এক বিপ্লবী, এক মন্ত্রী এবং ‘ভগবান’ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়

আরেকটা ১৯ মার্চ চলে গেল, এইদিন ফাঁসি হয়েছিল বিপ্লবী চারুচন্দ্র বসুর

রেকটা ১৯ মার্চ চলে গেল। ১৯০৯ সালে এই দিনে আলিপুর জেলে ফাঁসি হয়েছিল বিপ্লবী চারুচন্দ্র বসু-র। এই চারুচন্দ্রই সম্ভবত অগ্নিযুগের একমাত্র ‘বিশেষ ভাবে ক্ষমতা সম্পন্ন’ বিপ্লবী। চারুচন্দ্র তাঁর অসাড় ডান হাতে রিভলভার বেঁধে বাঁ হাত দিয়ে ট্রিগারে চাপ দিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে গুলি করে হত্যা করেছিলেন আইনজীবী আশুতোষ বিশ্বাস-কে। বিপ্লবীদের মামলায় পুলিশের পক্ষ নিয়ে সওয়াল করার জন্য অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীরা এই ‘শাস্তি’ দিয়েছিলেন আশুতোষকে।

বিপ্লবী চারুচন্দ্র বসুর গুলিতে নিহত ইংরেজ সরকারের উকিল আশুতোষ বিশ্বাসের পুত্রের নামও ছিল চারুচন্দ্র। এই চারুচন্দ্র বিশ্বাস এবং ভারতের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চারুচন্দ্র বিশ্বাস একই ব্যক্তি। চারুচন্দ্র লেখাপড়া শেষ করে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হয়েছিলেন। আর এখানেই চারুচন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় বিচারপতির চাকরি ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়-এর। কীভাবে, সেটাই বলা যাক।

দেশের স্বাধীনতার বিরোধী – এই অভিযোগে চারুচন্দ্রের বাবা আশুতোষ বিশ্বাস নিহত হয়েছিলেন বিপ্লবীদের হাতে। পেশাদার সরকারি আইনজীবী আশুতোষ বিশ্বাসের অপরাধ কতটা তা নিয়ে তর্কের অবকাশ আছে।

বিধান রায় ১৯৪৮ সালের ২৩ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হলেন। বিধান রায় কয়েকজন বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে তাঁর মন্ত্রিসভায় নিতে চেয়েছিলেন। কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতাদের থেকে বাধা এল। বিধান রায় চেয়েছিলেন ফজলুল হক সরকারের অর্থমন্ত্রী নলিনীরঞ্জন সরকার, হরেন্দ্রনাথ চৌধুরী এবং কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি চারুচন্দ্র বিশ্বাসকে তাঁর মন্ত্রিসভায় আনতে। দীর্ঘ বিতর্কের পর বিধান রায়ের মন্ত্রিসভায় এলেন নলিনীরঞ্জন সরকার এবং হরেন্দ্রনাথ চৌধুরী। বিপ্লবীদের হাতে নিহত পিতা আশুতোষ বিশ্বাসের পরিচয়ের প্রশ্ন তুলে প্রায় সবাই মিলে দলবদ্ধ ভাবে আটকে দিলেন চারুচন্দ্র বিশ্বাসের মন্ত্রিসভায় আসার পথ। এদিকে মন্ত্রিসভায় যোগ দেবেন বলে ততদিনে বিচারপতি পদে ইস্তফাও দিয়ে দিয়েছেন চারুচন্দ্র বিশ্বাস।

প্রায় ৭৬ বছর পরে, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে মিল এখানেই চারুচন্দ্র বিশ্বাসের। অবসরের আগেই বিচারপতি পদে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতিতে আসা। দুই প্রাক্তন বিচারপতির মধ্যে অ-মিল কোথায় সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে।

বিধান রায়ের মন্ত্রিসভায় আসতে পারলেন না, তবে বছর খানেকের মধ্যেই চারুচন্দ্র নেহরুর মন্ত্রিসভার বিদেশ দফতরের প্রতিমন্ত্রী পদে যোগ দিলেন। দায়িত্ব পড়েছিল নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি অনুসারে, ভারত এবং পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের সমস্যা মেটানো।

১৯৫২ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর চারুচন্দ্র বিশ্বাস রাজ্যসভায় নির্বাচিত হলেন কংগ্রেস সাংসদ হিসেবে। কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লিতে আইনমন্ত্রী হিসেবে বাবা সাহেব আম্বেদকার এবং প্রধানমন্ত্রী নেহরু প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন হিন্দু কোড বিল পাশ করাতে, কিন্তু পারেননি। হিন্দু কোড বিল রুখতে তৈরি হয়েছিল ‘অল ইন্ডিয়া অ্যান্টি হিন্দু কোড বিল কমিটি’। তাদের বক্তব্য ছিল, কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লির কোনও অধিকার নেই ‘হিন্দু পার্সোনাল ল’ বা হিন্দুদের ব্যক্তিগত আইনে হস্তক্ষেপ করার। কারণ এর সৃষ্টি হয়েছে ধর্মশাস্ত্রের উপর নির্ভর করে। যা চিরকালীন।

নেহরু এবং আম্বেদকার দু’জনেই বুঝেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষ পথে চলতে হলে কমন সিভিল কোড প্রয়োজন। এই কাজ করতে গিয়ে তাঁরা দেখলেন, ঐতিহাসিক কারণেই দেশের হিন্দুদের মধ্যে অন্তত একটা অংশ মুসলিম সমাজ থেকে তুলনায় অনেকটা এগিয়ে। ফলে কিছুটা হলেও হিন্দুদের মধ্যে থেকে হিন্দু কোড বিলের প্রতি সমর্থন নেরহরুরা পেয়েছিলেন।

উল্টোদিকে মুসলিম সমাজের ভিতর থেকে কমন সিভিল কোডের প্রতি সমর্থন একেবারে ছিল না বললেই হয়। জওহরলাল, আম্বেদকার বুঝেছিলেন হিন্দু-মুসলিম উভয় পক্ষের জন্যই কমন সিভিল কোড দরকার, কিন্তু তাঁরা এটাও বুঝলেন, এই দাবিটা মুসলিম সমাজের ভিতর থেকে, অন্তত কিছুটা হলেও ওঠা প্রয়োজন। তবেই সরকার এগোতে পারবে। তাঁদের মনে হয়েছিল, মানসিক প্রস্তুতির জন্য মুসলিম সমাজের আরও একটু সময় দরকার। তা না হলে মুসলিম সমাজের মনে হবে, সংখ্যাগুরুরা তাদের উপর গায়ের জোরে একটা আইন চাপিয়ে দিচ্ছে। তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন প্রথমে চালু হোক হিন্দু কোড বিল। সন্দেহ নেই জওহরলালের এই ভাবনা ছিল খুবই গণতান্ত্রিক। যদিও ভবিষ্যতেও মুসলিম সমাজের ভিতর থেকে এই দাবি অন্তত প্রকাশ্যে কখনও ওঠেনি। কেন ওঠেনি, তার কারণ সমাজবিজ্ঞানীরাই বলতে পারবেন।

হাইকোর্ট থেকে পদত্যাগের সঙ্গেই সঙ্গেই দেখা যাচ্ছে বিজেপিতে যোগ দেওয়া প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, গান্ধী না গডসে, তিনি কোনদিকে, এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দিতে না পেরে মুখ লুকোচ্ছেন।

‘অল ইন্ডিয়া অ্যান্টি হিন্দু কোড বিল কমিটি’ (All India Anti Hindu Code Bill Committee) সারা দেশে প্রায় একশোটি সভা করেছিল সেই সময়ে। এবং সব সভাতেই হিন্দু ‘পার্সোনাল ল’ বাতিল করে হিন্দু কোড বিল চালু করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়। হিন্দু কোড বিল বিরোধী এই আন্দোলনের পিছনে ছিল আরএসএসের সংগঠিত শক্তি।

আম্বেদকার প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করেছিলেন হিন্দু কোড বিল পাশ করাতে না পারা এবং আরও বেশ কিছু কারণে। সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন যে মন্ত্রিসভা তৈরি হল সেখানে বাবা সাহেব আম্বেদকারের জায়গায় নতুন আইন মন্ত্রী হলেন বাংলার চারুচন্দ্র বিশ্বাস। নতুন সংসদে ফের হিন্দু কোড বিল নিয়ে এলেন নেহরু। তবে এবার ওই বিলকে তিন ভাগে ভাগ করে তিনটি আলাদা বিল হিসেবে আনা হল। এই কাজে নেহরুকে বিশেষ ভাবে সহায়তা করেছিলেন চারুচন্দ্র বিশ্বাস। ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে ওইসব বিলে যেমন নাম থাকত চারুচন্দ্র বিশ্বাসের, নেহরুর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সেই সময় প্রখর যুক্তি সাজিয়ে নিয়মিত বিতর্কেও অংশ নিতেন। এই বাঙালি মন্ত্রীর পরিচালনাতেই সংসদে অবশেষে ১৯৫৬ সালে পাশ হয়েছিল হিন্দু কোড বিল।

দেশের স্বাধীনতার বিরোধী – এই অভিযোগে চারুচন্দ্রের বাবা আশুতোষ বিশ্বাস নিহত হয়েছিলেন বিপ্লবীদের হাতে। পেশাদার সরকারি আইনজীবী আশুতোষ বিশ্বাসের অপরাধ কতটা তা নিয়ে তর্কের অবকাশ আছে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে একজন বিপ্লবী নিজের প্রাণের বিনিময়েই এই শাস্তি দিয়েছিলেন, স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন ফাঁসির মঞ্চ। কিন্তু সেই আশুতোষ বিশ্বাসের পুত্র চারুচন্দ্র বিশ্বাস নেহরুর পাশে থেকে একটা বড়ো কাজের সাক্ষী থেকে গেলেন ভারতের ইতিহাসে।

অন্যদিকে হাইকোর্ট থেকে পদত্যাগের সঙ্গেই সঙ্গেই দেখা যাচ্ছে বিজেপিতে যোগ দেওয়া প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, গান্ধী না গডসে, তিনি কোনদিকে, এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দিতে না পেরে মুখ লুকোচ্ছেন। এখানেই, শুরুটা প্রায় এক রকম হলেও দুই প্রাক্তন বিচারপতি, চারুচন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে ‘ভগবান’ গঙ্গোপাধ্যায়ের ফারাক যে অনেকটাই, প্রমাণ হয়ে যায়।

_____ 
শুভাশিস মৈত্র একজন ফ্রিল্যান্স সিনিয়র জার্নালিস্ট। লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে বঙ্গদর্শন.কম সম্পাদকীয় দপ্তরের মতামতের কোনও সম্পর্ক নেই।  

Developed by DXDasia