
যারা শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন, তাদের কী হবে? হেমন্তের তীব্র ঘ্রাণ নাকে নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলে, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। মনে পড়ে যায়, ‘ফেলে আসা জন্মের পাপ’। যতদূর দেখা যায়, ততটাই মৃদু কুয়াশার ছাপ ধীরে ধীরে শহরটাকে গ্রাস করতে এগিয়ে আসছে। দূরে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। তুলসী মঞ্চে শাঁখ বেজে উঠেছে। সন্ধে থেকেই এই গলিতে ভিড় বেড়ে যায়। সন্ধেবেলাই তো আসল কাজ শুরু হয়। প্রতিদিনের একই কাজ। একই শরীরকে বারবার ঘষেমেজে উপায় করা। বিভিন্ন ঘামের গন্ধ এই শরীরের ভিতর নিয়ে, সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ দেওয়া। প্রতিদিন নতুন নামে ডাকতে ভালোবাসে খদ্দেররা। কিন্তু এই গলিতে ওর একটা নাম আছে। সেই নামের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে আধার, ভোটার, প্যান, রেশন, ব্যাঙ্কের বই, জীবনবিমা ইত্যাদি। কিন্তু সে নাম তো পরিবারের দেওয়া নয়। সে নাম তো জন্ম পরিচয়পত্রে লেখা নেই। নিজেও ভুলে গিয়েছে তার আসল নাম কী ছিল। কতদিন বাড়ি ফেরা হয়নি, হয়তো আর হবেও না। কিন্তু ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) খবর প্রকাশ হতেই ঘুম ছুটেছে সেই গলির বাসিন্দাদের। যারা শিকড় থেকে বিছিন্ন। কেউ ইচ্ছাকৃত আবার কেউ জোরপূর্বক। তারা কোথায় খুঁজে পাবে সেই নথি? তারা আদৌ কি সেই নথি খুঁজতে চায়? কী বলছে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা? (যৌনকর্মী ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের জন্য SIR)
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, এইসব নাগরিকদের ক্ষেত্রেও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষভাবে যাচাই করে তাঁদের বাসস্থানের প্রমাণ নিতে পারেন, যেমন যেখানকার আশ্রয়কেন্দ্রে তাঁরা থাকেন বা যে এলাকায় তাঁরা নিয়মিত বসবাস করেন। এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমাজের প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলির (যেমন যৌনকর্মী ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষ) অনেকেরই স্থায়ী বাড়ি বা প্রমাণপত্র থাকে না।
ভারতের নির্বাচন কমিশন যৌনকর্মী এবং স্থায়ী ঠিকানাহীন নাগরিকদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষ নির্দেশিকা জারি করেছে। এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি যদি ভারতের নাগরিক হন এবং নির্দিষ্ট কোনও এলাকায় সাধারণ নিবাসী হিসেবে বসবাস করেন, তাহলে তাঁর ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা যাবে, এমনকী তাঁর কাছে স্থায়ী ঠিকানার কোনও সরকারি নথি না থাকলেও। অর্থাৎ, যৌনকর্মী, গৃহহীন মানুষ, তাঁদেরও ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, এইসব নাগরিকদের ক্ষেত্রেও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষভাবে যাচাই করে তাঁদের বাসস্থানের প্রমাণ নিতে পারেন, যেমন যেখানকার আশ্রয়কেন্দ্রে তাঁরা থাকেন বা যে এলাকায় তাঁরা নিয়মিত বসবাস করেন। এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সমাজের প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলির (যেমন যৌনকর্মী ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষ) অনেকেরই স্থায়ী বাড়ি বা প্রমাণপত্র থাকে না। ফলে এই নির্দেশিকা তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ও ভোটাধিকারের ক্ষেত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করেছে। কিন্তু এইরকম শত শত নির্দেশিকা দেশজুড়ে রয়েছে যা কাগজে কলমে খুবই কম স্বীকৃতি পেয়েছে। এগুলো অনেকটা ছোটোবেলার জুজুর মতো। বাস্তবে যার কোনও প্রয়োগ নেই। অনেক ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি পূর্বে নিজেদের নাম, লিঙ্গ বা ছবির পরিবর্তন করে নতুন ভোটার আইডি তৈরি করেছিলেন। এখন এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় কর্মকর্তারা তাদের পুরোনো নথি চাইছেন, যা তাদের বর্তমান পরিচয়ের সঙ্গে মিলছে না। ফলে অনেককে বলা হচ্ছে তাঁদের ভোটার আইডি ভুল বা অবৈধ। প্রয়োজনীয় কাগজ না দেখাতে পারলে নাম বাতিল হয়ে যেতে পারে। এতে ট্রান্সজেন্ডার নাগরিকদের মনে ভয় দেখা দিয়েছে যে, তাদের ভোটাধিকার ও নাগরিকত্বের স্বীকৃতি প্রশ্নের মুখে পড়বে। অনেক ট্রান্স নারী জানিয়েছেন যে, তথ্য যাচাইয়ের সময় তাঁদের বারবার জন্মের লিঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে, যা শুধুমাত্র অপমানজনক নয় বরং তাঁদের আত্মপরিচয়ের প্রতি অসম্মান। নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার ও সম্মানের পরিপন্থী এই আচরণ তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। ফলে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের অনেকেই মনে করছেন, এই এসআইআর প্রক্রিয়া যদি সংবেদনশীলভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে তা তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। (যৌনকর্মী ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের জন্য SIR)
তখন চুটিয়ে থিয়েটার করি। মফস্সলের একটি দলে আলাপ হল অচিন্ত্যর সঙ্গে। বয়সে বেশ খানিকটা বড়ো সেই অচিন্ত্যকে স্বাভাবিক ভাবেই দাদা বলে সম্বোধন করলাম। বেশ মিশুখে অচিন্ত্য সুন্দর করে নাটকের চরিত্র সম্পর্কে বুঝিয়ে দিত। একটি মাত্র প্রযোজনায় কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। মাঝে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। সেই অচিন্ত্য একদিন যে অনুভা হয়ে উঠবে কে জানত! সেই মানুষটি তার সম্পূর্ণ পরিচয় বদলে ফেলেছে। নিজের জীবনের মানচিত্রকে পাল্টে ফেলেছে। সে কী লিখবে এসআইআর ফর্মে? তার কি ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে? কাগজের প্রলোভনে কি হারিয়ে যাবে অচিন্ত্য, অনুভা দুজনেই? যে ছেলেটি অনাথ, সেও ভারতের সংবিধান অনুযায়ী একজন পূর্ণ নাগরিক। তাই বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলে তারও ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়মে বলা আছে, যে কেউ যদি কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় সাধারণ বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করে, তবে সে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারে। এই নিয়ম অনাথ শিশু বা যুবকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তারা যদি কোনও অনাথ আশ্রম, হোস্টেল বা সংস্থার তত্ত্বাবধানে বসবাস করে, তাহলে সেই সংস্থা বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের বসবাসের প্রমাণ হিসেবে সার্টিফিকেট দিতে পারে। নথিপত্র না থাকলেও স্থানীয় নির্বাচন আধিকারিক বা ব্লক লেভেল অফিসার সরেজমিনে যাচাই করে নিশ্চিত করতে পারেন যে ছেলেটি সত্যিই ঐ এলাকায় থাকে। যাচাই সম্পন্ন হলে তাকে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা হয় এবং অন্য নাগরিকদের মতোই সে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু আবার ঘুরেফিরে আসে সেই প্রশ্ন, এই বিরাট দেশে আদৌ কতটা প্রাসঙ্গিক হবে একজন অনাথের পরিচয় পত্র? কতটা প্রাসঙ্গিক হবে তার ভোটার কার্ডের বৈধতা। প্রসঙ্গত, ভারতে জেলবন্দিদের ভোটাধিকারের অধিকার নেই। কিন্তু তারা যদি এসআইআরের ফর্ম না পূরণ করে তাহলে তাদের নাম কি বাদ যাবে? এমন অনেক জেলবন্দি আছে যাদের বাড়ির কেউ খোঁজ রাখে না, তাদের ক্ষেত্রে কীভাবে বিষয়টা দেখা হবে, সেই নিয়েও কোনও সঠিক নির্দেশিকা নেই। (যৌনকর্মী ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের জন্য SIR)
২০০২ সালে যখন প্রথমবারের মতো এসআইআর চালু হয়, তখন ভোটার তালিকা ছিল মূলত হাতে লেখা বা আংশিকভাবে কম্পিউটারভিত্তিক। সেই সময়ের মূল লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকার ত্রুটি সংশোধন করা—যেমন মৃত ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া, এক ব্যক্তির একাধিক নাম থাকলে তা বাদ দেওয়া এবং ভুল বানান বা তথ্য সংশোধন করা। তবে সেই সময় অনেক অভিযোগ উঠেছিল যে, দরিদ্র, গ্রামীণ এবং অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর নাম ভুলবশত বাদ পড়ে যাচ্ছিল।
শুধু তাই নয়, যে ছেলে বা মেয়েটি স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে কিংবা কোনও কারণে পরিবার তাকে বের করে দিয়েছে তার কী হবে? কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে তাদের? সঠিক তথ্য না দিতে পারলেই তো ঘ্যাচাং ফু! তালিকা থেকে নাম বাদ যাবে। ২০০২ সালে যখন প্রথমবারের মতো এসআইআর চালু হয়, তখন ভোটার তালিকা ছিল মূলত হাতে লেখা বা আংশিকভাবে কম্পিউটারভিত্তিক। সেই সময়ের মূল লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকার ত্রুটি সংশোধন করা—যেমন মৃত ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া, এক ব্যক্তির একাধিক নাম থাকলে তা বাদ দেওয়া এবং ভুল বানান বা তথ্য সংশোধন করা। তবে সেই সময় অনেক অভিযোগ উঠেছিল যে, দরিদ্র, গ্রামীণ এবং অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর নাম ভুলবশত বাদ পড়ে যাচ্ছিল। কারণ তখন নথি যাচাইয়ের ব্যবস্থা ছিল দুর্বল এবং অধিকাংশ কাজ স্থানীয় কর্মকর্তাদের অনুমান বা কাগজে লেখা তথ্যের ওপর নির্ভর করত।
সমালোচক ও নাগরিক সমাজের একাংশের মতে, এই ডিজিটাল পরিশোধন প্রক্রিয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন বিপদ তৈরি করছে। যাদের আধার বা জন্মনিবন্ধন সংক্রান্ত নথি অসম্পূর্ণ—যেমন ট্রান্সজেন্ডার, যৌনকর্মী, গৃহহীন বা দরিদ্র শ্রমিকরা—তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের এসআইআর পুরোপুরি ডিজিটাল ও আধার-নির্ভর প্রক্রিয়া। এখন ভোটারদের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, ছবি ও লিঙ্গ সংক্রান্ত তথ্য আধার এবং অন্যান্য সরকারি নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের মতে, এই পদক্ষেপে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং জাল ভোট বা দ্বৈত ভোটার প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু সমালোচক ও নাগরিক সমাজের একাংশের মতে, এই ডিজিটাল পরিশোধন প্রক্রিয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন বিপদ তৈরি করছে। যাদের আধার বা জন্মনিবন্ধন সংক্রান্ত নথি অসম্পূর্ণ—যেমন ট্রান্সজেন্ডার, যৌনকর্মী, গৃহহীন বা দরিদ্র শ্রমিকরা—তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এই বছর বিহারে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৬৮ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়, পরবর্তী সংশোধনীতে আরও ৩.৬৬ লক্ষ নাম বাদ যায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছে এত কম সময়ে কেন ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন করা হচ্ছে? এই সংশোধনের জন্য তো আরও সময়ের প্রয়োজন। অনেকেই সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন। কিন্তু দিনশেষে একটা শ্রেণির মানুষকে প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁর লিঙ্গ, নাম, একাকিত্ব সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জন্মপরিচয়ের হিসেব না রাখা মানুষটা খুঁজতে যাচ্ছে ফেলে আসা হিসেব।
____________________
মতামত লেখকের নিজস্ব
