লালনের গানে জাতের কী রূপ!


বিশিষ্ট লালন গবেষক ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, “লালন চেয়েছিলেন একটি অখণ্ড মানব-মণ্ডলী গড়ে তুলতে। তিনি নিজেকে বিকশিত করেছিলেন সমাজ-বিদ্রোহী, ভাব-বিদ্রোহী, মরমী একজন সাধক হিসাবে।”গবেষকের এই কথা অবশ্য লালনের গানের ছত্রে ছত্রে বারবার প্রমাণিত হয়। বাংলা গানের ধারায় রবীন্দ্রগীতি, নজরুলগীতি অথবা অতুলপ্রসাদীর অনেক আগে থেকেই পাকাপাকি জায়গা ছিল তাঁর। ‘লালনগীতির’ সুরে মাতোয়ারা ছিল সেকাল। অবশ্য একালও যে একইরকম মাতোয়ারা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বাঙালি জীবনের সে এক ক্রান্তিকাল। পলাশীর যুদ্ধে স্বাধীনতার সূর্য তখন অস্তমিত। গ্রামীণ সমাজ নানাভাবে বিভক্ত। ধর্ম জাত-পাত ইত্যাদি নিয়ে সমাজে ছিল বিভিন্ন সমস্যা। ঠিক এরকম একটা সময়ে যখন প্রকৃতপক্ষেই সমাজ বদলের প্রয়োজন আসন্ন, তখনই আর্বিভাব ঘটে লালন ফকিরের।

লালনের জীবদ্দশায় তাঁর একমাত্র স্কেচটি তৈরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের মৃত্যুর বছরখানেক আগে ৫ই মে ১৮৮৯ সালে পদ্মায় তাঁর বজরায় বসিয়ে তিনি এই পেন্সিল স্কেচটি করেন – যা ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

সাধকের জন্ম ইতিহাস নিয়ে হাজার বিতর্ক থাকলেও  কীই বা এসে যায় এমন একজনের জন্ম বৃত্তান্তে যিনি কিনা আজীবন জন্ম পরিচয়ের ঊর্দ্ধে মানবতাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন! নিজেই তো বলেছেন,

“লালন বলে জাতের কী রূপ

           দেখলাম না এই নজরে।।”

কেবল গানে নয়, বাস্তবিকই তিনি ছিলেন জাত ধর্মের উর্দ্ধে। চেয়েছিলেন একটি জাত ধর্ম বর্ণ গোত্রহীন সমাজ গড়ে তুলতে। জীবদ্দশায় তাঁকে কোনো ধরনের ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করতেও দেখা যায়নি। সাধনা দিয়ে তিনি হিন্দুধর্ম এবং ইসলামধর্ম উভয় শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। যার নিদর্শন রয়েছে তাঁর অজস্র রচনায়। তাই হয়তো সমাজকে তিনি সরাসরি প্রশ্ন করতে পেরেছেন –

“আসবার কালে কি জাত ছিলে

এসে তুমি কি জাত নিলে।

কি জাত হবা যাবার কালে

সেই কথা ভেবে বলো না।।”

এই ভেদাভেদ কেবল জাত পাতের সীমানায় আটকে রাখেননি লালন। একের পর এক ছক ভেঙেছেন। আজ যখন সমাজ নারী,পুরুষ এই পরিচয়ের উর্দ্ধে সোচ্চার ঠিক তখন যেন বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন লালন। কি অদ্ভুত মন্ত্রবলে সেসময়ে দাঁড়িয়েই তিনি লিখতে পেরেছিলেন, “বামন চিনি পৈতা প্রমাণ, বামনী চিনি কী প্রকারে?” সমাজে ব্রাহ্মণ পুরুষদের আলাদা এই অলংকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন লালন। প্রশ্ন তুলেছিলেন কারণ নারীদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার দায় তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন অচিরেই।

একদিকে মেঘের আঁচল জুড়ে মন-কেমন-করা বৃষ্টির শব্দের মতো বাচনিক রহস্যময়তা, অন্য দিকে প্রতীক্ষার দীর্ঘায়িত শব্দাবলির ঘনীভূত হতে চাওয়া উদাসী সুরের নিটোল আলিঙ্গন। বাউল প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বিশ্বমানবের প্রশস্ত আধারে। ‘বাউল’ ধর্মীয় আচারে বিশ্বাসী নয়। স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালোবেসে অর্থাৎ প্রেমই ধর্মের শ্রেষ্ঠ, একেই অঙ্গীবদ্ধ করে বাউল ‘ভবপার’ হতে চায়। চৈতন্যদেব-প্রভাবিত মানবতাবাদী বৈষ্ণবধর্মের প্রেম ও বর্ণপ্রথাবিরোধী মনোভাব বাউল গ্রহণ করেছে জীবনে ও দর্শনে। লালনও সেই চৈতন্যে আশ্রয় পেতে আকুল হয়েছেন— ‘চরণ পাই যেন অন্তিম কালে/ ফেলোনা নরাধম বলে।/ সাধনে পাইব তোমার/ সে ক্ষমতা নেই যে আমার/ দয়াল নাম শুনিয়ে আশায়/ চেয়ে আছি কাঙালে।’

“যা আছে ভাণ্ডে, তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে”– এই ছিল লালনের (Lalan Fakir) দর্শন। বৈষ্ণব সহজিয়া, বৌদ্ধ সহজিয়া ও সুফিবাদের সংমিশ্রণে মানবগুরুর ভজনা, দেহ-কেন্দ্রিক সাধনাই লালন প্রদর্শিত বাউল ধর্মের মূলমন্ত্র। যে সাধনায় তিনি স্বীকৃতি দিয়েছেন, আকুল মিলনের আর্তিকে। বিপরীত লিঙ্গেই কেবল আকর্ষণ সম্ভব, সামাজিক এই ট্যাবুর বিরুদ্ধে আজ আইন হয়েছে। গলা ফাটিয়ে প্রতিবাদ করার লোকও জুটেছে, কিন্তু লালনের লড়াইটা ছিল একার। গানই ছিল তাঁর অস্ত্র। ক্রমাগত ধার দিয়েছেন তিনি তাতে। লালন ফকির বিশ্বাস করতেন সব মানুষের মধ্যেই বাস এক ‘মনের মানুষ’-এর। নারী অথবা পুরুষ এই তথাকথিত পরিচয়ের উর্ধ্বে সেই মনের মানুষের অবস্থান। যার সন্ধান পেতেই এই এতো আত্মসাধনা। যে মনের মানুষকেই আবার ফকির ‘অচিন পাখি’ও বলেছেন কখনো।

‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ কবিতাতেও দেহসাধনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কবি বলেছেন তাঁর বাড়ির কাছেই এমন একটি জায়গা আছে যেখানে এক পড়শি বসবাস করেন। এই জায়গাটি হল কবির শুদ্ধতম হৃদয় আর পড়শিটি হলেন ঈশ্বর। সেই ঈশ্বরের সান্নিধ্য পেতেই তিনি লিখেছেন – “পড়শি যদি আমায় ছুঁতো, যম যাতনা সকল যেতো দূরে।”

লালনের গান ও তাঁর জীবনদর্শন গভীরভাবে দাগ কেটেছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মনে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন—‘‘আমার অনেক গানে আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। …. বাউলের সুর ও বাণী কোনো এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে।’’ লালনের জীবদ্দশায় তাঁর একমাত্র স্কেচটি তৈরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের মৃত্যুর বছরখানেক আগে ৫ই মে ১৮৮৯ সালে পদ্মায় তাঁর বজরায় বসিয়ে তিনি এই পেন্সিল স্কেচটি করেন- যা ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা কতৃক আয়োজিত একটি ‘শ্রোতা জরিপ’-এ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কুড়িজন বাঙালির তালিকায় ১২তম স্থানে উঠে আসেন সাধক লালন ফকির। ১৮৯০ সালের ১৭ই অক্টোবর, বাংলা ১২৯৭ সালের পয়লা কার্তিক নিজের ১১৬ বছরের জন্মদিনে দেহত্যাগ করেন মহাত্মা ফকির লালন শাহ।

কিন্তু কিছু মানুষ তো কেবল রক্ত মাংসের অস্তিত্বতেই বেঁচে থাকেন না, বেঁচে থাকেন জীবনের ওঠাপড়ায়। খাতায় কলমের মৃত ঘোষণায় তার কিই বা এসে যায়? তাই লালন চলে গেলেও আজও মানুষ তাকে স্মরণ করে। প্রতি বছর মৃত্যুবার্ষিকীতে পাঁচদিন ব্যাপী চলে ‘লালন উৎসব’। আধুনিক সমাজ যখন একাকিত্বে ভুগছে তখনই যেন আশ্রয় হন ফকির। তাই মানব মুক্তির উদ্দেশ্যে রচিত গানের জন্য আজও বিশ্ব দরবারে তিনি দাপটের সাথে সমাদৃত। তাঁর লেখা গানের কোনো পাণ্ডুলিপি ছিল না, অথচ কেবল আত্মিক টানে গ্রাম বাংলায় লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েই অজেয় হয়ে রইলেন লালন। তাই লালন ভক্তরা এখনো তার উদ্দেশ্যে গেয়ে যায় –

“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়।
তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি
দিতাম পাখির পায়”

______________

তথ্যসূত্র: লালন (প্যাপিরাস জীবনী সিরিজ)- সুধীর চক্রবর্তী, লালন সাঁইয়ের সন্ধানে- ডক্টর আবুল হাসান চৌধুরী, লালন ভেদ সমগ্র- মোস্তাক আহমেদ

Written by