সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৩২
দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরের হেস্টিংস হাউস। এই বাড়িটি নিয়ে অনেকের মধ্যে অনেক রকম ধারণা আছে। অনেকে বলে ‘ভুতের বাড়ি’। এই হেস্টিংস হাউসেই আলিপুর মাল্টিপারপাস গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল (Alipore Multipurpose Govt. Girls School) চলছে সেই ১৯৬০ সাল থেকে। তারও আগে এই হেস্টিংস হাউসে বি-এড কলেজ শুরু হয়। সেই বি-এড কলেজের ব্যবহারিক পাঠক্রম চর্চার জন্য এখানে একটি নাম ছাড়া নিম্ন বুনিয়াদি স্কুল শুরু হয়েছিল, যেখানে বি এড-এর প্র্যাকটিস টিচিং হতো। তার বহুকাল পরে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৬০ সালে ভাবলো, দক্ষিণ কলকাতায় সেই অর্থে তেমন কোনও ভালো সরকারি স্কুল নেই। সেই ভাবনা থেকেই হেস্টিংস হাউসে শুরু হয় আলিপুর মাল্টিপারপাস গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল।
এই ভবনেই প্রথমে সাখওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল-এর ক্লাস হতো, পরে অন্যত্র স্থান্তরিত হয়ে যায়। শুরু থেকেই আলিপুর মাল্টিপারলাস গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে প্রাথমিক বিভাগ ছিল, যা এখনও আছে। প্রাতঃকালীন দিবাবিভাগে ক্লাস হয়। তবে যে ঐতিহ্যকে সামনে রেখে এই স্কুল যাত্রা শুরু করে সুনাম অর্জন করেছিল, সেটা এখন কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছে। তবে শিক্ষিকারা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন, স্কুলের ঐতিহ্য বজায় রাখতে। কিন্তু একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সফল ভাবে পরিচালিত করতে হলে কতগুলি উপাদান খুব জরুরি, সেটা না থাকলে মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়। জানালেন স্কুলের শিক্ষিকা বসুধিতি সরকার। এ ছাড়াও স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, স্কুলের ছাত্রী, অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেল বহু সমস্যা রয়েছে, যেগুলি সমাধানে সরকারি সাহায্য প্রয়োজন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা চন্দ্রাবলী মল্লিক বলছিলেন, “হ্যাঁ এটা ঠিক যে আগের সেই ঐতিহ্যের চেহারা বদলেছে এখন। আগে যে সুনাম স্কুল নিজে থেকেই অর্জন করতে সক্ষম ছিল, এখন তা বহু কষ্টে অর্জন করতে হচ্ছে। স্কুলের মান রক্ষার জন্য স্কুলের শিক্ষিকারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।”
কিন্তু কেন পড়ে গেল স্কুলের মান? এর উত্তরে প্রধান শিক্ষিকা যা জানালেন, তার মধ্যে সরকারি অবহেলার একটা স্পষ্ট ছবি ফুটে ওঠে। অভিবভাবকদের একাংশও সেই অভিযোগ করলেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা চন্দ্রাবলী মল্লিক মেনে নিলেন যে ২০১৪ সাল থেকে পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষা বন্ধ থাকার ফলে, এই স্কুলে বহু বিষয়ে শিক্ষিকার পদ ফাঁকা, অন্যান্য কর্মচারীর পদ ফাঁকা এবং সেই পদ পূরণের ব্যবস্থা সরকার করেনি। তিনি জানালেন, “স্কুলে ঝাড়ুদার পদে কর্মী নেই দীর্ঘদিন। ফলে শৌচালয়গুলো অপরিষ্কার হয়ে পড়ে রয়েছে। এর থেকে ছাত্রীদের সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকছে কিন্তু আমরা নিরুপায়।”

প্রাথমিকের অভিভাবকদের ক্ষোভ, বাচ্চাদের স্কুল চলাকালীন স্কুলের মাঠে অপেক্ষা করেন তাঁরা, স্কুল থেকেই এহেন নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ, প্রাথমিকের কোনও ছাত্রী যদি বমি বা পটি করে ফেলে ক্লাসে, তাহলে তাদের মায়েদের সেটা পরিষ্কার করে দিতে হয়। এই প্রসঙ্গে স্কুলের শিক্ষিকা বসুধিতি সরকার জানালেন, “কলকাতা পুরসভা থেকে সাফাই কর্মী পাঠিয়ে স্থানীয় কাউন্সিলর আমাদের সহায়তা করেন। এটা পরিপূর্ণ সরকারি স্কুল বলে, আমরা ফান্ড জেনারেট করে এই কাজ করতে পারি না। সরকার কবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে, তার ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে হয়।”

চন্দ্রাবলী মল্লিক জানালেন, “আগে সরকারি স্কুলের যে অবস্থা ছিল, সুনাম ছিল সেটা এখন আর নেই। এর পিছনে লটারির মাধ্যমে স্কুলে ভর্তিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতেই পারে। তবে লটারির মাধ্যমে স্কুলে ভর্তি নেওয়ার পরেও যে আমরা এখনও এতো সংকটের মধ্যেও তুলে ধরতে পারছি সেটা আমাদের একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ। অন্যান্য সরকারি স্কুলের মতোই আমাদের এই সরকারি স্কুলেও অনেক বিষয়ের শিক্ষিকা নেই। তার মধ্যেও আমরা যে ভাবে স্কুল চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, প্রান্তিক শ্রেণীর পড়ুয়াদের শিক্ষার আলোয় আনতে পারছি সেটা সম্ভব হচ্ছে আমাদের স্কুলের সমস্ত শিক্ষিকাদের সম্মিলিত প্রয়াসের ফলে। এখন বহু সরকারি স্কুলে বহু বিষয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা নেই। এখন সরকার থেকে বলা হয় ‘লার্নিং থ্রু প্লেয়িং’। কিন্তু আমার স্কুলে খেলার শিক্ষিকা বহু দিনই নেই। গানের শিক্ষিকা নেই। তবুও এখন স্কুলে বহু ইভেন্ট হচ্ছে। স্কুলের বাচ্চাদের সেই সব ইভেন্টের জন্য শিক্ষিকারাই তৈরি করে দিচ্ছেন, ছাত্রীরা পুরস্কার নিয়ে আসছে। এটা আমাদের কাছে গর্বের বিষয়। অনেক সরকারি স্কুলে পরিকাঠামোর মান কমে গেছে সেটা যেমন ঠিক, তেমনই অনেক সরকারি স্কুলে ভালো পড়াশোনা হয়, এটাও ঠিক।”
আসলে সরকারি স্কুলে শিক্ষিক নিয়োগ পদ্ধতিটা সরকার পোষিত স্কুলের থেকে আলাদা। স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সরকারি স্কুলে শিক্ষিকা নিয়োগ হয় না। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে হয়। পরীক্ষা দিয়ে, ইন্টারভিউ দিয়ে অনেক কিছু পেরিয়ে তারপর সরকারি স্কুলে চাকরি পেতে হয়। তবে ২০১৪ সাল থেকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা বন্ধ। “ফলে, বুঝতেই পারছেন বহু পদ ফাঁকা পড়ে আছে। যাঁরা অবসর নিচ্ছেন সেই পদ পূরণ হচ্ছে না।” বলেন প্রধান শিক্ষিকা।
এই সমস্যা শুধু যে শিক্ষিকা নিয়োগের ক্ষেত্রে হচ্ছে সেটা নয়। অফিস স্টাফ-এর ক্ষেত্রেও এই সমস্যা রয়েছে। এই মুহূর্তে যেমন সব কিছু অনলাইন পদ্ধতিতে হচ্ছে। কন্যাশ্রী, ঐক্যশ্রী, শিক্ষাশ্রী সহ সব অনলাইনের কাজ স্কুলের শিক্ষিকাদেরই করতে হয়। এসব করার কোনও অফিস ব্যাক-আপ স্কুলের নেই। দীর্ঘদিন ধরে গ্রুপ বি, সি, ডি পদে কোনও কর্মী নেই। সবে একজন জয়েন করেছেন, তাঁকে সব শিখিয়ে নিতে সময় লাগবে বলেই প্রধান শিক্ষিকা জানালেন। স্কুলে কোনও লাইব্রেরিয়ান নেই। স্কুলের লাইব্রেরিতে ভালো বইয়ের সম্ভার থাকলেও, ছাত্রীরা সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এই সব সমস্যা অচিরেই সরকারের নজরে আসা উচিত বলে স্কুলের শিক্ষিকারা মনে করেন। শিক্ষিকাদের মতে, ছাত্রীরা রেফারেন্স বই না পড়লে, জানতে পারবে না, সেখান থেকে একটা গাফিলতি থেকেই যায়। হাতে গোনা কয়েকটা স্কুল ছাড়া অন্য সব সরকারি স্কুলেই এখন লাইব্রেরিয়ান নেই। এই চাহিদাগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেটা দরকার। তাই প্রধান শিক্ষিকা বলছিলেন, “পঠনপাঠন থেকে শুরু করে সবটাই এখন শিক্ষিকাদের ওপর। অফিস স্টাফ না থাকায়, অফিসিয়াল যাবতীয় কাজ শিক্ষিকাদের করতে হয়। শুধু আমাদের সরকারি স্কুলেই এটা হচ্ছে তা নয়। বহু সরকারি স্কুলেরই এই অবস্থা।” যেহেতু এসব কাজ শিক্ষিকারা উতরে দিচ্ছেন, সেকারণেই কি শিক্ষা দফতর ভাবছে কাজ তো হয়েই যাচ্ছে, আর বাড়তি কর্মী দিয়ে কি হবে? এই প্রশ্নও জাগছে শিক্ষকদের মনে।
বাংলা মাধ্যমে সন্তানদের পড়ানোতে অনীহা অভিভাবকদের, এই বিষয়টি মেনে নিলেন চন্দ্রাবলী মল্লিক। তাঁর কথায়, “আমরা এই সমস্যাটা আরও বুঝতে পারলাম একাদশ শ্রেণীতে যখন ভর্তি নেওয়া শুরু হলো। আসলে এই অনীহার পিছনেও সেই পরিকাঠামোগত সমস্যায় দায়ী। আমাদের শিক্ষিকা যাঁরা অবসর নিয়েছেন সেই পদগুলি ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। আমাদের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে বহু ছাত্রী আমাদের স্কুলেই উচ্চমাধ্যমিক পড়ার জন্য ভর্তি হতে পারছে না। যেমন সংগীত বিষয়টাই যদি বলি। সংগীত একটা স্কোরিং সাবজেক্ট। আমাদের শিক্ষিকা নেই, তাই একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি নিতে পারলাম না। সংস্কৃত বিষয়ের শিক্ষিকা এই বছর অবসর নিচ্ছেন, তাই ভর্তি নিতে পারলাম না। এর ফলে আমাদের ভালো ছাত্রীগুলো মাধ্যমিকের পর হাতছাড়া হয়ে যায়। তারা অন্য স্কুলে পড়ছে। তবে প্রাথমিকেও ভর্তি আগের চাইতে কমছে এই একই কারণে। শিক্ষিকা নেই বলে অনেক ছাত্রী মাধ্যমিকের পর ক্লাস হবে না এই আতঙ্কের থেকে আমাদের স্কুলে মানে নিজেদের স্কুলে ভর্তি হচ্ছে না। আবার অনেক ভালো শিক্ষিকা আমাদের স্কুলে আছেন। যেমন স্ট্যাটিসটিক্স-এর ভালো শিক্ষিকা বসুধিতি সরকার আছেন। কিন্তু ছাত্রীরা এই বিষয়টি নিয়ে পড়তে চাইছে না। অঙ্ক নিয়ে পড়তে চাইছে না। তবে এই বিষয়গুলোতে আগ্রহ বাড়ানোর জন্য ছাত্রীদের নিয়ে আমরা সেমিনার করি। কোন বিষয় নিয়ে পড়লে ভবিষ্যতে চাকরি পেতে সুবিধা হবে, সেটা সেমিনারে বলা হয়। তবে সব কোর্সের জন্যই তো টাকা পয়সা লাগে। আর্থিক কারণে সব ছাত্রী সেই সুযোগটা নিতে পারে না। অনেকের মধ্যেই অনেক আলাদা যোগ্যতা আছে, তারা সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না আর্থিক কারণে। যেমন আমাদের একটি ছাত্রী লন্ডনে নাটকের একটি বিষয়ে সুযোগ পেয়েছে। এরকম অনেক গুণী ছাত্রীই আছে আমাদের স্কুলে। আসলে যারা পড়তে আসে, বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত। তাদের অনেকেই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া। তাই সমস্যা অনেক। এই তো আমাদের ইংরেজি মাধ্যমের জন্য ভবন তৈরি হল, একজন জয়েন করলেন। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত আর থাকলেন না, কারণ ইংরেজি মাধ্যম শুরুই করা গেল না।”

দুটো প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে বর্তমানে স্কুলে ছাত্রী সংখ্যা ১২০০-র মতো। পড়ুয়ার তুলনায় শিক্ষিকার সংখ্যা কম। স্কুলের ল্যাবরেটরি আছে বিজ্ঞান বিভাগের জন্য। কম্পিউটার ল্যাবরেটরি আছে। স্কুলে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান, কলা বিভাগ পড়ানো হয়। এই স্কুলের বহু প্রাক্তনী এখন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তবে সেই ধারাটা এখন বহন করে নিয়ে যেতে বেশ সমস্যা হচ্ছে আলিপুর মাল্টিপারপাস গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলের।
তথ্য সূত্র: চন্দ্রাবলী মল্লিক, প্রধান শিক্ষিকা, আলিপুর মাল্টিপারপাস গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল
বসুধিতি সরকার, শিক্ষিকা, আলিপুর মাল্টিপারপাস গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল
স্কুলের অভিভাবক
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।