
পুরাপ্রস্তর যুগে মানুষ শিকার করার পাশাপাশি তা টুকরো করে খাওয়ার কায়দাটুকু শিখে গিয়েছিল। সেজন্যই পাথর দিয়ে থেঁতলে বা কেটে খাওয়ার প্রয়োজন পড়ত। পরে নব্যপ্রস্থর যুগে কৃষিকাজের প্রচলন ঘটল এবং ফল-পাতা থেঁতো করার মাধ্যম ছিল সেই পাথরই। এরপর ভারতীয় উপমহাদেশে একে একে সিন্ধু সভ্যতা, বৈদিক যুগ, এবং ধ্রুপদী সময়কাল। কখনও প্রাকৃতিক ঔষধি বানাতে, কখনও মশলা পিষতে ব্যবহার হত এই পাথরই। প্রাচীন যুগে ব্যবহৃত পাথরের ঘর্ষণের পদ্ধতি অবলম্বনেই পরে তা রূপ নেয় বর্তমানের ‘শিলনোড়া’।
রকমারি মশলার ব্যবহারই বাঙালি রান্নার অনন্য স্বাদের অন্যতম বাহক। বাঙালির মশলা পেষার প্রাথমিক যন্ত্র ছিল শিলনোড়া। কিন্তু এখন হেঁশেল থেকে শিলনোড়ার ঘর্ষণের শব্দ ক্ষীণ হয়েছে, বদলে কিচেনে ‘মিক্সার’ গ্রাইন্ডারের ঘূর্ণনের তীক্ষ্ণতা বেড়েছে। মূলত ব্যস্ত জীবনযাত্রায় সময় কুলিয়ে রান্না শেষ করার লক্ষ্যেই এই সুপারফাস্ট মেশিনের জনপ্রিয়তা।
কিন্তু এ-যুগে দাঁড়িয়েও বহু পেশাদার রাঁধুনি (শেফ) মিক্সারের বদলে শিলনোড়াকেই বেছে নিচ্ছেন। বড়ো আকারের শিলনোড়া না হলেও ছোটো হামানদিস্তা ধরনের উপকরণকে মশলা বাটার কাজে ব্যবহার করছেন। শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্যই নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞান ও স্বাদ। বাড়ির সাধারণ রান্নায় স্বাদের সামান্য ফারাক অনায়াসেই মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু যে মঞ্চে রান্নাই স্বয়ং শিল্প এবং যেখানে স্বাদের সামান্য তারতম্যও গোটা শিল্প নষ্ট করতে পারে, সেখানে কোনো আপোষের জায়গা নেই।
পেশাদার রাঁধুনিদের কথায়, শিলনোড়া মশলাকে থেঁতো করে মিহি করে যেখানে মশলার ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক তেল বেরিয়ে আসে এবং মশলার স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। এক্ষেত্রে কোনোরকম অতিরিক্ত তাপ ছাড়াই মশলা গুঁড়ো হয় এবং এর পুষ্টিগুণে কোনো হেরফের হয় না।

শেফেদের নিপুণতা অনুযায়ী ক্রাশ (Crush) এবং কাট (Cut)-এর মধ্যে ঢের ফারাক। অর্থাৎ, মশলা থেঁতো করা এবং কাটা, দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়া। পেশাদার রাঁধুনিদের কথায়, শিলনোড়া মশলাকে থেঁতো করে মিহি করে যেখানে মশলার ভেতরে থাকা প্রাকৃতিক তেল বেরিয়ে আসে এবং মশলার স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। এক্ষেত্রে কোনোরকম অতিরিক্ত তাপ ছাড়াই মশলা গুঁড়ো হয় এবং এর পুষ্টিগুণে কোনো হেরফের হয় না। অন্যদিক, মিক্সার-গ্রাইন্ডার মশলাকে থেঁতো নয়, বরং ধারালো ব্লেডের সাহায্যে কেটে টুকরো করে মিহি করে। বন্ধ জারের মধ্যে তীব্র গতিতে ব্লেডের ঘূর্ণনে অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয়, ফলে মশলার নিজস্ব প্রাকৃতিক তেল বাষ্পীভূত হয়ে স্বাদের গুণমানের পাশাপাশি পুষ্টিগুণ হ্রাস করে থাকে।
এছাড়া, মিক্সার-গ্রাইন্ডারে মশলা পিষলে অনেক সময় কিছু ক্ষুদ্রাকার গোটা টুকরো থেকে যায়, যা পাচনে ব্যাঘাত ঘটায়। কিন্তু এই সমস্যা শিলে বাটা মশলায় থাকে না। শিলনোড়ার মিহি গুঁড়ো শুধু স্বাদই অক্ষুণ্ণ রাখে না, পাচনেও সমানভাবে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি, মিক্সার যেহেতু কৃত্রিম উপাদান যেমন প্লাস্টিক বা স্টিলের তৈর, তাই এই মেশিন পুরোনো হলে এর ক্ষুদ্র অংশ খাবারের সঙ্গে মিশে জটিল রোগ টেনে আনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যদিও শিলনোড়ায় মশলা বাটলে কোনোরকম কণা খাবারে মেশার সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ হল এর টেকসই গঠন। যুগ যুগ ধরে মূলত শক্তপোক্ত ব্যাসাল্ট বা গ্রানাইট পাথর দিয়েই শিলনোড়া তৈরি হয়ে এসেছে। এই ধরনের পাথর যেমন মজবুত তেমনই বছরের পর বছর একইভাবে টিকে যায় রান্নাঘরে।
পশ্চিম ভারতের ভাদ্দার পাথর-কারিগরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পেষণ-পাথর তৈরির কাজ করতেন। পাথরের এই পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উচ্চগুণমানের পাথরকেই বেছে নেওয়া হত, যার মধ্যে কোনো ফাটল নেই। বর্তমানে শিলনোড়া তৈরি যেমন কমে এসেছে, তেমনই এর গুণমানও হ্রাস পাচ্ছে। আজকের দিনে শিলনোড়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হল কোনোরকম ফাটলযুক্ত পাথর ব্যবহার না করা। ভাঙা পাথর মানে তা টেকসই নয় এবং ব্যবহারের সময় পাথরের কণা খাবারে মিশতে পারে। এছাড়া, নতুন শিল ব্যবহারের আগে তাতে কয়েকবার শুকনো চাল বেটে নেওয়ার নিয়ম মেনে আসছেন আমাদের দিদি-ঠাকুমারা। এর কারণ একটাই, শিল তৈরির সময় তার গায়ে লেগে থাকা ধুলোবালি বা পাথরের সূক্ষ্ম কণা সরিয়ে ফেলা এবং রান্নার কাজে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা। চাল বাটার ঘর্ষণে শিলের উপরিভাগের আলগা কণাগুলিও উঠে যায়, ফলে পরবর্তী সময়ে মশলা বা অন্যান্য উপকরণ বাটার সময় সেগুলির সঙ্গে পাথরের কণা মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।
শিলনোড়ায় মশলা বাটলে কোনোরকম কণা খাবারে মেশার সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ হল এর টেকসই গঠন। যুগ যুগ ধরে মূলত শক্তপোক্ত ব্যাসাল্ট বা গ্রানাইট পাথর দিয়েই শিলনোড়া তৈরি হয়ে এসেছে। এই ধরনের পাথর যেমন মজবুত তেমনই বছরের পর বছর একইভাবে টিকে যায় রান্নাঘরে।

প্রশ্ন হল এই শিলনোড়া কি শুধুই বাংলায় ব্যবহৃত পেষণযন্ত্র? সেক্ষেত্রে বলা যায়, বিশ্বজুড়ে পাথরে তৈরি পেষণ যন্ত্রের প্রচলন রয়েছে, কিন্তু অঞ্চলভেদে নাম ও গঠনের পার্থক্য লক্ষণীয় যেমন, দক্ষিণ ভারতে এর পরিচয় আম্মি-কল্লু (Ammi Kallu), যা দেখতে মূলত শিলনোড়ার মতোই, তবে নকশায় কারুকার্য দেখা যায়। অন্যদিকে মেক্সিকোয় মেটাতে (Metate); পেরু এবং বলিভিয়ায় বাতান (Batán); স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলিতে এর নাম কোয়ার্ন (Saddle Quern)। কোনোটার গঠন বাটির মতো ছোটো, কোনোটি আবার পিঁড়ির মতো উঁচু এবং বড়ো, তবে পরিচয় একটাই– পাথরের পেষণযন্ত্র। নিউ দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ তথা সিন্ধু ও হরপ্পা সভ্যতায় ব্যবহৃত পাথরের একটি হাত-পেষণযন্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে।
আজকের দিনে শিলনোড়া ঘরে থাকলেও তা কোনো এক মোড়কে মুড়িয়ে সরিয়ে রাখা হয়। প্রায় একযুগ আগে গরমের দুপুরে দূর থেকে ভেসে আসত “শি-ল—কা—টা—ও”। একটা হাতুড়ি আর একটা ছেনি দিয়ে পেশাদারী সাবলীলতায় মাছ, ফুল, ঘরবাড়ি এঁকে দিতেন এই শিলকাটাইওয়ালারা। শুধু দেখতে সুন্দর লাগার জন্য নয়, বছরের পর বছর ব্যবহারের ফলে শিলের ধার কমে আসত, তাই তাকে পুনরায় ধারালো করতেই এই আয়োজন। এখন ধার কমেনি, জং ধরেছে, অব্যবহারের ফলে; আর মিক্সার গ্রাইন্ডারের তীব্র ঘূর্ণনের শব্দে হারিয়ে গেছে শিল-কাটাইদের ডাকও।

