কিশোর অমর্ত্য সেনের কলমে রবীন্দ্রনাটকের সমালোচনা

পড়ুন নবম শ্রেণির অমর্ত্য সেনের লেখা

(বহু পুরোনো, প্রায় দুষ্প্রাপ্য, বিশ্বভারতীর পাঠভবনের পড়ুয়াদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত ‘আমাদের লেখা’ পত্রিকার বেশ কিছু সংখ্যা আমাদের হাতে এসেছে। সেখান থেকে কয়েক দিন আগে, পাঠভবনের ছাত্র প্রমথনাথ বিশীর নয় বছর বয়েসে লেখা একটি কবিতা আমরা পোস্ট করেছিলাম। এবার পড়ুন, নবম শ্রেণির ছাত্র চৌদ্দ ব্ছরের অমর্ত্য সেনের লেখা।)

প্রায়শ্চিত্ত নামক নাটকে রবীন্দ্রনাথ তাঁহারই লেখা ‘বৌঠাকুরানীর হাট’, উপন্যাসটিকে নাটকে রূপান্তরিত করিয়াছেন। এই নাটকের কয়েকটা বিশেষত্ব আছে। ইহার অন্যতম প্রধান চরিত্র- প্রতাপাদিত্য। তিনি ছিলেন একজন বীর, নির্ভীক ও দয়ালু রাজা।কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁহাকে একেবারে ভিন্ন রূপে গড়িয়াছেন। এই নাটকে প্রতাপ একজন সাম্রাজ্যবাদী নিষ্ঠুর ও নির্দয় রাজা। যিনি স্বার্থের জন্য নিজের খুড়া, জামাই, পুত্রবধূ এমনকি পুত্রকে পর্যন্ত হত্যা করিতে দ্বিধা বোধ করেন না।

এই নাটকের অপর একটি বিশেষত্ব এই যে, এই নাটকে লেখক ‘অহিংসা-সংগ্রাম’ বা ‘সত্যাগ্রহ’, আমাদের খুবই পরিচিত, কিন্তু তখনও গান্ধীজীর ‘সত্যাগ্রহ’ এতো পরিচিত পায়নি। এই নাটকের ধনঞ্জয় বৈরাগী একজন সত্যাগ্রহী ও নির্ভীক ব্যক্তি। এই প্রসঙ্গে একটি জায়গা উল্লেখ করা যায়। ধনঞ্জয় যখন মাধবপুরের প্রজাদের সহিত রাজার নিকট যাইতেছিলেন, তখন মাধবপুরের একটি প্রজা বলিতেছেন, “বাবাঠাকুর, তোমার গায়ে যদি রাজা হাত দেন তাহলে আমরা সইতে পারবো না।” ধনঞ্জয় বলিলেন, “আমার এই গা যাঁর, তিনি যদি সইতে পারেন তবে তোমাদেরও সইবে।” এ কথাটি বড় কম কথা নয়। ধনঞ্জয়ের কবিতা, গান, কথাবার্তা খুবই চমৎকার। এই নাটকে ধনঞ্জয় একটি প্রধান চরিত্র। একদিকে তিনি যেমন ‘অহিংস মত’ বলিয়া একটি নূতন মতের কথা বলিতেছেন, তেমন অপরদিকে সাম্যবাদ-সম্বন্ধেও তিনি বড় বড় কথা বলিয়াছেন। রাজার সহিত তাঁহার যখন মাধবপুরের প্রজাদের খাজনা বন্ধ হওয়ার কারণ-সম্বন্ধে কথা হইতেছে, তখন আমরা তাঁহার সাম্যবাদ-সম্বন্ধে কথা শুনিতে পাই। প্রতাপ বলিলেন, “মাধবপুরের দু’বছরের খাজনা বাকী, দেবে কিনা বল?” ধনঞ্জয়ও সোজাসুজি উত্তর করিলেন, “না মহারাজ, দেব না।” প্রতাপাদিত্য রাগিলেন, “দেবে না! এতবড় আস্পর্ধা।” ধনঞ্জয় নির্ভীক কণ্ঠে বলিলেন, “আমাদের ক্ষুধার অন্ন তোমার নয়। যিনি আমাদের প্রাণ দিয়েছেন এ অন্ন যে তাঁর। এ আমি তোমাকে দেই কি বলে!” প্রতাপ গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমিই প্রজাদের বারণ করেছ খাজনা দিতে?” ধনঞ্জয় উত্তর করিলেন, “হ্যাঁ মহারাজ, আমিই বারণ করেছি। ওরা মূর্খ, ওরা তো বোঝেনা- পেয়াদার ভয়ে সমস্ত দিয়ে ফেলতে চায়। আমিই বলি, আরে, আরে এমন কাজ করতে নেই- প্রাণ দিবি তাঁকে, প্রাণ দিয়েছেন যিনি- তোমাদের রাজাকে প্রাণহত্যার অপরাধী করিস্‌নে।”

সাম্যবাদী ও নির্ভীক না হইলে কেহ কি একথা বলিতে পারে? 

উদয়াদিত্যের চরিত্র একটি আদর্শ চরিত্র।তিনি রাজপুত্র কিন্তু সর্বসাধারণের সহিত আত্মীয়ের ন্যায় মেশেন। তিনি যেমন দয়ালু তেমনি নির্ভীক। প্রজাদের উপকারের জন্য কারাগার-বরণ করিতে তিনি একটুও দ্বিধাবোধ করেন নাই। রাজ্যের প্রতি তাঁহার লোভ ছিল না। তিনি প্রজাদেরই মঙ্গলকামনা করিতেন। নাটকের শেষদিকে দেখিতে পাই উদয়াদিত্য দেবীর কাছে প্রতিজ্ঞা করিতেছেন যে, তিনি রাজ্য লইবেন না। তাঁহার ছোট ভাই-ই রাজা হউন। ইহা কি কম ত্যাগ?

তাঁহার স্ত্রী সুরমার চরিত্রও খুবই চমৎকার। তিনি নিজের অলঙ্কার দিয়ে প্রজাদের খাজনা মাপ করিতে চাহিতেন। তিনিই উদয়াদিত্যকে প্রেরণা দিতেন।

প্রতাপাদিত্যের খুড়া বসন্ত রায়ের চরিত্র খুবই চিত্তাকর্ষক। তিনি স্নেহপ্রবণ ও সুরসিক ব্যক্তি ছিলেন। বসন্ত রায় যখন প্রতাপাদিত্যের নিকট যশোহর যাইতেছিলেন তখন তিনি খবর পাইলেন, প্রতাপাদিত্য তাঁহাকে খুন করিতে ইচ্ছুক। উদয়াদিত্য যখন জিজ্ঞাসা করিলেন এখনও তিনি যাইবেন কিনা, তখন তিনি বলিয়াছিলেন, “আমি তো ভাই ভবসমুদ্রের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি- একটা ঢেউ লাগলে ব্যাস। আমার ভয় কাকে? কিন্তু আমি যদি না যাই তবে প্রতাপের সঙ্গে ইহজন্মে আমার আর দেখা হবে না।” এই বলিয়া তিনি যশোহর গেলেন এবং প্রতাপের সহিত বেশ সাধারণ ভাবেই কথাবার্তা বলিলেন। ইহা হইতেই তাঁহার স্নেহপ্রবণতা বুঝিতে পারি।

এই নাটকে আরো অনেক চরিত্র আছে। যেমন রামচন্দ্র, বিভা, রমাই ভাঁড়, রামমোহন, সেনাপতি ফার্ণাণ্ডিজ ইত্যাদি। এর মধ্যে বিভার চরিত্র আমাদের মুগ্ধ করে। তাঁহার নিঃস্বার্থ ভালবাসার তুলনা নাই।তিনি তাঁহার স্বামীকে খুবই ভালবাসিতেন।তবু নিজের স্বার্থের জন্য দুঃসময়ে নিজের দাদাকে ত্যাগ করিয়ে তিনি রামমোহনের আহ্বানকে স্বীকার করিতে পারিলেন না। জীবনের সমস্ত সুখ তিনি জলাঞ্জলি দিলেন তাঁহার দাদার জন্য। তাঁহার স্বামী যখন তাঁহাকে অন্যায়ভাবে পরিত্যাগ করিয়া অন্য বিবাহ করিতে উদ্যত, তখনও তিনি তাঁহার উপর রাগ করিলেন না। তাঁহাকে আন্তরিকভাবে ক্ষমা করিয়া তাঁহার মঙ্গলকামনা করিলেন। রামমোহনের চরিত্রও আমাদের মনে গভীর দাগ কাটে। বাংলাসাহিত্যে এমন নিঃস্বার্থ প্রভুভক্ত এবং প্রভুর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী ভৃত্য খুব কম দেখা যায়।

এই নাটকটিতে নানা প্রকারের চরিত্রের সমাবেশ দেখিতে পাই। ইহাতে উদয়াদিত্য, ধনঞ্জয়, বসন্ত রায়, সুরমা ও বিভা যেমন আমাদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেন, তেমনি প্রতাপাদিত্যকে আমাদের খারাপ লাগে। মূর্খ রামচন্দ্রের প্রতি আমাদের করুণা হয়। অন্যান্য অনেক বইয়ে দেখি প্রতাপাদিত্য বেশ ভাল রাজা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বোধ করি নাটকটিকে অভিনয়ের উপযোগী করিবার জন্যই প্রতাপাদিত্যকে এইভাবে প্রকাশ করিয়াছেন।

পরিশেষে রবীন্দ্রনাথের এই নাটকের ধনঞ্জয়ের একটি গান দিয়া প্রবন্ধটি শেষ করি।

“ওরে শিকল তোমায় কোলে করে
         দিয়েছি ঝঙ্কার!
তুমি আনন্দে ভাই রেখেছিলে ভেঙ্গে অহঙ্কার।
তোমায় নিয়ে করে খেলা
সুখে দুঃখে কাটল বেলা
অঙ্গ বেড়ি দিলে বেড়ি
      বিনা দামের অলঙ্কার।
তোমার পরে করিনে রোষ,
দোষ থাকে সে আমারই দোষ, 
ভয় যদি রয় আপন মনে তোমায় দেখি ভয়ঙ্কর।
অন্ধকারে সারারাতি 
ছিলে আমার সাথের সাথী, 
এই দায়টি স্মরি তোমায় 
করি নমস্কার।

অমর্ত্যকুমার সেন
নবম শ্রেণী।বয়স চৌদ্দ বছর।

Developed by DXDasia