বইমেলা শেষ হতেই পাঠকশূন্য বইবাজার!

 

বাংলা বই প্রকাশনা বলতে কলেজ স্ট্রিট সর্বজনবিদিত। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারির বইমেলার পর কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ার হাল ক্রমশ খারাপ। আচ্ছা আচ্ছা প্রকাশনার ভারী ও গুরুত্বপূর্ণ বইয়ে পাঠকের মন রুচছে না। কাতারে কাতারে বই প্রকাশ হচ্ছে, অথচ মুনাফা ঘরে তুলতে না পেরে মাথায় হাত পড়ছে প্রকাশক থেকে বই বিক্রেতাদের। প্রায় পাঁচশত দোকানের সামনে সারি সারি সাজানো ভৌতিক – থ্রিলার থেকে তন্ত্রের বই। একদিকে যেমন এই সমস্ত বইয়ের বিক্রি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, অন্যদিকে মূল সাহিত্যের বইয়ের বিক্রি ক্রমশ তলানিতে এসে ঠেকছে। কোনো প্রকাশকই আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে মুখভরা হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পাচ্ছে না। প্রায় সব প্রকাশনা এখন মূলধারার বিষয়ের বাইরে গিয়ে একটু অনুভাবনার বই করছেন। বাজারে বই বিক্রেতাদের চাহিদা সেই বইয়েই বেশি। ফলত সমাজ – সাহিত্য ও সংস্কৃতি অথবা গবেষণামূলক বইয়ের চাহিদা একেবারেই কমে গেছে।

প্রায় পাঁচশত দোকানের সামনে সারি সারি সাজানো ভৌতিক – থ্রিলার থেকে তন্ত্রের বই। একদিকে যেমন এই সমস্ত বইয়ের বিক্রি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, অন্যদিকে মূল সাহিত্যের বইয়ের বিক্রি ক্রমশ তলানিতে এসে ঠেকছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি মূলধারার বইয়ের পাঠক কমছে? অথবা পাঠকের মনোপযোগী বই প্রকাশ কম? নাকি পাঠক পরিবর্তন হচ্ছে? আপতভাবে দেখতে গেলে সব প্রশ্নের উত্তরই এক অপরের পরিপূরক। বর্তমানে বাংলা প্রকাশনায় তরুণ প্রকাশকদের ভিড় বেড়েছে। বিষয় নির্বাচন থেকে প্রোডাকশন সবই খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে, তাতে একটা দিক পরিষ্কার, যে বড়ো প্রকাশনার পাশাপাশি ছোটো প্রকাশকদের প্রকাশিত বই পাঠকের একটা সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাধ সাজচ্ছে ভৌতিক ও থ্রিলার। এখানে একটা কথা একটু মন দিয়ে আমাদের বুঝতে হবে। কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলের প্রায় এক তৃতীয়াংশ প্রকাশনা, বই নির্মাণের পাশাপাশি অন্যান্য প্রকাশনার বই বিক্রি করে থাকে। সেই সূত্রে তারা এই হিসেবেই প্রকাশনার পাশাপাশি বই বিক্রির মতো বিভাগকে প্রাইমারি প্রফেশন বা প্রথম জীবিকা হিসেবে দেখছে। কারণ একটা বই তৈরির পেছনে যে পরিমাণ শ্রম, সময় ব্যয় হচ্ছে, তার থেকে বড়ো প্রকাশনার বেস্ট সেলার বই নিজের দোকানে ডিসপ্লে করলে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ বাড়ছে। হাতে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই পাঠক কিনে নিচ্ছেন। আর কিনলেই একটা লভ্যাংশ বিক্রেতার হাতে ঢুকছে। সারাদিনে ফেলুদা, ব্যোমকেশ-এর সঙ্গে সঙ্গেই ভৌতিক ও থ্রিলার পাঠকের চাহিদা পূরণ করে দিচ্ছে। ফলে বড়ো একটা অংশ অর্থাৎ যাঁরা মূলধারার বই পরিবেশন করছে বা প্রোডাকশন করছে, তাঁরা দৈনিক অর্থ উপার্জনে পিছিয়ে যাচ্ছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা যেটা, বিরাট সংখ্যক পাঠক এখন কবিতা বা প্রবন্ধ বিমুখ। যেটুকু আছে তাঁরা বাংলার আগামীদিনের পাঠকের তালিকার শেষ সারিতে আছেন।

তাহলে এর উপায়? ইন্টারনেট সূত্রে জানা যায় সারা পৃথিবীতে প্রায় ষাট শতাংশ মানুষ সপ্তাহে একদিন বই পড়েন। আরো একটি গবেষণা থেকে জানা যায় প্রায় সাতান্ন শতাংশ মানুষ মুদ্রিত বই পড়েন। এবং স্বল্প শতাংশ মানুষ পড়েন ই-বুক। তাহলে দেখা যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বে সবেমাত্র ষাট শতাংশ মানুষ বইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, আজকের বাংলায় বই ও পাঠকের সহাবস্থান কেমন হবে? সম্প্রতি বাংলা বাজারে যে বিষয়টি বেশি পাঠকপ্রিয়তা বাড়িয়ে তুলেছে, সেটা হলো ভৌতিক এবং থ্রিলার বিষয়ক বই। এর জন্য যদিও বায়োলজিক্যাল দিক নিয়ে একটু বলতে হবে, যেটা হলো দৈনন্দিন জীবনের ট্রেস ও বিষণ্ণতা থেকে অবসাদ বা মুক্তির জন্য সাসপেন্স বা রহস্যঘেরা টোপ থেকে কীভাবে নায়ক বা নায়িকা বা চরিত্রের মুক্তি। এই মুক্তি আসলে পাঠক নিজের মুক্তির দাবিতে করছেন। তাই যত বেশি কর্পোরেট চাকরি, সরকারি বা বেসরকারি চাকরিরত পাঠক বেশি, ততই মূল ধরার সাহিত্য পাঠ থেকে আসতে আসতে পাঠক দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলছেন। অনেক তথ্য বা তত্ত্বের প্রাচুর্য, বৈভব – এগুলো দিয়ে বাংলার পাঠকের মনকে পাঠযোগ্য তৈরি করা খুবই কঠিন। দ্বিতীয়ত, আগেই বলেছি, বাংলা বাজারে সেই সেলস ম্যান বা সেলারের আজও বিরাট ঘাটতি। তাই যত দ্রুত বস্তুগত উপাদানকে টাকায় রূপান্তর করার সুযোগ কেইইবা হাত ছাড়া করে! ইঁদুর দৌঁড়ে তাই পিছিয়ে যাচ্ছে গবেষকদের মেধা, মনন আর বুদ্ধি। সারাদিনে একটা থ্রিলার অন্তত দশটা বিক্রি হলেও, সেই উপার্জিত উপার্জন তার হাতে। ফলে আজকের প্রকাশকের বই বিক্রির উদাসীনতা যেমন আছে, তেমনই অভাব আছে পাঠকদের নিষ্ঠায়। যেখানে বার বার ভালো প্রবন্ধের বই, উপন্যাস ও গবেষণাধর্মী বইয়ের চাহিদা কমে আসছে।

বড়ো একটা অংশ অর্থাৎ যাঁরা মূলধারার বই পরিবেশন করছে বা প্রোডাকশন করছে, তাঁরা দৈনিক অর্থ উপার্জনে পিছিয়ে যাচ্ছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা যেটা, বিরাট সংখ্যক পাঠক এখন কবিতা বা প্রবন্ধ বিমুখ।

তবে এদিক থেকে বাতাসের মোট কার্বন ডাই অক্সাইড-এর আনুমানিক হার, আমাদের বাংলার ই-পাঠকের মতোই। যতদিন এই পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি না হচ্ছে, ততদিন বাংলা প্রকাশনার আকাশ নির্মূল। তবু কোথাও যেন ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই আঁতকে ওঠে। আবার মাত্রাতিরিক্ত বই প্রকাশ বর্তমান পাঠকের কাছে একটা বিশেষ চিন্তার বিষয়। সাধারণত একজন লেখকের আজকের সময়ে একশো পাঠক মানেই অনেককিছু। প্রায় সব মাইলস্টোন ছুঁয়ে ফেলা। কিন্তু আদতে সেটা কখনই নয়। বর্তমানে বেশ কয়েকজন প্রকাশকদের কথা অনুযায়ী, ‘বই প্রকাশ হচ্ছে। এখন প্রিন্ট ওন ডিম্যান্ড’, তাই বেশি  সংখ্যক বই প্রকাশ করে তাকে রীতিমতো প্রচার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিক্রি করে ফেলতে পারবে, তেমনটা একদমই নয়। ফলে বই বিক্রির শতকরা হার কমছে। আর ই-বুক খানিকটা সার্পোট দিচ্ছে নতুন পাঠক মজুত দেওয়াতে।

আর সবশেষে বলা যেতে পারে, বিরাট একটা পিডিএফ সংগ্রহকারী ও সরবরাহকারী নানান, সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ। যেখানে বিনা বাধায় অনেক দুষ্প্রাপ্য বই ও তার পিডিএফ এহাত থেকে ওহাত হচ্ছে। এবং সহজেই সেটা পিডিএফ ভার্সান করে পড়ে ফেলেছে। ফলে একটু একটু করে মুদ্রিত বইয়ের সেল কমছে। তাই শুধুমাত্র পাঠকের জন্য পাঠককে ভাবতে হবে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা মোবাইল নির্ভর। তবুও এই মোবাইলের বাইরে গিয়েই পাঠককে করতে হবে ধারাবাহিক বইমুখী। তাছাড়াও সম্প্রতি বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান আন্দোলন এপার ওপার বাংলা বই বিক্রিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। কলকাতা বইমেলার পরেই একটা বিরাট সংখ্যক বই বাংলাদেশে প্রচার হয়ে থাকে, এবং প্রায় অনেক প্রকাশকের একটা মোটা অঙ্কের বই ওপার বাংলা থেকে ক্রয় হয়। এটাও চলতি বছরে প্রায় নেই বললেই চলে। সেহেতু শুধু বাংলা বইকে গবেষণাধর্মী বা মূলধারার দিকে এগিয়ে নিতে যেতে পারবে না। এরই সঙ্গে যুক্ত করতে হবে নানান সরকারি উদ্যোগ যা বিভিন্ন মাধ্যমে বই বিক্রির একটা বিরাট পন্থা। এই বিষয়ে একটু বলা ভালো যে বছরে একটা সময় এই ছোটো ছোটো গ্রন্থমেলা সাড়ম্বরে পালিত হয়। কিন্তু একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক সেই সমস্ত মেলায়, নির্দিষ্ট সেলারের বই বেশি বিক্রি হয়। ফলত মেলায় অংশগ্রহকারী সমস্ত প্রকাশকের সমান বই বিক্রির কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ এখানেও কোথাও একটা প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যায়। এরই সঙ্গে বাংলার প্রায় দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিরাট সংখ্যক স্কুল পড়ুয়া ডাইভার্ট হয়েছে ইংরেজি মাধ্যমের পড়াশোনা ব্যবস্থায়। সেদিক থেকে ইংরেজি বইয়ের বিক্রি অনেকটা বাংলা বইয়ের বিক্রির পথকে কিছুটা ধাক্কা দিচ্ছে।

অতএব কোনভাবেই বাংলা বইয়ের পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়, এটা আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে বলা যাবে না। বাংলার অন্তত প্রতিটি গ্রামে বাংলা বই পড়া অভিযান, নানান রকম কর্মসূচি ও প্রকল্পের মধ্য দিয়েই বাংলা বইয়ের পাঠ উদ্ধার করতে হবে।

Written by