পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব নিয়ে কেন এত গোপনীয়তা অবলম্বন করতে হবে?

মার এক বন্ধুর গল্প বলি। যৌথ পরিবারে বড়ো হওয়া তার, বেশ টানাটানির সংসারে। প্রথমবার পিরিয়ড হওয়ার পর এই হঠাৎ শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে প্রাথমিক একটা ভয়, আশঙ্কা অনেক মেয়ের মধ্যেই থাকে। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এইসব গোড়ার ভয়ভাবনা সবচেয়ে বেশি অধিকার করে ছিল একটা ভয়ানক পদ্ধতি। সেই প্রথম সে জানতে পারল, তাকে ব্যবহার করতে হবে পুরোনো সুতির কাপড় কেটে ধুয়ে ভাঁজ করে রাখা একটা মোটা পরত, আর প্রতি রাতে সেগুলো কেচে ধুয়ে অন্ধকার থাকতে থাকতেই মেলে দিতে হবে পিছনের বারান্দায়। সকালে সবাই ঘুম থেকে ওঠার আগেই তুলে আনতে হবে কাপড় মেলার দড়ি থেকে, বাড়ির ছেলেদের চোখে যেন সেসব না পড়ে যায়। এগারো বছরের ছোট্ট মেয়ে একদিন সেই প্রাণান্তকর সাবানকাচার পর্ব শেষে, হাতের চামড়া প্রায় ছিঁড়ে ফেলে, যখন শুতে যায়, রাত তখন গভীর। অবিরাম রক্তস্রাবের ক্লান্তি, কিংবা গতরাতের সেই সুবিশেষ ধোয়াপাখলা পর্বের শ্রান্তি— যাই হোক না কেন, পরদিন সকালে বিছানা ছাড়তে অনেকটাই দেরি হয়েছিল তার। উঠেই শোনে, ধুন্ধুমার কাণ্ড বাড়িতে। কেন কাপড়গুলো যথাসময়ে সরিয়ে নেওয়া হয়নি, এই নিয়ে গঞ্জনা, কুকথা, দুর্ব্যবহার। এখন তার বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ। প্রথম এমন একটা শরীরী পরিবর্তনের কিশোরী সংকোচের সঙ্গে তার যে ট্রমা জুড়ে গিয়েছিল সেইদিন, আজও সে ভোলেনি।

আর পাঁচটা কাটাছেঁড়া, রক্ত, ঘাম, সর্দি, কফ, থুতুর মতো এই রজোরক্তও স্বাভাবিক হওয়ারই কথা ছিল। এতদ্‌সত্ত্বেও, শুধুমাত্র নারীদেহের যৌন পূর্ণতাপ্রাপ্তির সঙ্গে বিষয়টি এক করে দেখার মধ্যেই সম্ভবত লুকিয়ে আছে এত বিপুল সংকোচের ভার। মেয়েরা শুধুই যৌনাঙ্গ দিয়ে গড়া একটা জন্মযন্ত্র মাত্র, এই কদর্য ভাবনার খোলসেই আসলে ঢুকে থাকে মেয়েদের পিরিয়ড সংক্রান্ত যাবতীয় চুপচুপ ফিসফাস।

মেয়েদের শরীর নিয়ে, শরীরী পরিবর্তন নিয়ে অযথা ট্যাবু জমিয়ে জমিয়ে গোপন অন্ধকারের পাহাড়ে মুখ লুকিয়ে থাকার কথা যিনি যতবার বলেন, আমার ওই কথাগুলো মনে পড়ে। আর পাঁচটা কাটাছেঁড়া, রক্ত, ঘাম, সর্দি, কফ, থুতুর মতো এই রজোরক্তও স্বাভাবিক হওয়ারই কথা ছিল। এতদ্‌সত্ত্বেও, শুধুমাত্র নারীদেহের যৌন পূর্ণতাপ্রাপ্তির সঙ্গে বিষয়টি এক করে দেখার মধ্যেই সম্ভবত লুকিয়ে আছে এত বিপুল সংকোচের ভার। মেয়েরা শুধুই যৌনাঙ্গ দিয়ে গড়া একটা জন্মযন্ত্র মাত্র, এই কদর্য ভাবনার খোলসেই আসলে ঢুকে থাকে মেয়েদের পিরিয়ড সংক্রান্ত যাবতীয় চুপচুপ ফিসফাস। রাজধানী শহরের বুকে বসে, আলোকপ্রাপ্ত এবং অর্থসম্পদে শক্তিশালী যে-কোনো পরিবারের যে-কোনো সদস্য তাঁর মনের ভেতরের এই অন্ধকার পুষে রাখতেই পারেন, সমস্যা সেখানে নয়। সমস্যা হয় তখন, যদি পারিবারিক লিগ্যাসি এবং বেশ কিছু ব্যক্তিগত ‘স্কিল’-এর জোরে যদি তাঁর বা তাঁদের একটা ‘সেলেব্রিটি স্টেটাস’ থেকে থাকে। তাহলে এই ব্যক্তিগত বচনগুলো আর ব্যক্তিগত পিছিয়ে থাকার গল্প হয়ে থাকে না। তাকে আর ব্যক্তিগত স্খলন, ব্যক্তিগত ত্রুটি, ব্যক্তিগত সমস্যা, ব্যক্তিগত ভুল বলে সরিয়ে রাখা যায় না। যে মুখের ওপরে আলো এসে পড়ে, তার কিছু সামাজিক দায় থাকেই। না চাইলেও সে দায় বহন করতে হয়। খ্যাতি তো শুধু পরিচিতি দেয় না, সেই সঙ্গে যোগ করে জনমধ্যে উদাহরণ হয়ে ওঠার, প্রতিনিধি হয়ে ওঠার বিরল দায়িত্ব। নিজস্ব মত নিশ্চয় থাকতে পারে তাঁদের, মতামত দেওয়ার অধিকারও নিশ্চয় তাঁদের আছে, কিন্তু সেটা মতই, রায় দেওয়ার অধিকার কিন্তু নেই। কারণ এই সব কথা মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ মাইল পাড়ি দিচ্ছে গণমাধ্যমের জোয়ারস্রোতে। যেখানে যাদের মধ্যে যত শত পুরুষতান্ত্রিক অবদমনের বিষদাঁত মুখের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ছিল, সব ছোবল তৈয়ার হয়ে বেরিয়ে পড়ছে এই সুযোগে— দেখেছ, কী ভুল বলেছেন উনি? শুধু আমরা বললেই দোষ?

এমনকি, এই মুহূর্তের আলোচনায় এমন কথাও উঠে এসেছে যে, শৈশবে যৌন অবোধ্যতার কালে, ‘গুড টাচ’, ‘ব্যাড টাচ’ শেখানোর কোনো প্রয়োজনই নেই। কারণ মান্ধাতার আমলে তো এসব যৌনশিক্ষার কোনো প্রচলন ছিল না, সে যুগে যেমনভাবে শিশুদের জ্ঞানচক্ষু খুলেছে, আজও সেভাবেই হোক। প্রশ্ন হল, ঠিক কীভাবে যে অধিকাংশ শিশুর, বিশেষত যোনি নিয়ে জন্মানো শিশুদের অবাঞ্ছিত স্পর্শের বিষয়ে অভিজ্ঞতা জন্মায়, তার বিন্দুমাত্র ধারণা কি তাঁদের আছে, যাঁরা এ কথা উচ্চারণ করার স্পর্ধা রাখেন? স্কুলবাসের ভেতরে, স্কুলের শৌচাগারে যাওয়ার সময়, পাড়ার পুজোর প্যান্ডেলে হাত-বাড়িয়ে কোলে নিতে চাওয়া কাকুর আদরে, পাশের বাড়ির দাদুর লজেন্স দেওয়ার অছিলায় কতভাবে, কত কদর্য স্পর্শের সামনে বর্মহীন বোধহীন দাঁড়াতে হয়েছে কতজনকে কতবার, সে খবর কি মিথ্যে? এই হিংস্র পৃথিবীর দরজা খুদে মানুষগুলোর সামনে খুলে দেওয়ার আগে আমরা কি এটুকু সন্দেহের বীজ তাদের মনে ঔষধপরশের মতো গেঁথে দিতে পারি না যে, সব ‘আদর’ বিশ্বাসযোগ্য নয়, সব ‘স্নেহ’ কলুষমুক্ত নয়? কবে তারা শৈশব-ট্রমা নিয়ে বেড়ে উঠে মনস্তাত্ত্বিক শুশ্রূষার সাহায্য চাওয়ার মতো, কিংবা ‘কল আউট’ করার মতো শক্তিশালী হবে, কিংবা হবে না, সেই দোলাচলে কি আমরা ঠেলে দেব আমাদের অসহায় ছোট্ট অবোধ মানুষগুলোকে?

যে মুখের ওপরে আলো এসে পড়ে, তার কিছু সামাজিক দায় থাকেই। না চাইলেও সে দায় বহন করতে হয়। খ্যাতি তো শুধু পরিচিতি দেয় না, সেই সঙ্গে যোগ করে জনমধ্যে উদাহরণ হয়ে ওঠার, প্রতিনিধি হয়ে ওঠার বিরল দায়িত্ব। নিজস্ব মত নিশ্চয় থাকতে পারে তাঁদের, মতামত দেওয়ার অধিকারও নিশ্চয় তাঁদের আছে, কিন্তু সেটা মতই, রায় দেওয়ার অধিকার কিন্তু নেই।

বেশ কয়েক বছর আগে, একেবারে সরকারি স্রে স্কুলে যৌনশিক্ষার পাঠ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছিল। ‘জীবনশৈলী’ নাম দিয়ে সেই পাঠ্যক্রম চালু করার সুপ্রচেষ্টা শুরুও হয়েছিল। তখনও দেখেছিলাম, একদল বয়োজ্যেষ্ঠ উটপাখির গেল-গেল রব। বালির আড়ালে মাথা গুঁজে নিশ্চিন্ত মনে বসে থাকার যে শৌখিনতা তাঁদের শীতল ড্রয়িংরুমে ওয়াল-হ্যাংগিং-এর মতো ঝুলে থাকে নিশ্চুপ হয়ে, তাঁদের অর্জিত নীরবতাও তেমনই স্বভাবগম্ভীর, টলানো যাচ্ছিল না কিছুতেই। শিশুদের যৌনশিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা তো দূর অস্ত, তাঁদের ঘৃণামিশ্রিত নাসিকাকুঞ্চনের প্রতিটি রেখা বলে দিচ্ছিল, এ নিয়ে একটি শব্দ খরচ করাও তাঁদের প্রস্তরীভূত ‘ডিগনিটি’র পক্ষে ক্ষতিকর। জয় অবশ্য তাঁদেরই হয়েছে, কারণ আমাদের জনগণকেন্দ্রিক জনগণপন্থী সমাজব্যবস্থার হাত-পা তাঁরা আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিলেন উচ্চকণ্ঠ বিরোধিতায়। যতবার এই বিশেষ শিক্ষাপ্রণালী প্রচলনের কথা ভাবা হয়েছে, ততবার অসংখ্য প্রতিযুক্তির বিরুদ্ধতা ভরা লেফাফা উঁচু হয়ে উঠেছে টেবিলে টেবিলে। ভাবতে লজ্জা হয়, তার মধ্যে অধিকাংশই শিক্ষক, কিংবা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিত্ব, ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে যৌনশিক্ষার কথা বলতে তাঁদের নাকি ভীষণ ‘অসুবিধা’ হয়!

আমরা যখন স্কুলশিক্ষার গণ্ডি পেরোচ্ছিলাম, তখনও পর্যন্ত এই ধরনের আধুনিক পাঠক্রমের কথা উঠে আসেনি। কিন্তু আমার মনে আছে, আমার সেই রামকৃষ্ণ মিশনের প্রবল সংস্কারসম্পন্ন মেয়ে-ইশকুলেও এমন কয়েকজন শিক্ষিকা অন্তত ছিলেন, যাঁরা ক্লাসরুমের পরিসরের মধ্যেই, নানা প্রসঙ্গের সূত্রে আমাদের এই জীবনশৈলীর পাঠ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন অবশ্যই ইংরেজির প্রথিতযশা শিক্ষিকা, রেবা ভট্টাচার্য। শরীরশিক্ষার পাঠ নয়, তাঁর আলোচনায় মিশে থাকত জীবনশিক্ষার পাঠও। নিজের সব কাজ নিজে করতে হবে, নিজের জন্য লড়তেও হবে নিজেরই জোরে— এই ভাবনা থেকেই উৎসারিত ছিল তাঁর কথাগুলো। পরে বড়ো হয়ে যখন তাঁর বাড়িতে গিয়েছি, সেখানেও দেখেছি, রেবাদি এবং তাঁর জীবনসঙ্গী সৌরীন ভট্টাচার্য, তিনিও আর-এক বিখ্যাত এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, এই দুজন মিলে চিরকাল নিজেদের সমস্ত কাজ, নিজেরাই করে এলেন চিরদিন, কোনো গার্হস্থ্য সহায়তা ছাড়াই! কী অসম্ভব আন্তরিকতার আর সততার সঙ্গে যে তিনি ওই কচি বয়সের মেয়েদের রক্ষাকবচ গড়ে নেওয়ার শিক্ষা দিয়ে যেতেন, সে কথা মনে পড়লে ভাবি, এই অসামান্য আলো-ফেলে যাওয়া কথাগুলো সর্বসমক্ষে দাঁড়িয়ে বলতে যাঁদের ‘লজ্জা’ করে, তাঁরা কি আদৌ শিক্ষক?

অপুষ্টি, অস্বাস্থ্য, অপরিচ্ছন্নতার ভয়ানক প্রভাবে ভুগে জীর্ণ হয়ে যাওয়া মেয়েদের চিকিৎসা করতে বসে গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তাররা বারবার টেবিলের ওপারে রোগিণীর সঙ্গে ডেকে নিতে চাইছেন তাঁর পুরুষ সঙ্গীটিকেও, যাতে ‘ট্যাবু’ এড়িয়ে সুস্থতাই হয়ে উঠতে পারে প্রধান লক্ষ্য।

ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে আজও অসংখ্য সমাজকর্মী মুখে রক্ত তুলে সকাল-সন্ধে প্রচার করছেন মেয়েদের রজোকালীন পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করছেন স্যানিটারি হাইজিন বজায় রাখার পদ্ধতি বিষয়ে। অপুষ্টি, অস্বাস্থ্য, অপরিচ্ছন্নতার ভয়ানক প্রভাবে ভুগে জীর্ণ হয়ে যাওয়া মেয়েদের চিকিৎসা করতে বসে গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তাররা বারবার টেবিলের ওপারে রোগিণীর সঙ্গে ডেকে নিতে চাইছেন তাঁর পুরুষ সঙ্গীটিকেও, যাতে ‘ট্যাবু’ এড়িয়ে সুস্থতাই হয়ে উঠতে পারে প্রধান লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে যদি এমন পুরুষনির্দিষ্ট লুকোছাপার কথা বারবার ঝুড়িচাপা কেউটের মতো বেরিয়ে আসে, তাহলে তো সামাজিক সম্মান ও শুচিতা রক্ষার দায়ে পুরুষ ডাক্তার, পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মী, পুরুষ নার্স, ওষুধের দোকানের পুরুষ ন্যাপকিন বিক্রেতা— প্রত্যেকের কাছেই গোপনীয়তা বজায় রাখা দস্তুর! এ কোন্‌ অন্ধকার আদালতের মুখোমুখি লড়াই শুরু হল? দীর্ঘদিনের সামাজিক লড়াইগুলোকে আর কতবার এই এক-একটা মতামতের ধাক্কায় একশো বছর করে পিছিয়ে দেওয়া হবে? এই অনন্ত সিসিফাসের পাথর টেনে ওপরে তোলার দায় থেকে মেয়েদের কি মুক্তি নেই?

_____________
মতামত লেখকের নিজস্ব

Written by