December 12, 2025 | 10:48 AM

পাকদণ্ডীর দুর্বিপাক : আট হাজার মিটার উচ্চতার পথেও মানুষের জ্যাম!

আট হাজারেও জ্যাম!

নীলচে সাদা বরফ পেরিয়ে এগিয়ে চলেছেন আরোহীরা। দুর্গম ক্রিভাসে ল্যাডার ব্যবহার করতে গিয়ে একটু আগেই প্রাণ চলে যাচ্ছিল একজনের। কোনও মতে ঠিক সময় ব্যালেন্স সামলে ল্যাডার পার করেছেন। সামনেই ডেথ-জোন। এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে প্রতি বছর। ডেথ-জোনের আবহাওয়া এমনিতে আন্দাজ করা মুশকিল। তার মধ্যে ভরা মরশুমে এই ডেথ-জোন থেকে এভারেস্টের চূড়া অবধি যে লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে সেখানেই এবার দাঁড়াতে হবে আরোহীকে। প্রায় হাজার জনের পিছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। যে কোনও মুহূর্তে ফুরিয়ে যেতে পারে অক্সিজেন। তবু এই লাইনে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। (মাউন্ট এভারেস্টে মানুষের জ্যাম)!

 

বার্ষিক প্রায় ষাট হাজার মানুষ এভারেস্টে আসেন এবং ফেলে যান রাশি রাশি বর্জ্য। খুম্ভু হিমবাহের কাছে মিলেছে এক কেমিকাল, যা এসেছে সম্ভবত কোনও পর্বতারোহীর ওয়াটারপ্রুফ জুতো থেকে।

ভরা মরশুমে এমনই অবস্থা হয় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গটির। সবচেয়ে উঁচু, তাই তার গর্বও বেশ উচ্চমানের। পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থানে দাঁড়িয়ে নিজেকে সর্বোচ্চ মনে করার অনুভূতি থেকে কেউই বঞ্চিত হতে চায় না। অবশ্য একথাও ঠিক, এই চাওয়া যদি শুধুই সেল্ফ গ্লোরিফিকেশনের জন্য হত তবে প্রাণের এত ঝুঁকি নিয়ে বারবার মানুষ আসত না এমন সব জায়গায়। (মাউন্ট এভারেস্টে মানুষের জ্যাম)

হিলারির এভারেস্ট, নোরগের সাগরমাথা
১৯৫৩ সালে নোরগে ও হিলারি যেদিন পৃথিবীর সর্বোচ্চ এই স্থানে প্রথমবার পা রেখেছিলেন, সেদিনই এই উচ্চতার স্বপ্নের ভাগীদার হয়েছিলেন আরও অনেক মানুষ। তখন থেকেই এই উচ্চতায় পৌঁছাবার সাধ অন্তরে লালন করছিলেন তাঁরা। তবে তখনকার অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা আর যথাযথ প্রযুক্তির অভাবের ফলে ইচ্ছে থাকলেও দুর্গমে পাড়ি দেওয়া ছিল বেশ শক্ত। এতে মানুষের অদম্য অনুসন্ধিৎসা সব সময় পূরণ না হলেও দু-হাত বাড়িয়ে সবচেয়ে উচুঁতে একা দাঁড়িয়ে থাকা এভারেস্ট কিংবা মাকালুর মতো অন্যান্য আটহাজারি শৃঙ্গগুলির বোধহয় খানিক সুবিধেই হয়েছিল। আধুনিক পৃথিবীর কাছে দূরত্ব বিড়ম্বনার কারণ নয়। যেখানে যেখানে মানুষ যায় সেখানে শুধু যে তার পদচিহ্নটুকু সে রেখে আসে এমনও নয়। সঙ্গে ফেলে আসে বাহারি আবর্জনা ও অপূরণীয় দূষণের অজস্র কারণসমূহ। নেপালের বেশ কিছু সংবাদপত্র বলছে, বার্ষিক প্রায় ষাট হাজার মানুষ এভারেস্টে আসেন এবং ফেলে যান রাশি রাশি বর্জ্য। খুম্ভু হিমবাহের কাছে মিলেছে প্যারাফ্লুরো অ্যালকাইল এবং পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল (সহজ ভাষায় ফরএভার কেমিকাল, নামেই মালুম কী জিনিস!) পদার্থের হদিশ। প্রকৃতির জন্য ভীষণ ক্ষতিকারক এই কেমিকাল খুম্ভুর মতো জায়গায় এসেছে সম্ভবত কোনও পর্বতারোহীর ওয়াটারপ্রুফ জুতো থেকে। প্রতিবছর এভারেস্ট অঞ্চল থেকে বছরে প্রায় ২২,০০০ কেজি মনুষ্যসৃষ্ট বর্জ্য পাওয়া যায়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলিতে উচ্চমানের ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা থাকলেও নেপাল বা ভারতের মতো দেশগুলিতে এমন ব্যবস্থা না থাকায় এই মনুষ্যসৃষ্ট বর্জ্য ব্যারেলে জমা করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। যত দুর্গম তত কম মানুষের পৌঁছাবার সম্ভাবনা সত্ত্বেও মৃতদেহ, প্লাস্টিক-সহ আরও নানা বর্জ্যে জর্জরিত হয়ে পড়েছে এমনকী পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ, প্রকৃত প্রস্তাবে যার নাম ’সাগরমাথা’। (মাউন্ট এভারেস্টে মানুষের জ্যাম)

কৃচ্ছ্রসাধনে ইশ্বরলাভ
নোরগে আর হিলারির হাত ধরেই ভারত এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে শুরু হল পাহাড় চড়ার প্রথা। মূলত ধর্মীয় নিষেধের কারণে, তার আগে এই অঞ্চলে এমন ধারণার প্রচলন ছিল না। ভিক্টোরিয়ান বিশ্বজিজ্ঞাসা অনেক অজানাকে প্রকাশ্যে আনতে সক্ষম হয়েছে, সন্দেহ নেই। যেন পৃথিবীর গূঢ় রহস্যকে সে না জেনে ছাড়বে না, এমনই ভঙ্গিতে শুরু হয়েছিল তার জ্ঞানতাত্ত্বিক অভিযাত্রা। সেখান থেকেই উঠে এল বর্তমানের আধুনিকতার ধারণা।

ইতিহাসে এক দীর্ঘসময় ভারত ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পাহাড়কে মনে করা হত পবিত্র। এখানকার মানুষের পাহাড়ের চূড়ায় চড়া ছিল নিষিদ্ধ। আজও যেমন এদিক থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা বা কৈলাসের মতো শৃঙ্গগুলি আরোহন করা একেবারেই বারণ। এদিককার মানুষ পাহাড়মুখী হয়েছে মূলত তীর্থের প্রয়োজনে। তাছাড়া পাহাড়যাত্রায় ছিল অত্যাবশ্যক কৃচ্ছ্রসাধনের এক অনিবার্য অধ্যায় যা ছাড়া পৌঁছোনো যেত না দেবভূমিতে। শুধু দুর্গম বলে নয়, দেবভূমির পবিত্রতার আড়ালেও, ইশ্বরকে ঢাল করে, অগোচরেই চলছিল প্রকৃতি সংরক্ষণের জরুরি প্রক্রিয়া। ‘কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে না’– এই প্রবাদ তো আর এমনি এমনি আসেনি। একসময় সত্যিই বিশ্বাস করা হত এই ধারণায়। আজকাল তো কনজিউম করার ক্ষমতা থাকলেই হেলিকপ্টারে চেপে পৌঁছে যাওয়া যায় ইশ্বরের দুয়ারে। কিছুদিন আগেও প্রযুক্তিগত কারণে সেই কথা মানুষ যেমন ভাবতে পারত না, তেমনই জাতির দার্শনিক ঐতিহ্য ও ধর্মবিশ্বাসও তাকে দিত না সেই অনুমতি।

পাহাড়ে আপনি যে সকল Human Waste নিয়ে উঠছেন, তা নীচে ফেরত নিয়ে আসা আপনার কর্তব্য। মানে, কেউ যদি পাঁচটা প্লাস্টিক নিয়ে যান তবে সেই পাঁচটা প্লাস্টিকে ময়লা ভরে তা সমতলে ফেরত নিয়ে আসতে হবে।

 

হাল ফ্যাশনের ট্রেকিং 
সমগ্র পাহাড় জুড়ে এখন ট্যুরিজমের রমরমা। নিত্যদিন আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন নতুন ট্যুরিস্ট স্পট, ট্রেকিং রুট। আর এই কম দূরত্বের ট্রেকিং রুটগুলির অবস্থা আরও শোচনীয়। মাউন্টেনিয়ারিংয়ে প্রয়োজন হয় মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি। তার রয়েছে কিছু বিশেষ জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ, চাইলেই যে কেউ এভারেস্ট বা মাকালু সামিট করতে পারে না। ফলে প্রশিক্ষিত ক্লাইম্বার বা মাউন্টেনিয়ারের সংখ্যা কখনওই খুব বেশি নয়। কিন্তু ট্রেকিংয়ে তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। কোনও রকম ফিটনেস ছাড়াই যে কেউ, যে কোনও কোথাও ট্রেকিংয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন। যথাযথ ফিজিক্যাল ফিটনেস ছাড়া ট্রেকিংয়ে গিয়ে অকস্মাৎ মৃত্যুর খবর এখন আর অবাকও করে না। আমাদের ইস্কুল-কলেজে মাউন্টেনিয়ারিং বা ট্রেকিং বিষয়ে কোনও রকম শিক্ষামূলক ক্লাস আজও নেই। তাই ফ্যাশন ট্রেন্ডে ভেসে পাহাড়ে গিয়ে নিজেরই ঔদ্ধত্যের শিকার হয় মানুষ। পাহাড়ের কাছে নতজানু হয়ে থাকার পুরোনো অভ্যাস ভুলে গিয়ে একটা বড়সড় গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছে মানুষ ও পাহাড়ের মধ্যে। ট্রেকিং-এ গিয়ে, ভ্লগ তৈরির মগ্নতায় লোপ পেয়েছে মানুষের আত্মমগ্নতার অভ্যাস। প্রকৃতির সঙ্গে শেষ সম্পর্কটুকু ছিঁড়ে যাচ্ছে এই রিলময় পৃথিবীতে। পর্বতারোহী ও ‘ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশন’-এর সদস্য শ্রী ভাস্কর দাস জানান, অনিয়ন্ত্রিত ট্রেকিংয়ের ফলে পাহাড় ভারসাম্য হারাচ্ছে প্রতিদিন। কোনওরকম গাইডেন্স ছাড়াই ৩০-৪০ জনের দল পাহাড়ের নানা জায়গায় পৌঁছে নষ্ট করছেন পরিবেশ। অনেকক্ষেত্রে একই অস্থায়ী বাথরুম এতজন মিলে ব্যবহার করার ফলে দূষিত হচ্ছে ক্যাম্প ও তার আশেপাশের জলের উৎস। এছাড়া প্লাস্টিক দূষণের সমস্যা তো রয়েইছে। ‘ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশন’ এ বিষয়ে বিশেষ কিছু সতর্কতা নেওয়ার চেষ্টা করছে অবশ্যই। কিন্তু এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সংশ্লিষ্ট সকলের সার্বিক প্রচেষ্টা ছাড়া অসম্ভব।

বেড়ালের গলায় ঘণ্টা
ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংগঠন ‘Leave No Trace’ নীতির প্রচার করছেন। তাঁরা বলছেন, পাহাড়ে আপনি যে সকল Human Waste নিয়ে উঠছেন, তা নীচে ফেরত নিয়ে আসা আপনার কর্তব্য। মানে, কেউ যদি পাঁচটা প্লাস্টিক নিয়ে যান তবে সেই পাঁচটা প্লাস্টিকে ময়লা ভরে তা সমতলে ফেরত নিয়ে আসতে হবে।

অবশ্য ভারতবর্ষের মতো দেশে যেখানে শহরের বাতাসের ধোঁয়াশাকে সাধারণ মানুষ কুয়াশা বলে ভুল করে প্রাণ খুলে শ্বাস নেয়, সেখানে সেই মানুষেরাই পাহাড়ে গিয়ে প্রকৃতির প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা ও নীরবতা বজায় রাখবে, চিন্তিত হবে অতিরিক্ত পদচারণার ফলে বিভিন্ন তৃণগুল্মের মৃত্যুতে, অথবা উদ্বিগ্ন হবে বন্যপ্রাণীদের অসুবিধের বিষয়ে, কিংবা দায়িত্বশীল নাগরিকের মতো বয়ে নিয়ে যাওয়া প্লাস্টিক সমতলে ফিরিয়ে আনবে সেই আশা বৃথা। এর জন্য সঠিক সামাজিক পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে সরকারকে, দায় নিতে হবে আমাদেরও। বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনে অঙ্ক বা ভৌতবিজ্ঞানের সমমর্যাদা দিতে হবে পরিবেশ শিক্ষাকে। পরিবেশবিরোধী যে কোনও পদক্ষেপের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, তা সে পদক্ষেপ আপনি-আমি নিই অথবা বড়ো কর্পোরেট সংস্থা। তবে এ তো অনেক দীর্ঘমেয়াদী ও ধীর প্রক্রিয়া আর বেড়ালের গলায় ঘণ্টাই বা বাঁধে কে?

 

অ্যাপোকালিপ্স নাও
অথচ পৃথিবীর হয়েছে ভয়ানক জ্বর, উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে তাপমান। এই জ্বরের উত্তপ্ত বাতাসে পুড়ব আমরা সকলেই। তাড়া নেই ভাবলে যা পরিণতি, তাড়া আছে মেনে নিলেও মোটামুটি তা-ই— জ্বর আর কমবে না, পুড়তে হবেই। তার আগে যে কদিন আছে, আসুন, সবাই মিলে দেখি এই অলীক কুনাট্য। পাহাড় থেকে শয়ে শয়ে জীবন্ত হাতি খাদে ঠেলে ফেলে দিয়ে যেমন পৈশাচিক মজা দেখতেন হুন রাজা মিহিরকুল, অথবা জ্বলন্ত রোম নগরী দেখে যে ধর্ষকামী আনন্দ পেতেন রোমান সম্রাট নিরো। কিংবা বানাই রিল, হ্যাশট্যাগ ‘অ্যাপোকালিপ্স নাও’।

_____________________
মতামত লেখকের নিজস্ব

Written by