তেপান্তর : অজয় নদের পাশে গড়ে উঠেছে যে নাট্যগ্রাম

পানাগড় থেকে শান্তিনিকেতনের মাঝে অজয় নদের পাশেই ছোট্ট গ্রাম, সাতকাহনিয়া। কাঁকর মাটির লাল রাস্তার চারপাশ দিয়ে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা জায়গাটিকে আজ ‘তেপান্তর’ নামেই লোকে চেনে। তবে তা মোটেই জনহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তর নয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে থিয়েটার ভিলেজ বা নাট্যগ্রাম হিসেবে গ্রামটির পরিচিতি তৈরি হয়েছে। যাঁর কাজের জন্য গোটা একটি গ্রাম বর্তমানে একটা দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে, তিনি কল্লোল ভট্টাচার্য। ‘এবং আমরা’ নাম দিয়ে তিনি বিকল্প নাট্যচর্চা করে চলেছেন প্রায় আড়াই দশক ধরে। তাঁর এই নাট্যচর্চা সম্পূর্ণভাবে বাদল সরকারের ‘থার্ড থিয়েটার’ দর্শনের না হলেও একটা মিশ্র ভাব রয়েছে যাকে থার্ড ফর্মের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে গ্রাম দেখতে, গ্রামের নাটক দেখতে। তাদের জন্য থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা অবধি রয়েছে।

সাতকাহনিয়া গ্রামে হিন্দু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। গুটি কয়েক পরিবার বাদে প্রত্যেকেই দরিদ্র ও নিম্নবর্গের অন্তর্ভুক্ত। কীভাবে গড়ে উঠলো এই নাট্যগ্রাম? এই নাট্যগ্রাম গড়ে তোলার মূল কাণ্ডারি কল্লোল ভট্টাচার্যের কাছে জানতে পারি, তাঁর ছোটোবেলা থেকেই বাড়িতে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল। বাবা ছিলেন একজন বামপন্থী কর্মী। বাবার সঙ্গেই কলকাতা যাওয়া আসা করতেন। বিভিন্ন বইপত্র ও নাটক দেখার মধ্যে ছিল ভালোবাসার সম্পর্ক। তবে সেসময় তিনি নাটক বলতে প্রসেনিয়াম থিয়েটারটাই বুঝতেন।

 

দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে গ্রাম দেখতে, গ্রামের নাটক দেখতে। তাদের জন্য থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা অবধি রয়েছে।

১৯৯৪ সালে গ্রামের সেচ দফতরের ডাকবাংলোয় নাটকের কর্মশালা বা ওয়ার্কশপ করাতে আসেন নাট্যকর্মী প্রবীর গুহ। তিনি ‘অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটার’ এর প্রতিষ্ঠাতা। সেইসময় গ্রামে গ্রামে নিজেদের নাট্য দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই গ্রাম-পরিক্রমা করে কর্মশালা করাতেন প্রবীর গুহ। সেই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন কল্লোল ভট্টাচার্য। তিনি বলেন—

“কর্মশালায় দেখলাম খোলা আকাশের নিচে, বারান্দায় হাতের কাছে যা পাওয়া যায় সেই উপকরণ দিয়ে, শরীরের ব্যবহারে থিয়েটার হচ্ছে। একদল মানুষ নিজেদের মতো করে তাঁদের জীবনের কথা বলছেন। কেউই প্রথাগত নাট্য শিক্ষায় শিক্ষিত নন। কলকাতার থিয়েটার যাঁরা দেখেননি তাঁরা কীভাবে গড়ে তুলছেন নাটক, এই ব্যাপারটি গভীর ছাপ ফেলল মনে”।

কলেজে পড়াশোনা শুরু করলেও কর্মশালায় আয়োজিত থিয়েটারের নতুন ফর্মটি ভাবিয়ে তুলেছিল কল্লোল ভট্টাচার্যকে। পুনর্বার প্রবীর গুহ গ্রামে এলে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মাধ্যমে নিজের নাট্যদল তৈরি করার কথা বলেন এবং তাঁর উৎসাহ ও পরামর্শে গ্রামের জনা ২০ ছেলেকে নিয়ে তৈরি করেন একটি নাট্যদল। দলের নাম দিলেন ‘ঘাসফুল থিয়েটার। প্রথমে বাড়ির সামনে ফাঁকা জায়গায় চলত মহড়া। নাটকের মধ্যে উঠে আসে গ্রাম জীবনের কথা, শিশুশ্রম কথা, সাম্প্রদায়িকতার কথা। আস্তে আস্তে পরিবারের মেয়েরাও যোগ দেয় দলে। যঁদের নিয়ে এই নাটকের দল, তাঁরা প্রত্যেকেই দরিদ্র ও নিম্নবর্গীয় পরিবারের, প্রাথমিক স্তরের পর কারোরই সেভাবে আর পড়াশোনা এগোয়নি। দিনের বেলায় তারা দিন-মজুর, সন্ধেবেলাতে শুরু করে নাট্যচর্চা। এখানেই সাতকাহনের তেপান্তর নাট্যগ্রাম পশ্চিমবঙ্গে একটা নজির গড়ে তুলেছে।

‘তেপান্তর’ বর্তমানে শুধুই নাট্যগ্রাম হিসেবে পরিচিত, তাছাড়াও এলাকার অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক উত্তরণের ভরকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক নিয়ে পড়াশোনা ও নিজের দল চালিয়ে যেতে থাকেন। সেই সূত্রে বাদল সরকারের সঙ্গে আলাপ হয়, বীরভূম, বর্ধমানের বিভিন্ন জায়গায় নাট্য উৎসবে শামিল হন। এভাবে পাঁচ বছরের মধ্যে পরিচিতি তৈরি হয়। তবে দলের নাম নিয়ে শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। এক রাজনৈতিক দলের প্রতীক চিহ্নের সমতুল্য হওয়ায় দলের সঙ্গে তা  এক করে দেখা শুরু হয়। তাই ১৯৯৯ সালে কল্লোলবাবু দলের নাম পাল্টে রাখেন ‘এবং আমরা’।

থিয়েটারকে সর্বক্ষণের সঙ্গী করে নেবার তাগিদে ঠিক করেন, একটা থিয়েটার ভিলেজ গড়বেন। যেখানে থিয়েটার নিয়ে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা করা যাবে। কিন্তু থিয়েটারকে সঙ্গী করে নিলে সংসার চলবে কীভাবে? যাঁদের নিয়ে নাট্যদল তাঁরা সবাই দিন-মজুর, ইট ভাঁটার শ্রমিক, কেউ পরের জমিতে খেটে খায়। সারাদিনের পরিশ্রমের পর সন্ধ্যায় নাটকের রিহার্সাল দেওয়া অসুবিধা হয়ে পড়ে। এই সমস্ত কারণ থেকে জন্ম নেয় নিজস্ব ফার্ম বানানোর ভাবনা। বর্তমানে সেই ফার্মে পোলট্রি, মাছ চাষ, সবজি, ফলের বাগান মিলিয়ে ৫০ হাজারের কাছাকাছি উপার্জন হয়। সেই টাকায় তৈরি হয় একের পর এক নাটক।

২০০৪ সালে এই পুরো ক্যাম্পাসের নাম রাখা হয় ‘তেপান্তর’। ২০০৫ সালে পরিচয় হয় বার্লিন থেকে আসা ‘ফ্লাই-ফিস থিয়েটার কোম্পানি’ থিয়েটারের নির্দেশক হ্যারল্ড ফরম্যানের সঙ্গে। তিনি কর্মশালা করে যান। সেই কর্মশালার পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তেপান্তরকে ফার্মহাউস থেকে একটা নাট্যগ্রাম হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তারপর ২০০৮ সালে ‘রাশিয়ান আকাদেমি ফর থিয়েটার আর্টস’-এর কর্মশালার পর থেকে নতুন নতুন স্পেস নিয়ে কাজ শুরু হয়। সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। ৩০ জন সদস্যের মধ্যে ১৫ জন হয়ে যায় সর্বক্ষণের নাট্যসঙ্গী। সারাবছর ধরে চলে নানান কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, ও নাটক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ও বিদেশেও নাট্য প্রদর্শন করে ‘এবং আমরা’। ‘তেপান্তর’ বর্তমানে শুধুই নাট্যগ্রাম হিসেবে পরিচিত, তাছাড়াও এলাকার অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক উত্তরণের ভরকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কল্লোলবাবুর থিয়েটার পুরোপুরি থার্ড থিয়েটারের অনুগামী নয়। তাঁর থিয়েটার রাজনৈতিক, তাঁর থিয়েটার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তবু তাঁর মতে, প্রত্যেকটি শিল্পের প্রকাশ মাধ্যম আলাদা হয়ে থাকে। থার্ড থিয়েটার যে দর্শন, আঙ্গিক, বর্জন এর ব্যাপার রয়েছে সেখান থেকে কিছুটা ‘এবং আমরা’ আলাদা হয়ে যায়। তাঁরা ওপেন এয়ারে কাজ করলেও থিয়েটারের সমস্ত প্রমট ব্যবহার করেই নাটক পরিবেশন করেন। অর্থাৎ সাজ, লাইট, সাউন্ড প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা। আসলে এই দল যে কোনো স্পেসকে ধরেই প্রযোজনা করার চেষ্টা করেন। এছাড়াও এই দল কেন্দ্র সরকারের গ্রান্ড থেকে অনুদান পেয়ে থাকে।

বর্তমানে এই দলের প্রায় ২২টার মতো নাটক প্রযোজনা হয়েছে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘ভূত’, ‘অন্য কথা’, ‘অমলকান্তি’, ‘উলঙ্গ রাজা’ ইত্যাদি। এই গ্রামে আসতে হলে ট্রেনে করে প্রথমে পানাগড় স্টেশনে নামতে হবে, তারপর সেখান থেকে সাতকাহনিয়া যাবার বাস ধরে প্রায় দু’ঘণ্টা গেলেই গ্রামের মুখে নেমে টোটো করে পৌঁছে যাওয়া যাবে। তবে যাবার আগে কল্লোল ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাওয়া ভালো। যদি আপনি অনেক দূর থেকে যান, তাহলে অল্প মূল্যেই আপনার জন্য অতিথিশালা বন্দোবস্ত করে দেওয়া হবে। পাঠকদের সুবিধার্থে কল্লোল ভট্টাচার্যের যোগাযোগ নম্বরও দিয়ে রাখলাম- ৯৪৩৪৬৪৬৯৮২।

Written by