কিশোরী আমনকর : নীরবতাও যেখানে গান হয়ে ওঠে

শ্বর ঠিক কোথায় আছেন কে জানে? কিন্তু জানি—এক রাগ বিভাস ভেতরকার সমস্ত সংশয়কে ঘুম পাড়িয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় কিশোরী আমনকর (Kishori Amonkar)-র সামনে। ওঁর গাওয়া বিভাস নিশ্চিত করেই ডুবিয়ে দেয় ধ্যানমগ্ন অবগাহনে। সে যেন শুধু এক সংগীত নয়, এক গঙ্গোত্রী, যার জলে স্নান করা মানে আত্মার সমস্ত ক্লেদ ধুয়ে ফেলা।

আমরা অনুভব করি— সুর কেবল শোনার বস্তু না, সুর একটা নদী। আর সেই নদীর নাম কিশোরী।
ওঁর ‘সা’ যেন হৃদয়ের শীতল দহন, এক নির্মল হাওয়া, যা হৃদয়ের মধ্যিখানে স্থির অথচ অগ্নিগর্ভ এক আলো জ্বেলে রাখে। ‘নি’ যেন ক্লান্তির স্ফূর্তি, দীর্ঘ এক যাত্রার পর মিলিত উত্তেজনা, গান্ধার যেন বিশ্রাম, কোনো অলৌকিক ছায়া। ওঁর গাওয়া কোনো রাগ নয়, কোনো খেয়াল নয়, যেন আদি ধ্বনি, প্রণবের প্রথম নিঃশ্বাস।

ওঁর গানে কোনও সময় নেই, কোনও সংকোচ নেই। যেন রাগের বাঁধনটাই ভেঙে ফেলে নিজেই একটা নতুন রাগ বানিয়ে ফেলেন। গানের ভেতরে তিনি কাঁদেন, হাসেন, আর শাস্ত্রের গলায় স্লেট ভেঙে দেন। ওঁর মধ্যে আছে সরস্বতীর বিদ্যা, কালীর তাণ্ডব, আর এক অনির্বচনীয় বিষাদ, যা কেবল কিশোরীই ধারণ করতে পারেন।

কীভাবে যেন ওঁর গানের কোন অলিন্দে ঢুকে পড়ে মানুষ। ওঁর গাওয়া মীড়-এর মধ্যে কী যেন একটা আহ্বান ছিল, যেন অদৃশ্য কেউ বলছেন— “এসো, ভয় পেয়ো না, এসো, এখানে নীরবতা গান হয়ে ওঠে।” আমরা সেই ডাকে সাড়া না দিয়ে পারিনি, কেউই পারবে না।

বোল বানাও, বোল বাট, লয়কারি আর পুকার, ঠেহরাই তখনও বুঝে উঠিনি। কিশোরী আমনকর এলেন, বললেন— না, এ তো প্রেম। এ তো আত্মহত্যার কাছাকাছি এক পাগলামি, যেখানে জীবন দিয়ে সুর বানাতে হয়। আমাদের মতো অসংখ্য ছাত্রের ভগবান কিশোরী, যার ধর্ম বিভাস।

ওঁর গানে কোনও সময় নেই, কোনও সংকোচ নেই। যেন রাগের বাঁধনটাই ভেঙে ফেলে নিজেই একটা নতুন রাগ বানিয়ে ফেলেন। গানের ভেতরে তিনি কাঁদেন, হাসেন, আর শাস্ত্রের গলায় স্লেট ভেঙে দেন। ওঁর মধ্যে আছে সরস্বতীর বিদ্যা, কালীর তাণ্ডব, আর এক অনির্বচনীয় বিষাদ, যা কেবল কিশোরীই ধারণ করতে পারেন। কিশোরী যেন এক তপস্বিনী, যিনি প্রতি স্বরে জপ করেন নিরাকার সৌন্দর্যকে।

ওঁ ওঁর চিরন্তন সাহেলার সঙ্গে আজ হয়তো নিভৃতে, হয়তো অন্ততলোকে সপ্তসুরের ভেদ উন্মোচনে ব্যস্ত। কিন্তু ওই যে জয়জয়ন্তীর পা-রে-র মীড়, আনন্দীর ওই সমবাদ অঙ্গের তান বা কেদারের সেই আশ্চর্য ভাবে সা থেকে অকস্মাৎ কড়ি মধ্যম হয়ে হালকা কোমল নি, মূর্ছা যাওয়া আবহ নিয়ে মধ্যমে ন্যাস করে। প্রাণে যেমন প্রাণ সঞ্চার করেছেন, কেড়েছেনও তেমন করে। একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে রেখে চলে যাওয়া যাকে বলে।

‘আমনকর’ মানে ‘যে আম (আম্র) গাছের মালিক’। কিন্তু কিশোরীর গলায় যে আম্রপালি ফুটত, তা শুনলে মনে হত নামটাই যেন মন্ত্র। কথিত আছে, উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খান একবার বলেছিলেন, এ মেয়েটার নাম ‘আমনকর’ নয়, ‘আম্রস্বর’ হওয়া উচিত ছিল!

শাস্ত্রীয় সংগীত যে অদৃশ্য শক্তির সমাবেশ ঘটাতে পারে, এ কথা তো প্রত্যক্ষ সত্য।  শুনেছি, ১৯৯২ সালে তাঁর রাগ ভৈরব রেকর্ডিংয়ের সময় স্টুডিওর মাইক্রোফোন বারবার খারাপ হচ্ছিল। ইঞ্জিনিয়াররা পরে বলেছিলেন, সেদিন স্টুডিওতে অদ্ভুত ঠান্ডা হাওয়া বইছিল। সংগীত যেন আত্মার একরকম ম্যাগনেটিজম ছড়িয়ে দিচ্ছিল বাতাসে।

বেজায় মেজাজি ছিলেন, যেমন গাইবার মেজাজ তেমন মনের মেজাজ। একবার ওঁর গুরু প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি তোমার মায়ের কাছে (মগুবাই কুরদিকর) শিখছ না কেন?” উত্তর দিয়েছিলেন, “মায়ের কাছে শিখলে তো তোমাকেই শেখাতে পারি”। যদিও এ কথা শোনা কথা, এই কথাগুলোর দলিলাদি থাকলে, ইতিহাসের কিছু অমূল্য কথোপকথন হয়ে থেকে যেত হয়তো। বলা বাহুল্য, মগুবাই কুরদিকার কিশোরী প্রথম গুরু এবং শতাব্দীর সেরার সেরা একজন শিল্পী। আমরা কেবল শুনে যাই—ওই বিভাস, ওই তোড়ি, ওই গাঢ় খেয়াল—যেখানে আর কেউ থাকে না, কেবল অভিভূত শ্বাস থাকে।

কিশোরী আমনকর ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের এক রহস্যজনিকা। তাঁর গানে মরুভূমির খাঁ-খাঁ রোদ আর বঙ্গোপসাগরের ভেজা হাওয়ার মিশেল ছিল। তাঁর গলায় ছিল দ্রাবিড় করুণার সঙ্গে আর্য সৌন্দর্যের মিলন। আজও তাঁর ‘মিঠা বোল’ শুনলে মনে হয়, কে যেন বলছে— “গান শুধু সুর নয়, গান হল অদৃশ্যের ডাক…”।

Written by