
– “অই মায়া! আমগো বাড়ি আবি? রাত জাগুম সবাই মিল্যা!”
– “নারে বইন! বড়দায় বোকবো।”
সম্প্রতি দিল্লি রাজ্যের পুলিশ এমন দোভাষীর খোঁজ লাগিয়েছে যে বা যারা ‘বাংলাদেশি’ ভাষায় কথা বলতে বা বোঝার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। কারণ, তারা নাকি বুঝতে পারছে না ওই রাজ্যে আটক কিছু মানুষ ভারতীয় নাকি বাংলাদেশি। যদিও বাঙালি মাত্রেই জানে বাংলাদেশি ভাষা বলে কিছু হয় না, সব রকম বৈচিত্র্য নিয়ে বাংলাদেশে, পশ্চিমবঙ্গে, ত্রিপুরায়, আসামে এবং বিশ্বের যেখানে যেখানে বাঙালি নিজের যে ভাষায় কথা বলে তা বাংলাই তবু কিছু মানুষ ভিন্নতা খোঁজার চেষ্টা করছে এপার আর ওপার বাংলার কথ্য ভাষার মধ্যে। এদিকে ভারতে বহু বাঙালিকে অহেতুক হেনস্থা করা হচ্ছে বাংলাদেশি বলে। দেশভাগের বলি বৃহৎ জাতি বাঙালিকে বাংলাদেশি বলা হচ্ছে! এরা হয় ইতিহাস বিমুখ আর না হলে বাঙালিকে দেশহীন, নাগরিকত্বহীন হবার ভয় দেখানো চেষ্টায় আছে। তারা জানে কি না জানা নেই, খোদ কলকাতাতেই এখনও মানুষ একরকম বাংলা ভাষায় কথা বলে যার উৎপত্তি পূর্ববঙ্গে। (কলকাতার বাঙাল)
বাঙালি দেশভাগের শিকার হয়েছে, দেশহীন হয়েছে, ধর্মের হানাহানিতে তাদের জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এ-জাতি কিছুতেই যেন ঐক্যবদ্ধ না থাকতে পারে সে-কারণে ধর্মীয় বিদ্বেষ ভরে দেবার কাজ আগেও চলেছে, আজও চলছে। কিন্তু সব কিছুর পরেও বাঙালি তার বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে থেকেছে।
টালিগঞ্জ ট্রামডিপোর বাঁদিক থেকে গড়িয়ার পথে একে একে অশোকনগর, আজাদগর, রাণিকুঠি, নেতাজিনগর, বাঘাযতীন, বিজয়গড়, সূর্যনগর, কাটজুনগর, সেলিমপুর হয়ে যাদবপুরের পথে পথে এখনও যে ভাষা শুনতে পাওয়া যায় তা পূর্ববঙ্গের ভাষা। এক সময়কার এই উদ্বাস্তু কলোনিগুলো দেশভাগ পরবর্তী ছিন্নভিন্ন বাঙালির আশ্রয়স্থল। অশোকনগরের সুভাষ সরকার বললেন, “আমরা যখন এসেছি তখন এসব জায়গায় কিচ্ছু ছিল না। কলকাতা কর্পোরেশনের আন্ডারেই ছিল না কোনও জায়গা। আমরাই নিজেরা ইস্কুল তৈরি করি, বাজার তৈরি করি, ছোটো ছোটো বেড়ার বাড়ি গড়ে ওঠে। বাঙুর হাসপাতাল তখন চব্বিশ পরগনা জেলার প্রধান হাসপাতাল। এখানে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর একটা নাগরিক সমাজ গড়ে ওঠে। প্রত্যেকের ভাষা তখন বাঙাল ভাষা। সেটাও বাংলা ভাষাই। ছেলেকে পোলা, ওদের অগো, আমাদের আমাগো, তাদের তাগো বলে আমাদের মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, পাড়ার লোক সকলেই কথা বলতো। অথচ শুধু আমাদের নয়, মা-বাবাদেরও জন্ম কিন্তু কলকাতায়। আসলে ওই ভাষায় কথা বলে হারানো শিকড় আর একটুকরো পূর্ববঙ্গ আমাদের মধ্যে আমরা বোধহয় ধরে রাখতাম।” (কলকাতার বাঙাল)
রাণিকুঠি থেকে আরেকটু এগিয়ে থাকেন মল্লিকা দে। শ্বশুরবাড়ির জমিতে এখন ফ্ল্যাট হয়েছে। এখানে জমির দুটো ভাগ আছে- কলোনি ল্যান্ড আর পারচেস ল্যান্ড। মল্লিকা দে-র ফ্ল্যাট পারচেস ল্যান্ড-এ। তিনি সরকারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি থেকে দুবছর হল অবসর নিয়েছেন। জানালেন, “আবার পূর্ববঙ্গের মানুষদের মধ্যেও এখানে ভাগ ছিল। চাপা কম্পিটিশন ছিল। একাত্তরের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরি হল সেটা যেমন বাস্তব, তার আগে তুমি দেখবে, পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিমবঙ্গ সবটা মিলিয়ে বাংলাদেশ বলা হত। দেশভাগের আগে, প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান আর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরি হবার আগে যে ভূখণ্ড তা কিন্তু বাংলাদেশ নামেই পরিচিত ছিল। সত্যজিৎ রায়ের বহু প্রবন্ধে তুমি ‘বাংলাদেশ’ শব্দটা পাবে। সেখানে উনি কিন্তু রাষ্ট্রের কথা বলছেন না। পুরোটা মিলিয়ে একটা সংযুক্ত ভূখণ্ড এবং বাঙালির ঐক্যবদ্ধ পরিচয়ের কথা বলছেন। যাই হোক, এই কলকাতায় বসে, আমাদের ছোটোবেলায়, কে ঢাকার আর কে বরিশালের সেসব আত্মপরিচয় খোঁজার চেষ্টা চলত। ঘরে ঘরে এমনকি ইস্কুলে মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা পর্যন্ত তথাকথিত বাঙাল ভাষায় কথা বলতেন।” (কলকাতার বাঙাল)
একই কথা বললেন পশ্চিম পুটিয়ারির প্রলয় দেবনাথ। করুণাময়ী ব্রিজ তৈরি হল অষ্টাশি সাল নাগাদ। করুণাময়ী, ধারাপাড়া, হরিদেবপুর; ওদিকে পূর্ব পুটিয়ারি, পশ্চিম পুটিয়ারি ছিল একটা গোটা কলোনি বেল্ট। প্রলয়বাবুর কথায়, “আমাদের এখানে কাউন্সিলর, এমএলএ, ছোটোখাটো নেতা সকলেই বাঙাল ভাষায় কথা বলতো শুধু নয় এখনও কান পাতলে শুনবে পুরোনো, চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হলে ওই ভাষাতেই সকলে কথা বলে। আমাদের বাড়িতে একটু ব্যতিক্রম ছিল যে আমার ঠাকুরদা-ঠাকুমা জাতীয় কেউ ছিল না। আর মা-বাবাকে কখনও ওই ভাষায় কথা বলতে শুনিনি, তাই আমিও বলতাম না। কিন্তু আমাদের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, কিংবা ধরো পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখতে যাচ্ছি, মনে হত না যে ওই বাঙালই কলকাতার আসল ভাষা নয়। সবাই তো সে ভাষাতেই কথা বলছে। অবাক লাগত যে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের প্রজন্মের কোনও সংযোগই নেই কিন্তু ভাষাটা আমরা বহন করছি কত সুন্দর। যেমন ধরো, ভারতের অন্যান্য রাজ্যের লোক যে কলকাতায় বাস করে যেমন বহু সংখ্যক বিহারী, কেউ বাড়িতে ভোজপুরী ভাষা বলে, কেউ মৈথিলী, কেউ খোট্টা কিন্তু তাদের তো গ্রামে যেটাকে ওরা ‘দেশ’ বলে সেখানে এখনও যাতায়াত আছে, কিন্তু আমাদের তো কখনওই তা ছিল না। দেশভাগ হয়ে, হিন্দু-মুসলমান হয়ে বাঙালি পরিচয়টাই টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভাষাটাকে কেউ ছাড়েনি। তবে হ্যাঁ খুব ধরেও রাখতে পেরেছি তা নয়। এখনকার প্রজন্ম কি ওই ভাষা বোঝে?” (কলকাতার বাঙাল)
তবে সেই ভাষা যে সব সময় আনন্দের, ঐতিহ্যের ছিল, তা নয়। বাঁশদ্রোণী গভর্নমেন্ট কলোনির নীতা চন্দ ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেন, “আমাদের ছোটোবেলায় এরকমও একটা সময় ছিল যখন আমরা যে বাঙাল ভাষায় কথা বলি সেটা লোকাতাম। খোলসা করতে চাইতাম না। লজ্জা পেতাম। কথায় কথায় বলতাম আমাদের কিন্তু কলকাতায় জন্ম! বন্ধুদের সঙ্গে মন কষাকষি হলে ওরা বলতো আমরা নাকি তার কেটে এসেছি এদেশে। আজ যেমন বাঙালিকে বাংলাদেশি বলাটা ধীরে ধীরে একটা স্ল্যাঙে পরিণত হচ্ছে, আমাদের ছোটোবেলায় কাউকে বাঙাল বলাটাও তাই ছিল। সেটা খুব সুখের সময় ছিল, এমন নয়। ইস্টবেঙ্গলের খেলায় এর মধ্যে বড়ো পোস্টার লেখা হয়েছিল না যে রক্ত দিয়ে কেনা মাটি কাগজ দিয়ে নয়, আমাদের কিংবা আমাদের বাপ-মা-ঠাকুরদাদেরও অস্তিত্ব কিন্তু ওইরকমই। মারাত্মক সংগ্রামের।” এর সঙ্গেই আরেকটা ঐতিহাসিক তথ্য জুড়লেন হরিদেবপুরের অর্ণব দত্ত। বললেন, “আমার বাবা-জ্যাঠামশাইরা কিন্তু পূর্ববঙ্গ থেকে আসেননি। এসেছিলেন আসাম থেকে। ওদের আগের প্রজন্ম মানে ঠাকুরদারা পূর্ববঙ্গ থেকে এসে আসামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। সেখানে ‘বাঙ্গাল খাদাও আন্দোলন’ শুরু হলে ঘটিবাটি চাটি হয়ে সব খুইয়ে কলকাতায় আসতে বাধ্য হয়েছিলেন আমার বাবা-জ্যাঠামশাইরা। আজকে যখন ভারতের বাঙালিকে অবলীলায় বাংলাদেশি বলে দেওয়া হয় তখন সত্যি বুকে লাগে। আমার বাবা আর নেই কিন্তু বাস্তুচ্যুত হবার যে যন্ত্রণা উনি সারা জীবন বয়ে বেরিয়েছিলেন সেটা মনে করলে কষ্ট হয়। সব জায়গা থেকেই তাড়া খেতে হয়েছিল ওঁদের।”
রাজনীতিকরা নিজেদের সুবিধে আর ভোটবাক্সের জন্য বারংবার ধর্মের, জাতের, ভাষার লড়াই লাগিয়ে দিতে চায়। যেখানে লাভ হয় না, জেতা কষ্টকর হয় সেখানকার মানুষদের পরিচয়েই প্রশ্নচিহ্ন ফেলে দেওয়া হয় সন্তর্পনে। বাঙালির সঙ্গে ইংরেজ আমল থেকেই এমন হয়েছে। বাঙালি দেশভাগের শিকার হয়েছে, দেশহীন হয়েছে, ধর্মের হানাহানিতে তাদের জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এ-জাতি কিছুতেই যেন ঐক্যবদ্ধ না থাকতে পারে সে-কারণে ধর্মীয় বিদ্বেষ ভরে দেবার কাজ আগেও চলেছে, আজও চলছে। কিন্তু সব কিছুর পরেও বাঙালি তার বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে থেকেছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত, শ্রমিক শ্রেণির খেটে-খাওয়া বাঙালি, তার ভাষা ধরে রেখেছে। সেই অস্তিত্বকে বিদেশি নাম দিয়ে তার নাগরিকত্ব, তার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া একটি অত্যন্ত ঘৃণ্য রাজনীতি। অতুলপ্রসাদ সেন তাঁর ‘মোদের গরব মোদের আশা/আ মরি বাংলা ভাষা’ গানে সেই মধ্য যুগে চৈতন্য-নিত্যানন্দ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত কীভাবে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে সেই ইতিহাস বলেছেন। কিন্তু আজ বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে সেই ঐতিহ্যকে অপমান করার কাজ চলছে। আরবি, পারসি, সংস্কৃত এবং আরও অনেক ভাষা বাংলার শব্দভাণ্ডারকে ঋদ্ধ করেছে। সেগুলির মধ্যে চাল-ডাল বাছার মতো ভেদাভেদ সৃষ্টি করলে আদপে সমগ্র ভাষাটির বিরাটত্বকে অপমান করা হয়।
টালিগঞ্জ ট্রামডিপোর বাঁদিক থেকে গড়িয়ার পথে একে একে অশোকনগর, আজাদগর, রাণিকুঠি, নেতাজিনগর, বাঘাযতীন, বিজয়গড়, সূর্যনগর, কাটজুনগর, সেলিমপুর হয়ে যাদবপুরের পথে পথে এখনও যে ভাষা শুনতে পাওয়া যায় তা পূর্ববঙ্গের ভাষা। এক সময়কার এই উদ্বাস্তু কলোনিগুলো দেশভাগ পরবর্তী ছিন্নভিন্ন বাঙালির আশ্রয়স্থল।
লেখার শুরুতে দুটি লাইনের কথোপকথন আমার মায়ের ছোটোবেলার কোনও এক শিবরাত্রির গল্প। মাকে যাদের বাড়ি যেতে হবে তারা পাশের সরকারেরা। ওদের বাড়ির পিঠোপিঠি পাঁচটি বোন- বাসনা, করুণা, কামনা, চায়না আর ইন্ডিয়া- মায়ের বন্ধু। ওদের বাড়িতেই শিবরাত্রির ব্রত। কিন্তু বড়দা বকবে বলে মায়ের রাত জাগা হবে না। এই সংলাপ পূর্ববঙ্গে ঘটছে না। এই কথোপকথন চলছে কলকাতার চেতলায়। এক বাথরুম দশ ঘর ভাড়াটের এই জানালা দিয়ে ওই জানালা। মায়া অর্থাৎ আমার মা সারা জীবন উপরোক্ত কথোপকথনের ভাষাতে বাক্যালাপ করেছেন। তথাকথিত বাঙাল ভাষায় আমরা কখনও কথা না বললেও তলে তলে ওই ভাষায় অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি গোটা জীবন। মা যখনই কোনও পুরোনো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হয়, ফোনালাপ চলে একটা সিক্রেট কোডের মতো বাঙাল ভাষায় কথা বলে ওঠে আজও। আমার ভাষা, আমাদের ভাষা ‘মান্য’ কলকাতার মানছি, কিন্তু আমার মায়ের ভাষাটাও বাংলাই। এই ভাষার ‘গরব’ আমাদের থেকে কেউ কখনও কেড়ে নিতে পারবে না।

