রবীন্দ্রনাথের প্রাপ্তির পর তারাশংকরের নাম প্রস্তাবনা, বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় নোবেল এল না!

যাঁরা নোবেল পাননি, তাঁরা প্রতিভাধর নন বা ‘কম’ সাহিত্যিক?

ম্প্রতি সুইডেনের নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নোবেল প্রাপকদের নাম ঘোষিত হয়েছে। এবছর নোবেল প্রাপকদের তালিকায় একজনও স্বজাতি না পেয়ে বাঙালির দুঃখের অন্ত নেই। আমরা সাধারণত আলোচনা করি, উল্লাস করি নোবেল পুরস্কার কে পেলেন, কেন পেলেন তা নিয়ে, কিন্তু সেভাবে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন না নোবেলের জন্য মনোনীত হওয়া অন্যান্য ব্যক্তিত্বরা। এই ‘না আলোচনা’র ফল স্বরূপ সাম্প্রতিক নোবেল পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার পরে একটি তথ্য নিয়ে বাঙালিবৃত্তে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

এতবছর ধরে শুধুই নোবেলজয়ীদের নাম প্রকাশ করতো সুইডিশ কমিটি। তবে, এবছর তারা পুরোনো আর্কাইভ প্রকাশ করেছে। জনসমক্ষে প্রথমবারের মতো এসেছে অন্যান্য মনোনীত ব্যক্তিদের নাম। এই আবহে মনোনয়নের ৫১ বছর পর জানা গেল যে ১৯৭১ সালে সাহিত্যে মনোনয়ন পেয়েছিলেন যে ক’জন তার মধ্যে একজন ছিলেন এই বাংলার। ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’,  ‘আরোগ্য নিকেতন’ বা ‘গণদেবতা’-র লেখক – তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়। তারাশঙ্করের নাম প্রস্তাব করেছিলেন সাহিত্য আকাডেমির তৎকালীন সম্পাদক কৃষ্ণ কৃপালনি। তবে সেই বছরেরই ১৪ সেপ্টেম্বর মৃত্যু হয় লেখকের। নিয়ম অনুযায়ী যেহেতু কাউকে মরণোত্তর নোবেল দেওয়া হয় না, তাই আর বিবেচিত হয়নি তারাশঙ্করের নাম। তিনি ছাড়া সেবছর তালিকায় ছিলেন জর্জ লুইস বোর্হেস, গুন্টার গ্রাস, পাবলো নেরুদা, এজরা পাউন্ড –এর মতো বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকরা। শেষপর্যন্ত নোবেল পেয়েছিলেন নেরুদা।  

১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয় তারাশংকরের উপন্যাস ‘ফরিয়াদ’, ‘শতাব্দির মৃত্যু’। সে বছরই লিখেছেন ছোটোগল্প ‘উনিশশো একাত্তর’। তিনি তাঁর সাহিত্য সাধনায় খুঁজেছিলেন এক সমগ্র অখণ্ড মানুষকে, মানুষ ও প্রকৃতিকে, মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে। বর্তমান সমাজে ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে ছিন্নমূল জীবনের বিচ্যুত এক ক্ষেত্রে তারাশংকরের চিন্তা ও ভাবনা তথা আস্তিক্যবোধ মানুষকে পৌঁছে দিতে পারে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে—একথা ভেবে দেখবার অবকাশ বোধ হয় এসেছিল। বলাবাহুল্য তারাশংকরের শিল্পীমানস দেশ-কাল-সমাজের পটভূমিকায় বিচিত্র নরনারীর যে চিত্রশালা নির্মাণ করেছেন তা দেশকাল নিরপেক্ষ রূপলাভ করেছে, আর এখানেই কালান্তরের কথাকার; শুধুমাত্র তিনি নোবেল পাননি বলে সেসব ব্যর্থ?

তারাশংকরের মনোনয়ন পাওয়া যেমন প্রকাশ্যে এসছে, আসেনি শ্রী অরবিন্দের নাম। ১৯৪৩ সালে সাহিত্যক্ষেত্রে নোবেলের জন্য ‘রয়্যাল সোসাইটি অফ লিটারেচার’ (লন্ডন)-এর তরফে ফ্রান্সিস ইয়াংহাসব্যান্ড তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন।

১৯১৩ সালের পর বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় নোবেল আসেনি। সেই একমাত্র নোবেলটিও আমরা অনেককাল আগেই হারিয়েছি, তার ওপর তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনয়ন নিয়েও চারিদিকে এমন একটা ঝড় উঠেছে যে নোবেল ছাড়া যেন বাংলা সাহিত্য বৃথা। এখানে আর একটি তথ্যও দিয়ে রাখি, যেটা হয়তো বাঙালির নজর এড়িয়ে গিয়েছে, যা তাদের হাহুতাস আরও একটু বাড়িয়ে দিতে পারে। তারাশংকরের মনোনয়ন পাওয়া যেমন প্রকাশ্যে এসছে, আসেনি শ্রী অরবিন্দের নাম। ১৯৪৩ সালে সাহিত্যক্ষেত্রে নোবেলের জন্য ‘রয়্যাল সোসাইটি অফ লিটারেচার’ (লন্ডন)-এর তরফে ফ্রান্সিস ইয়াংহাসব্যান্ড তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন।

এ পর্যন্ত ন’জন ভারতীয় নোবেল পেয়েছেন। তাঁদের চার জন বাংলা থেকে, তিন জন চেন্নাইয়ের। আর আছেন হরগোবিন্দ খুরানা। শান্তি পুরস্কার পাওয়া মাদার টেরেসাও সেই তালিকায় আছেন। এর মানে নোবেলের শতকরা ৮০ ভাগ এনেছে কলকাতা আর চেন্নাই। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় নোবেল পাওয়ার পর এ প্রসঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার পক্ষ থেকে অভীক সরকার তাঁকে একটি প্রশ্ন করেছিলেন, যার উত্তরে অভিজিৎ বলেছিলেন,

“অমর্ত্য আর রবীন্দ্রনাথ কেন কলকাতার মানুষ, তার অন্তত একটা কারণ হল, কতকগুলো ঐতিহাসিক ঘটনার যোগাযোগে কলকাতা এক সময় ভারতের বিদ্যাচর্চার একটা বড়ো জায়গা ছিল। আজ আর সেটা বলা যাবে না। কিন্তু এটা আপনি বলতেই পারেন যে, কলকাতার সঙ্গে ভারতের পাঁচ জন নোবেলজয়ী মানুষের যোগ আছে। আমার বক্তব্য হল, এর সঙ্গে বাঙালিয়ানার বিশেষ সম্পর্ক নেই। বরং এটাই আসলে বড়ো শহরের মাহাত্ম্য। সেখানে শ্রেষ্ঠ মেধার মানুষেরা আসেন এবং তাঁরা পরস্পরের কাজে অনুপ্রাণিত হন ও অসামান্য সব কাজ করেন। তাঁরা সবাই একে অন্যের চেয়ে আরও ভাল কাজ করতে চান এবং সেটাই হল মহানগরের মহত্ত্বের চাবিকাঠি। এই কারণেই এক সময় সমস্ত শিল্পী প্যারিসে যেতে চাইতেন, সব লেখকের লক্ষ্য ছিল নিউ ইয়র্ক। ভালো লেখক হিসেবে স্বীকৃত হতে চাইলে আপনাকে নিউ ইয়র্কে যেতেই হবে, এটাই ছিল নিয়ম। একটা সময় অবধি কলকাতার এই ব্যাপারটা ছিল… সত্যিই সে এক প্রাণবন্ত মেধাচর্চার জায়গা ছিল বটে। এর পিছনে বাঙালির কোনও বিশেষত্ব আছে বলে আমি মনে করি না, এটা মহানগরের বিশেষত্ব।”

আলফ্রেড নোবেলের করে যাওয়া উইল অনুসারে জানা যায়, তিনি বলে গেছেন, “তাদেরকেই সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হবে যারা একটি আদর্শগত প্রবণতার মাধ্যমে কোন অনন্য সাধারণ কাজ প্রদর্শন করতে পারবেন।” আমরা জানি, প্রতি বছর কাকে এই পুরস্কার দেওয়া হবে তা সুইডিশ আকাডেমি ঠিক করে এবং অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচিতের নাম ঘোষণা করে।

প্রথম যখন এই পুরস্কার প্রদান শুরু হয় তখন বেশ কিছু বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, যা এখনও মুছে যায়নি। নোবেল তার উইলে বলে গিয়েছিলেন যে পুরস্কার পাবে তাকে অবশ্যই ‘idealisk’ তথা আদর্শিক কিছু করে দেখাতে হবে। প্রথমদিককার নির্বাচকমণ্ডলী তাঁর কথাগুলোকে আঁকড়ে ধরেছিলেন গোঁড়াভাবে। এর সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ লিও তলস্তয় এবং হেনরিক ইবসেন। উপন্যাস ও নাটকের জগতে কিংবদন্তিতুল্য এই দুই ব্যক্তির নোবেল না পাওয়া নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে কলঙ্কময় অধ্যায়। অবশ্য পরবর্তীকালে পুরস্কারের নির্বাচকরা আরও উদার হয়েছেন। আদর্শিক নয় বরং কার সাহিত্য সকল যুগে মানুষের আবেগের ইন্ধন জোগাবে অর্থাৎ কোনটি অমরত্ব অর্জন করবে তার ভিত্তিতেই নির্বাচন করা হচ্ছে। অবশ্য এ কারণে এমন অনেকে পুরস্কার পেয়েছেন যারা অতটা জনপ্রিয় বা পরিচিত নন। যেমন: ১৯৯৭ সালে দারিও ফো এবং ২০০৪ সালে এলফ্রিদে ইয়েলিনেক। রুশ সাহিত্যিক বরিস পাস্তেরনাক ১৯৫৮ সালে এই পুরস্কারে ভূষিত হলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের চাপে তিনি পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৬৪ সালে জঁ-পল সার্ত্র এই পুরস্কারে ভূষিত হলেও তিনি তার পূর্ববর্তী সকল সরকারি সম্মাননার মত এই পুরস্কারও প্রত্যাখ্যান করেন (যদিও নোবেল কমিটি প্রত্যাখ্যানকারীদের বাদ না দিয়ে পুরস্কারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে রাখে)। আবার একটি বক্তৃতার জন্য বিতর্কিত ব্রিটিশ নেতা উইনস্টন চার্চিল, গায়ক-গীতিকার বব ডিলানও তাঁর লেখা গানগুলির জন্য সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। কিন্তু, অনেক বিখ্যাত ও জনপ্রিয় সাহিত্যিকই এই পুরস্কার পাননি বলে নোবেল পুরস্কার সমালোচিত হয়েছে বারবার। গলদ যে ঠিক কোথায় তা অধরা মাধুরী হয়েই থেকে গিয়েছে।

তাই প্রশ্ন হল, এহেন নোবেল পুরস্কারকে আমরা সাহিত্যের একমাত্র মানদণ্ড বলে ধরে নিতে পারি কি? প্রাচ্যের বাংলা সাহিত্যে শুধু রবীন্দ্রনাথ, তারাশংকর বা শ্রী অরবিন্দ কেন নজরুল, জীবনানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কমলকুমার মজুমদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় -অনেকেই তো নোবেলজয়ী হতে পারতেন। তাই নয় কি? অন্যদিকে পাশ্চাত্যে পাবলো নেরুদা, সার্ত্র যেমন নোবেল পেয়েছেন, পাননি কাফকা, র্যাঁবো, বোর্হেস, তলস্তয়, জয়েস, অ্যালেন গিনসবার্গ, জেক কেরুয়াকের মতো সাহিত্যিকরা। আমরা নিশ্চয়ই বলবো না, যাঁরা নোবেল পাননি, তাঁরা প্রতিভাধর নন বা ‘কম’ সাহিত্যিক?

(পুনঃপ্রকশিত)

তথ্যসূত্রঃ

www.nobelprize.org

www.wikiwand.com

Developed by DXDasia