরা। স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা নীলাঞ্জনা দত্ত’র কথাতেও ধরা পড়ল সেই একই সুর। তিনি বলছিলেন, “স্কুলের জন্যে আমরা তিন বছর আগে শিক্ষিকা চেয়ে এখনও পাইনি। তাই পার্ট-টাইম শিক্ষিকা দিয়ে ছাত্রীদের বিভিন্ন বিষয় পড়াতে হচ্ছে।”
বর্তমানে স্কুলে ছাত্রী সংখ্যা ৮৭৬ জন। শিক্ষিকা আছেন প্রধান শিক্ষিকাকে নিয়ে ২৫ জন। ২ জন প্যারা টিচার আছেন। নন টিচিং স্টাফ আছেন তিন জন। এর মধ্যে একজন লাইব্রেরিয়ান, দু'জন ক্লার্ক।
সায়েন্স, আর্টস, কমার্স পড়ানো হয় উচ্চমাধ্যমিকে। তবে অনেক বিষয়ই পার্ট-টাইম শিক্ষিকা দিয়ে পড়ানো হয়। পার্ট-টাইম টিচার দিয়েই আপাতত পঠনপাঠন চলছে। প্রধান শিক্ষিকার কথায়, “আমরা তিন বছর আগেই কমার্স বাদে অন্য যে বিষয়ে শিক্ষিকা নেই, সেই পদগুলিতে শিক্ষিকা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেও শিক্ষিকা পাইনি। তার পরেও আমাদের স্কুলের ফল ভালোর দিকেই। ২০২৩ সালে উচ্চমাধ্যমিকে ১০৬ জন পরীক্ষা দেয়। সর্বোচ্চ নম্বর ওঠে ৮৪%। এটা করোনার সময়কার ব্যাচ ছিল। ২০২০ সালে উচ্চমাধ্যমিকের ফল আরও ভালো হয়েছিল। সেবার সর্বোচ্চ নম্বর ওঠে ৯০.৮%। ২০২২ সালে উচ্চমাধ্যমিকে ৯৪% সর্বোচ্চ নম্বর উঠেছিল। ২০২০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৮৮% সর্বোচ্চ নম্বর ওঠে। ২০২১ সালে করোনা পরবর্তী বছরে রাজ্য সরকার পরীক্ষা নেয়নি, সবাই পাস করেছিল সেই বছর। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ নম্বর ওঠে মাধ্যমিকে ৯২%। ২০২৩ সালে মাধ্যমিকে সর্বোচ্চ নম্বর ওঠে ৭৯%।"

আনন্দ আশ্রমে হোম, সাধারণ শিক্ষা, শিল্পকেন্দ্রীক শিক্ষাদান শুরু হয় মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার লক্ষ্যে। রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শে শিক্ষাদান চলতে থাকে। কালক্রমে সেই আনন্দ আশ্রমই, আনন্দ আশ্রম বালিকা বিদ্যাপীঠ (Ananda Ashram Balika Vidyapith) হিসেবে আজ একটি সরকার পোষিত উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে পরিণত হয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছে।
স্কুলে সেই অর্থে স্কুলছুট নেই বলেই জানালেন প্রধান শিক্ষিকা। তাঁর কথায়, তবে কেউ কেউ অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে ছেড়ে দেয়। এদের মধ্যে কেউ আবার অন্য স্কুলে ভর্তি হয়। এই স্কুলে অনেকেই পড়তে আসে, যাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই। এর মধ্যে আবার প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াও আছে। বছরে তিনবার অভিভাবকদের সঙ্গে মিটিং ছাড়াও আলাদা করে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বৈঠক করা হয়। স্টুডেন্টস সেফটি অ্যান্ড সিকিওরিটি কমিটি আছে স্কুলে। স্থানীয় নেতাজি নগর থানার মহিলা এসআই এই কমিটির সদস্য। একজন চিকিৎসক আছেন এই কমিটিতে, তিনি কলকাতা পুরসভার ১০ নম্বর বরো কমিটির চিকিৎসক। এছাড়াও বিশাখা কমিটি আছে। ছাত্রীদের প্রতি কোনও রকম যৌন হেনস্থা হলে এই কমিটিকে জানানো হলে শিক্ষিকারা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেন। প্রয়োজনে চাইল্ড লাইন নাম্বার দেওয়া আছে, সেখানে জানানো হয়। “শুধু স্কুলেই নয়, বাড়িতে বা বাইরে ছাত্রীরা যৌন হেনস্থার শিকার হলে সহায়তা করি, এই বিষয়ে কাউন্সেলিং করি, অনেক এনজিও আছে তারা এই বিষয়ে সহায়তা করে। এখন অষ্টম, নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রীদের নিয়ে সমগ্র শিক্ষা মিশনের আওতায় এটা হচ্ছে। ‘মিসিং লিংক’ নামে এই কাউন্সেলিং হচ্ছে। প্রয়োজনে আমি নিজে অভিভাবক ও ছাত্রীদের ডেকে কাউন্সেলিং করি তারা কোনও সমস্যায় পড়লে। কন্যাশ্রী সহ যত রকমের স্কলারশিপ আছে সেগুলো যাতে ছাত্রীরা পেতে পারে তার জন্য আমরা সহায়তা করি। এ ক্ষেত্রে নানান সমস্যা হয়, যেমন টাকা পাওয়ার পর কেউ কেউ স্কুলে আসতে চায় না।” বলেন প্রধান শিক্ষিকা।

করোনার সময় শিক্ষিকারা স্কুলে এসে একদিকে ছাত্রীদের মিড ডে মিলের বরাদ্দ দেওয়ার কাজ করেছেন, অন্যদিকে স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তাও করেছেন। কন্যাশ্রী, ঐক্যশ্রী, মেধাশ্রী সরকারি সব বৃত্তি যাতে পড়ুয়ারা পেতে কোনও অসুবিধায় না পড়ে, তার জন্য স্কুল থেকে সব রকম সহায়তা করা হয়। স্কুলে এখনও বড়ো করে সরস্বতী পুজো হয়। পুজোর পরের শনিবার আনন্দ ভোজন হয়। শিক্ষিকারা চেষ্টা করছেন চারুশীলা দেবীর লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে। আশ্রম মায়ের লক্ষ্য পূরণের জন্য, স্কুলের মর্যাদা বজায় রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে আনন্দ আশ্রম বালিকা বিদ্যাপীঠ।
তথ্যসূত্র : অসীমা চক্রবর্তী, মধুমিতা সেনগুপ্ত (স্কুলের প্রাক্তনী)
নীলাঞ্জনা দত্ত: প্রধান শিক্ষিকা, আনন্দ আশ্রম বালিকা বিদ্যাপীঠ
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।