মনের অসুখ জয় করে রং-রেখা-কল্পনায় জন্ম নিচ্ছেন নতুন শিল্পী

রকারি মানসিক হাসপাতালের নিঃশব্দ চার দেওয়ালের অন্দরে কাটত দীর্ঘ সময়। ক্যালেন্ডারের তারিখ কেটে চলা আর মনে মনে শুধুই এক অদৃশ্য দিন গোনা ছিল যাঁদের নিত্যদিনের রুটিন, সমাজ যাঁদের গায়ে সেঁটে দিয়েছিল ‘জিনে ধরেছে’ কিংবা ‘অকেজো’ বা ‘বাতিল’-এর মতো নির্মম তকমা, আজ তাঁরাই মুছে দিচ্ছেন সেই অন্ধকারের ইতিহাস। লোকে যাই বলুক না কেন, অন্ধকার ঘরেও আলো নিজের পথ ঠিক চিনে নেয়, তার জীবন্ত প্রমাণ সায়ন মণ্ডল। অঞ্জলি: মেন্টাল হেলথ রাইটস অর্গানাইজেশনের হাত ধরে সায়নের জীবনে প্রথম রঙের ছোঁয়া লাগে। তারপর মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ঘটে যায় ম্যাজিকের মতো উত্তরণ। সায়ন এখন সেরামিকের ওপর সূক্ষ্ম তুলির টান, বেডশিটের গায়ে ফাইন ব্রাশের সাহায্যে শেয়াল বা বাঘ আঁকা কিংবা ইয়ায়োই কুসামার মতো অজস্র বিন্দুর ডট আর্টে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সায়নের ভাবনায় আজ ক্যানভাস জুড়ে প্রাণ পায় স্বাধীন স্বতন্ত্র শিল্প। মনোরোগ আর নিঃসঙ্গতাকে তুচ্ছ করে কিংবা সেগুলিকেই অবলম্বন করে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব শিল্পকর্ম।

মনোসামাজিক কর্মী রত্নাবলী রায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত স্টুডিও ১০০এ (Studio 100A)। যা একাধারে স্টুডিও এবং কর্মশালা, মনোসামাজিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের কল্পনা আর হাতের স্পর্শ গড়ে তুলেছে এই সম্ভার। স্টুডিওতে কাজ করা প্রত্যেকেই এক-একজন এক-একরকম ভাবে বিশেষ।

সায়ন মণ্ডলের মতো এমন অনেক কর্মীই আজ শিল্পী। শিল্পযাপনের পরিসর তৈরি করে দিয়েছে মনোসামাজিক কর্মী রত্নাবলী রায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত স্টুডিও ১০০এ (Studio 100A)। যা একাধারে স্টুডিও এবং কর্মশালা, মনোসামাজিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের কল্পনা আর হাতের স্পর্শ গড়ে তুলেছে এই সম্ভার। স্টুডিওতে কাজ করা প্রত্যেকেই এক-একজন এক-একরকম ভাবে বিশেষ। অথচ রং, তুলি বা মাটির তাল হাতে নেওয়া তো দূরে থাক, এক সময় শান্ত হয়ে দুদণ্ড বসে থাকাটাও প্রায় অসম্ভব ছিল এই আবাসিকদের পক্ষে। আজ অনূর্ধ্ব ত্রিশ বছরের সায়ন চোখ বুজে বলে দিতে পারেন কী ছবি তিনি আঁকবেন বা মাটির তালটি দিয়ে ঠিক কী গড়বেন। সায়নের মতোই প্রবীণ সুরজিৎ বর্ধন কিংবা পম্পা গুহরা অত্যন্ত সাবধানে শাড়ি বা বিছানার চাদরে ব্লক প্রিন্টের কাজ করছেন নিখুঁত জ্যামিতি মেনে। যদিও নিখুঁত বড়োই আপেক্ষিক বিষয়, কারণ শিল্পীর জীবনে নিখুঁত বলে কিছু হয় না। আমাদের জীবনের মতোই এবড়োখেবড়ো রং, রেখা বা মাটির আদলের শিল্প থেকেই তৈরি হচ্ছে চমৎকার সব সামগ্রী।সেরামিকের পাশাপাশি নকশা-কাটা বাহারি পোশাক থেকে ঘর সাজানোর জিনিস তৈরি হচ্ছে স্টুডিও ১০০এ-তে। আর সকলের মুখেই হাসি, আন্তরিকতার অভাব নেই।

 

মনের অসুখকে জয় করেছেন এঁরা প্রত্যেকেই। সকলেই এখন শিল্প-শ্রমিক। শিল্পীদের কাজ নিয়ে রত্নাবলী রায় জানান, “হাসপাতালের চার দেওয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে এঁদের রেখাচিত্রে গড়ে ওঠা এই রহস্যময় অবয়বগুলো আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কাপড়ে নতুন প্রাণসঞ্চার করছে। প্রজাপতি, ফুল, মাছ, লতা-পাতা কিংবা ফড়িং ও পাখির এই নিখাদ প্রকাশ কোনো প্রথাগত ছাঁচে ধরা দেয় না। তাঁদের মুক্ত চিন্তা আর হাতের কাঁচা রেখা দিয়েই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে স্টুডিও ১০০এ-র নিজস্ব ভিজ্যুয়াল ভাষা।”

আজকের বাণিজ্যিক ব্লক প্রিন্টিংয়ের বাজারে, যেখানে নকশা প্রায়ই একঘেয়ে ছাঁচে হারিয়ে যায়, সেখানে এই স্টুডিও আর দশটা সাধারণ ডিজাইনের ভিড়ে মুছে যেতে চায় না। তাদের মূল লক্ষ্য মানসিক অসুখ জয়ী শিল্পীদের মৌলিকতাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং তাঁদের সযত্নে লালিত সৃষ্টিশীলতাকে সমাজের মূলস্রোতে সসম্মানে প্রতিষ্ঠা করা।

কায়িক শ্রম বা কারখানার কাজের শৃঙ্খলার মধ্যে যে শিল্প লুকিয়ে থাকে, তা চট করে অনুধাবন করার রীতি নেই তথাকথিত বোদ্ধা মহলেও। এন্টালির স্টুডিওতে ব্লক ছাপাই ও মাটির বাসন গড়া বা পোড়ানোর নানা কাজে নিযুক্ত কর্মীরা আপাতত মর্যাদার একটি স্থায়ী বেতন উপার্জন করছেন। এমনকি সুরজিৎ বর্ধনের মতো প্রবীণ শিল্পীর পরিবার চলছে এই কাজের আয়েই।

এখানে ওঁদের মনোরোগীর তকমা দিয়ে করুণা করা হয় না। এই স্টুডিওটি যদি পরিপূর্ণভাবে দাঁড় করানো যায়, তবে এই শিল্পী ও শ্রমিকেরা সকলেই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অংশীদার হয়ে উঠবেন, এমনকি এটি একটি সফল সমবায় সংস্থাও হতে পারে।

রত্নাবলী রায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এখানে ওঁদের মনোরোগীর তকমা দিয়ে করুণা করা হয় না। এই স্টুডিওটি যদি পরিপূর্ণভাবে দাঁড় করানো যায়, তবে এই শিল্পী ও শ্রমিকেরা সকলেই প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অংশীদার হয়ে উঠবেন, এমনকি এটি একটি সফল সমবায় সংস্থাও হতে পারে।

আজকের বাণিজ্যিক পৃথিবীতে এই উদ্যোগ এক অন্য মাত্রা যোগ করেছে। আবাসিকদের আঁকার মূল উপাদানগুলোকে নিয়ে কাঠখোদাই করে তৈরি করা হচ্ছে প্রধান ডিজাইন এলিমেন্ট। এই সততা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে প্রতিটি ব্লক থেকে তৈরি হচ্ছে কেবল সীমিত সংস্করণের জিনিস, যেখানে প্রতিটি মোটিফ এক-একজন শিল্পীর নিজস্ব স্বাক্ষর বহন করে। সাধারণ পোশাকের ভিড়ে যারা নিজেদের অনন্য করে তুলতে চান, কিংবা সীমিত সংস্করণের এই হ্যান্ডক্রাফ্টেড গল্পগুলোর সঙ্গী হতে চান, তাদের কালেকশনে এই পিসগুলো বিশেষ স্থান করে নিচ্ছে।

জীবনে নতুন আলো জ্বালানোর নাছোড়বান্দা ইচ্ছেটাই আজ ডানা মেলছে কলকাতার বুকে। এঁরা কি কেবলই শ্রমের কারিগর, নাকি হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক-একজন খাঁটি শিল্পী? উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁদের প্রতিটি তুলির টানে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য লড়াইয়ের ইতিহাসের মধ্যেই।

_____________
স্টুডিও ১০০/এ | সিআইটি রোড, পার্কসার্কাস পদ্মপুকুর সন্নিকট, এন্টালি | ১১টা থেকে ৭টা (শুধুমাত্র অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে : মিলন মজুমদার/ +919123733973/ শুধুমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ)

Written by
Developed by DXDasia