শান্তিপুর, ফুলিয়ার থেকে বাংলার বেগমপুরের তাঁতশিল্প কি পিছিয়ে পড়েছে?

 

হাওড়া থেকে বর্ধমানগামী কর্ড লাইনের ট্রেনে চাপুন (আপনি চাইলে সড়ক পথেও যেতে পারেন)। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবেন বেগমপুর। নেমে রেললাইন পেরিয়ে, বাঁদিক ধরে পশ্চিমামুখে গেলেই দেখবেন শতবর্ষী বৃদ্ধের মতো দাঁড়িয়ে একটি গ্রাম। বেশ বড়োই বলা চলে। এখানে গিয়েছিলাম দুর্গাপুজোর আগে। ভেবেছিলাম, গ্রামে এ-সময় বেশ ভিড় থাকবে। কিন্তু, হতাশ হলাম। পুরো গ্রাম ঘুরেও আশানুরূপ ক্রেতার দেখা পেলাম না। কৌতূহল হলো। শান্তিপুর-ফুলিয়ার মতো বেগমপুরের তাঁতশিল্পও তো কম জনপ্রিয় ছিল না, আজ তার এ হাল হলো কী করে?

বেগমপুরে তাঁতের কাজ হয় মোটামুটি তিনভাবে৷ সমবায়ের অধীনে তাঁত বোনেন শিল্পীরা, হ্যান্ডলুমে ক্লাস্টার গড়ে তাঁত বোনা হয় এবং পাওয়ারলুমে বুনে মহাজনের মাধ্যমে চলে ব্যবসা৷ এখানে তাঁত সমবায়ে যুক্ত প্রায় চারশোর বেশি তাঁতি৷ ২০১০ সালে গড়ে ওঠে বেগমপুর হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি৷ ঐতিহ্য আর যুগের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই ছিল ক্লাস্টারের কাজ৷ তাতেই সাফল্য৷ সরকারি/বেসরকারি সংস্থা এখানকার কাজ কিনতো৷ কিন্তু, লকডাউনের সময় বেগমপুরের তাঁতশিল্প বেশ ধাক্কা খায়। যে ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারেননি এখানকার তাঁতিমহল।

আধা-স্বচ্ছ বুনন, উজ্জ্বল রং ও ঐতিহ্যবাহী মাথাপাড় নকশা বেগমপুরী শাড়ির বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও শাড়ির পাড়ে অভিনবত্ব দেখা যায়। প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য ফুটে ওঠে বেগমপুরের শাড়িতে। পোড়ামাটির মন্দির, বিষ্ণুপুরি কাজ উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

একটু উপযাচক হয়েই গ্রামের তাঁতশিল্পী অজয় রক্ষিতের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললাম। বংশানুক্রমিকভাবেই তাঁর এই কাজে আসা। প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কাজে যুক্ত রয়েছেন। জানালেন, এখানকার অন্যান্য তাঁতশিল্পীদের সংখ্যাগরিষ্ট অংশই বংশানুক্রমিকভাবে তাঁত বুনে চলেছেন। কঠোর পরিশ্রম ও দীর্ঘ অধ্যাবসায়ে শিল্পী বুনে চলেন কাপড়। মূলত মহাজনেরাই সুতোর জোগান দেন এই তাঁতশিল্পীদের কাছে। আগে তাঁতিদের বাড়িতেই সুতোর রং ও অন্যান্য কাজ  হতো। মূলত বাড়ির মহিলারাই এই কাজগুলো করতেন। বর্তমানে মহিলাদের উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ পরিমাণে কমে গ্যাছে। তার মূল কারণ, বর্তমানে মহাজনেরাই রঙিন সুতোর জোগান দেন। আরেক তাঁতশিল্পী অর্জুন ভড়ের কথানুযায়ী, একটি তাঁতের শাড়ি করতে মোটামুটি দেড় থেকে দুদিন লাগে। মহাজন ৫০ থেকে ৬০টি শাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় সুতো দিয়ে যান। এবং এই শাড়ি বুনতে শিল্পীদের লাগে ৬০-৭০দিন।

উজ্জ্বল রং ও ঐতিহ্যবাহী মাঠাপাড় নকশা বেগমপুরী শাড়ির বৈশিষ্ট্য। পিট লুম বা ফ্রেম লুম ব্যবহার করে কাপড়গুলি হাতে বোনা হয়, যেখানে ‘এক্সট্রা ওয়েফট’ (Extra Weft) কৌশলও দেখা যায়। এই বুনন পদ্ধতিতে রঙিন সুতো ব্যবহার করে কাপড়ের উপর নকশা তৈরি করা হয়, যা অনেকটা এমব্রয়ডারি বা অ্যাপ্লিকের মতো দেখতে লাগে। শাড়ির ভিতরে ও পাড়ে দু’জায়গাতেই সোজা-সরল নকশার সুতোর কাজ দেখা যায়। শাড়ি জুড়ে স্ট্রাইপ-প্যাটার্ন ও কন্ট্রাস্ট শেডের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। শাড়িগুলো ওজনে হালকা হয়, যা খুবই আরামদায়ক। যদিও বেগমপুরী শাড়ি-র নিজস্বতা সেভাবে আর দেখা যায় না। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করেন তাঁতিরা।

কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে কথা বলার সময় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নজরে এলো। তাঁদের কথানুযায়ী, আগে বাড়ির মহিলাদের এই শিল্পে যথেষ্ট অবদান থাকতো। রং করা থেকে ঠান্ডা জলে সুতোকে ভেজানো – সুতোকে শাড়ি বানানোর উপযোগী করে তোলাতে গ্রাম্যনারীদের অবদান ছিলো অনস্বীকার্য। কিন্তু এখন রঙিন সুতো (প্রায় তাঁতের জন্য রেডি হওয়া সুতো) সরাসরি মহাজনের মাধ্যমে শিল্পীদের কাছে পৌঁছে যায়। এছাড়া মহিলাদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার পিছনে আরেকটি মূল সমস্যা হলো, এই শিল্পে লাভের পরিমাণ কমে যাওয়া।

 

সরকারি সহায়তায় বেগমপুরের তাঁতশিল্প মরতে মরতে বেঁচে থাকলেও তাঁতিদের কথায়, এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল হয়ে সংসার চালানো খুবই মুশকিল। অন্তত, তা দিয়ে এই ক্রমবর্ধমান অনিয়ন্ত্রিত বাজার-ব্যবস্থায় টিকে থাকা যায় না।

এই বাজারে স্বাধীন তাঁতি নেই বললেই চলে। যেসব তাঁতিরা অন্যের অধীনে তাঁত বোনেন, তাঁদেরকে তাঁত-শিল্পীর বদলে তাঁত-শ্রমিক বলা ভালো। কারণ, যে ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান শাড়ির বরাত দেয়, তারাই দাম নির্ধারণ করে এবং সুতোর যোগান দেয়। স্রেফ মজুরি হিসেবে শাড়ি পিছু ১৫০-২০০ টাকা পান এই শিল্প-শ্রমিকরা। শাড়ির নকশা কী হবে, কোন শাড়িতে কোন ধরনের পাড় বসবে, সেটা আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয়। তাই শিল্পী-শ্রমিকদের নিজস্বতা দেখানোর খুব একটা জায়গা থাকে না। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মহাজনেরাই ঠিক করে দেন সর্বস্ব।

অন্যান্য কুটিরশিল্পের মতোই, তাঁতশিল্পেও নতুন প্রজন্ম আর আগ্রহী নয়। সরকারি সহায়তায় বেগমপুরের তাঁতশিল্প মরতে মরতে বেঁচে থাকলেও তাঁতিদের কথায়, এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল হয়ে সংসার চালানো খুবই মুশকিল। অন্তত, তা দিয়ে এই ক্রমবর্ধমান অনিয়ন্ত্রিত বাজার-ব্যবস্থায় টিকে থাকা যায় না। ফলে তাঁরাও আর বর্তমান প্রজন্মকে এই শিল্পের দিকে ঠেলছেন না। শান্তিপুর, ফুলিয়ার থেকে বেগমপুরের তাঁতশিল্পে বেশি করে এর প্রভাব পড়েছে।

যেসব তাঁতিরা লোন নিয়ে যন্ত্রচালিত তাঁতের দিকে ঝুঁকেছিলেন, করোনার পর তাঁদের অবস্থাও শোচনীয়। অনেকেই লোন মেটাতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বেগমপুরে তাঁতশিল্পীদের সমবায় থাকলেও আর্থিক সুরাহা হয় না হস্তচালিত তাঁতিদের। তাঁদের কথায়, একমাত্র সরকারি হস্তক্ষেপেই এই শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। তাছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। একসময় ভরদুপুরে, হস্তচালিত তাঁতের দাপটে এলাকায় কান পাতা দায় ছিলো। এখন মনে হয় পাওয়ারলুমের শব্দদানবের থেকে সেটাই বরং ভালো। বাড়ি ফেরার সময়, দুপুরের কাজ শেষ করে এক শিল্পী বাইরে বেরিয়েছেন একটু জিরোতে। বললেন, তাঁদের মতো যাঁরা হস্তচালিত তাঁতে এখনও টিকে আছেন, তাঁরা বোকা। মানিকের মদন তাঁতির মতোই।
________________________

মতামত লেখকের নিজস্ব

Written by