
প্রবীণ ডাক্তারবাবুর পাশে নাতি ঘুমিয়েছিল। সকাল পাঁচটা পঞ্চান্নয় মাথার কাছের ট্রানজিস্টার সেটের নব ঘুরিয়ে অন করলেন। আকাশবাণী কলকাতা-র সিগ টিউন শোনা গেলো। তারিখ দিন ঘোষণার পরে ‘বন্দেমাতরম’ হয়ে পরপর ভক্তিগীতি, সংবাদ এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান চলছে। হাতে হাতে রেডিও সেট ঘুরে থিতু হলো ডাক্তারবাবুর চেম্বারে। শুক্রবার রাত আটটার নাটক, রবিবার দুপুর আড়াইটার নাটক সব তাঁর শোনা চাই। গানের অনুষ্ঠানের শ্রোতা দিদিমা মাসিরা। দিদিমা তার রেশ ধরে গুনগুন করছেন ‘আমি বনফুল…’। শারদোৎসবের কিছু আগে মহিষাসুরমর্দিনী। বাড়ির লম্বা বারান্দায় চাটাই বিছনো আছে ঠিক চারটেয় অনুষ্ঠান শুরু হবে, সাড়ে তিনটে থেকে চাটাই ভরতি হতে শুরু করেছে। অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে ভোর। যে যার কাজে ফিরে গেলেন। ডাক্তারবাবুর বেয়াই প্রগতিশীল চাষি। তাঁর বাড়িতে ভীড় হয় চাষিদের। কৃষিকথার আসর শোনার জন্য!
সাহিত্য কথিকা বিভাগের ‘আমার বাবা’ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে এসেছেন কবি অরুণ সরকারের ছেলে অর্থনীতিবিদ পরিসংখ্যান তাত্ত্বিক অভিরূপ সরকার। রেকর্ডিং শেষে বললেন, “কেউ কি শোনেন?” অনুষ্ঠান রেডিওতে বাজার প্রায় চার ঘণ্টা বাদে হোয়াটসঅ্যাপ পেলাম, “শোনে শোনে! আমার চার বন্ধু এই একটু আগে ফোন করেছিল অনুষ্ঠান শুনেছে জানালো।” পর পর তিন দিন তিনি জানিয়ে গেলেন কত মানুষ শুনে তাঁকে ফোন করে জানিয়েছেন।
বাড়ির লম্বা বারান্দায় চাটাই বিছনো আছে ঠিক চারটেয় অনুষ্ঠান শুরু হবে, সাড়ে তিনটে থেকে চাটাই ভরতি হতে শুরু করেছে। অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে ভোর। বাড়িতে ভীড় হয় চাষিদের। কৃষিকথার আসর শোনার জন্য!
আকাশবাণী মুর্শিদাবাদ। সন্ধের দিকে কেন্দ্রের গেটের সিকুইরিটি স্টাফ এসে অনুষ্ঠান প্রধানকে জানালেন এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছেন। স্বাভাবিক ভাবেই সেই আমলা প্রযোজক এগিয়ে এসে ভদ্রলোককে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে চায়ের আপ্যায়ন করতে করতে জানলেন ভদ্রলোকের রেডিও সেট বিক্রির দোকান। গত কয়েক মাসে তাঁর দোকানের বিক্রি খুব বেড়ে গেছে! আমলা প্রযোজক খুশির এক শেষ!
একটি বহুল প্রচারিত বাংলা সংবাদপত্রে সাম্প্রতিক খবর বহরমপুরের কাছে একটি গ্রামের মৌসুমি বিশ্বাস কৃষির ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্ভাবনী নিদর্শন রাখার জন্য সারা বাংলা থেকে পাঁচজনের মধ্যে অন্যতম সেরা চাষি হিসেবে পুরস্কৃত হলেন। মৌসুমি নিয়মিত আকাশবাণী মুর্শিদাবাদের অনুষ্ঠান শুনে ক্রমাগত সাফল্য পেয়ে চলেছেন।
রেডিও এফএম-এর রাত দশটা থেকে শুরু হয় ‘আজ রাতে’। লাইভ ফোন ইন অনুষ্ঠান! প্রায় ত্রিশ বছরের পুরোনো একবার বিষয় রাখা হয়েছিলো ‘দেখতে কেমন’! শ্রোতারা ফোন করে নিজের বর্ণনা দেবেন। রাত বারোটায় অনুষ্ঠান শেষে স্টুডিওর বাইরে আসতেই জানা গেলো অনেকেই ফোন করেছেন অনুষ্ঠান নিয়ে। নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে কয়েকটি ফোন এটেন্ড করে তিনজন মনোস্তত্ত্ববিদের সঙ্গে কথায় জানা গেলো তাঁদের অনেকেই এ অনুষ্ঠান মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। কারণ এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা তাঁদের কাছে, মানুষ নিজের বর্ণনা নিজে ক্বদাচিৎ করতে পারে।
হ্যাঁ, আকাশবাণী কলকাতা প্রধান চ্যানেল এবং দুটো এফএম (রেইনবো এফএম ও গোল্ড এফএম) সম্পর্কে ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া যায়। তার ঘোষক-ঘোষিকা এবং উপস্থাপক-উপস্থাপিকা যে বহুস্তরীয় পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা হয় তার মধ্যে সাহিত্য সংস্কৃতি, সংগীত ইত্যাদি সম্বন্ধে তাঁদের অধিকার এবং বাংলা উচ্চারণ যাচাই করা হয়, পাশ করা বেশ দুরূহ। আরেকটা ব্যতিক্রম আকাশবাণী কলকাতার পাশ্চাত্য সংগীত উপস্থাপনার পৃথক ধারা। তাই আকাশবাণী পৃথক। চলতি হাওয়ার পন্থী হিংলিশ বাংরেজি চলে না। ‘জ’ নয় ‘য’, ‘ড়’ নয় ‘র’, ‘স-শ-ষ-এর ফারাকহীন ‘উসচারণ’ চলে না এখানে।
হয়তো সেই জন্যই বেশিরভাগ রেডিও নিয়ে পাঠ্যক্রমে আকাশবাণীর অনুষ্ঠান নিয়ে, ধরন ও উচ্চারণ ইত্যাদি নিয়ে বিশেষ উল্লেখ খুব কম হয়৷ অধিকাংশ শিক্ষকের হাতেকলমে সংবাদ পরিবেশনের অভিজ্ঞতা ছাড়া অন্যান্য অনুষ্ঠানের চর্চা নেই-ই প্রায়। কারণ ৯৯ বছরের এ শ্রবণ মাধ্যম এবং ত্রিশ বছরের পুরোনো রেডিও এফএম-এর অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন। আবার বহু বিখ্যাত উপস্থাপকরা নার্সারি পর্যায়ে আকাশবাণী কলকাতার যুববাণী ও এফএম-এ ‘হাতে খড়ি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়’ কাটিয়ে প্রাইভেট এফএম-এ গেছেন।
গানের পরে গান জুড়ে মাঝে অদ্ভুত সব উচ্চারণে রেকর্ডেড প্রোগ্রাম উপস্থাপকরা তরতাজা যৌবন চ্যানেলের বিপণন বিভাগের ‘শিক্ষিত’ আমলাদের খেয়ালে চলতেই বাধ্য হবেন। তবে আকাশবাণীর অনুষ্ঠানে উপস্থাপকদের কাজ করতে হয় খুব বেশি হলে আট ঘণ্টা। সেখানে প্রাইভেট চ্যানেলে ন্যুনতম বারো ঘণ্টা।
চলতি হাওয়ার পন্থী হিংলিশ বাংরেজি চলে না। ‘জ’ নয় ‘য’, ‘ড়’ নয় ‘র’, ‘স-শ-ষ-এর ফারাকহীন ‘উসচারণ’ চলে না এখানে।
নয় নয় করে প্রায় বারো লক্ষ শ্রোতা আকাশবাণীর। এছাড়াও রয়েছে শান্তিনিকেতন, মুর্শিদাবাদ, কার্শিয়াং (অংশত বাংলা)। শ্রবণের অবিরত ধারা অকৃত্রিম, ভেজালহীন পরিবেশন আজও আকাশবাণীর অহংকার!
পুন: আকাশবাণীর সব কটি চ্যানেলে সংগীত ও সংবাদের বাইরে যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তার জন্য খানিকটা বুদ্ধি মনোযোগ দাবি করে, আর্থ সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করে। তাই বলাই যায় অকাতর সংগীত পরিবেশনে শ্রোতাকে ভরিয়ে রাখার সুচতুর পরিকল্পনা রয়েছে।
___________
মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব
