
উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা প্রতিদিনের শান্ত জীবনে যে তীব্র অভিঘাত তৈরি করে, তাকে চেষ্টা করেও সরিয়ে রাখা যায় না
গোবিন্দ যখন চলে যাচ্ছেন গ্রাম ছেড়ে, পাড়ি দিচ্ছেন অনিশ্চিত জীবনের উদ্দেশ্যে, পড়ে থাকা এক গ্রামবাসী তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি আবার ভিটেতে ফিরবেন কি না। উত্তরে তিনি জানান যে অবশ্যই ফিরবেন। নিজেকে সান্ত্বনা দিতেই কি এমন উত্তর? না আসন্ন দুর্দিনকে দেখতে না পাওয়ার ভুল? গোবিন্দ যে দেশভাগের ফলে উদ্বাস্তু হয়েছেন। এই কাহিনিতে ফেরার রাস্তা থাকে না আর। নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য। এই চলচ্চিত্রের প্রতি মুহূর্তে শিকড় ছিঁড়ে চলে যাওয়ার দৃশ্য। রাস্তা দিয়ে পিঁপড়ের পালের মতন হাঁটতে থাকেন মানুষ, স্টিমার, ট্রেনে গাদাগাদি করে আসতে থাকেন রাষ্ট্রীয় নেতাদের টেনে দেওয়া সীমান্ত পেরিয়ে। ভূমিখণ্ডগুলি রূপ বদলায়। কোনও জমি পরিত্যক্ত, কোনও জমি ভিটেহীন, দেশহীন মানুষের জ্যান্ত কবর হয়ে ওঠে। নিমাই ঘোষের সিনেমাটি উদ্বাস্তু সমস্যার কথা বলেছে। যেমন বলেছে আরও বহু সিনেমা, সাহিত্য, গান, কবিতা, প্রবন্ধ। মাঝে মাঝেই খবরের চ্যানেলের সঞ্চালক-সঞ্চালিকারা জানাতে থাকেন এমন মানুষের খবর। উদ্বাস্তু-সমস্যার গল্প বলে সময়। উদ্বাস্তু সমস্যা। উদ্বাস্তুদের সমস্যা, না উদ্বাস্তুদের নিয়ে সমস্যা? উত্তর তো পক্ষের উপর নির্ভরশীল।

ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একশোর বেশি ছিটমহলে মানুষ মিথ্যে হয়ে বেঁচেছিল বছরের পর বছর। ভারত না বাংলাদেশ? কোনটা তাঁদের দেশ? প্রশ্নের উত্তর হাতড়াতে হাতড়াতে পরবর্তী প্রজন্মের কাঁধে রেখে যেতেন সেই প্রশ্নের ভার। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, যোগাযোগ, ভোটাধিকার এসবের কোনওটাই তাঁদের জন্য নয়, এটাই ছিল সবথেকে বড়ো সত্যি। ২০১৫ সালে ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পরে স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিলেন মানুষগুলো। কিন্তু এখনও বদলায়নি অনেককিছুই।
ভিটে মানে দেশ, ভিটে মানে বন্ধু, ভালোবাসা, স্বজন, স্মৃতি। সেই ভিটে উজাড় করে শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয় সময়। মহাকালের বিষ ঝরে পড়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে- যুদ্ধ, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশাল কোনও দুর্ঘটনা (চেরনোবিল, ফুকুশিমা পরমানুকেন্দ্রে বিস্ফোরণ, ইত্যাদি), জাতিগত দাঙ্গা, ধর্মীয় কারণ, অর্থনৈতিক সমস্যা। ২০২২ সালে প্রকাশিত UNHCR-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা বিশ্বে বিভিন্ন কারণে উদ্বাস্তুদের সংখ্যা প্রায় ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি। আফ্রিকা, প্যালেস্তাইন, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইউক্রেন, গ্রিস, ভেনেজুয়েলা, তুরস্ক, এই তালিকাতে আছে সবাই। রিপোর্টটি প্রকাশ করার পর UNHCR-এর অধিকর্তা ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি (Filippo Grandi) জানিয়েছিলেন, ২০২২ সালের জুন মাসের হিসেব অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে প্রতি ৭৮ জনের মধ্যে ১ জন উদ্বাস্তু। সংস্থার বার্ষিক গ্লোবাল ট্রেন্ড রিপোর্ট (UNHCR Annual Global Trend Report) অনুযায়ী, ২০২০ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু সংখ্যা ছিল ৮৯.৩ মিলিয়ন। তার মধ্যে ২৭.১ মিলিয়ন মানুষ হয়েছিলেন দেশহীন, যাঁদের ভিতর অর্ধেকেরই বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। বাকিরা অনেকে দেশের ভিতরেই দেশান্তরী হয়েছিলেন, কেউ হিংসা বা গৃহযুদ্ধে, কেউ কাজের জন্য। ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি জানান, এরকম চলতে থাকলে আগামী দশকে পৃথিবীতে উদ্বাস্তুর সংখ্যা হবে দ্বিগুন।
দেশহারা, শিকড়হারা ভৃগুকে দর্শকের সামনে এনে দাঁড় করান ঋত্বিক ঘটক, ‘কোমল গান্ধার’ চলচ্চিত্রে। ট্রেন লাইনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ভৃগু অনসূয়াকে দেখায় নিজের ছেড়ে আসা দেশ, অন্য দেশে এসেও যার স্মৃতি দগদগে ঘায়ের মতোই তীব্র। এখানেই দেশের ভিতর ঢুকে পড়ে দেশ। কাঁটাতার পেরিয়ে রক্তাক্ত পায়ে এসে দাঁড়ান হারিয়ে যাওয়া মা, ফুরিয়ে যাওয়া শৈশব। তারা ‘এমনি এসে ভেসে যায়’, যে ঘুড়ি উড়ে যেত নিশ্চিন্ত আকাশে, তার বাঁধন ছিঁড়ে গেছে, আর তাকে ধরা যায় না। মাহমুদুল হকের কালো বরফ উপন্যাসে নায়কের দাদা উদ্বাস্তু হয়ে স্টিমারে চড়ে ওপার বাংলায় চলে যান। সে সময় নদীর সমস্ত ঘাটকে সেই দাদা যে যে অভিশাপ দিয়েছিলো, তা কি শহর-শহরতলির নদীঘাট-আঘাটাকে ক্ষইয়ে দিয়েছিলো খানিক! নাকি অভিশাপের স্মৃতি বুকে জমিয়ে নিরুত্তাপ জলে একা নৌকা বাইতেন তাঁর ভাই?

তবে শুধু স্মৃতির যন্ত্রণাই নয়, উদ্বাস্তু সমস্যা প্রবলভাবে জাগতিক। উদ্বাস্তু মানুষ শুধু বসত খোঁজে না, খোঁজে কাজ, সম্মান, খাদ্য, বন্ধু, সম্পর্ক। পুরোনো বাসিন্দাদের সঙ্গে চলে কাজ পাওয়ার প্রতিযোগিতা। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা প্রবল চাপে পড়েন। উদ্বাস্তু মানুষেরা প্রায়শই হয়ে পড়েন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাঁদের জন্য বরাদ্দ থাকে অস্থায়ী ক্যাম্প। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। শিশুরা হারিয়ে ফেলে শিক্ষার অধিকার। কপর্দকহীন অবস্থায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গাতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেন ক্রয়ক্ষমতা। মানিয়ে নিতে হয় ভিন্ন সংস্কৃতি, অভ্যাস, নিয়মের সঙ্গে। পুরোনো বাসিন্দা আর নতুন আসা মানুষেরা আলাদা আলাদা দেশ হয়ে রাস্তার দুই দিকে দাঁড়িয়ে থাকেন। বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতির উপর প্রবল চাপ পড়ে। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ডের (International Monetary Fund- IMF) কয়েকবছরের পুরোনো একটি নোট থেকে জানা যাচ্ছে, চার বছর ধরে যুদ্ধ চলা ইয়েমেনে ২০১৫ সালে জিডিপি (GDP) কমে গিয়েছিল অর্ধেকের বেশি। লিবিয়াতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১৪ সালে জিডিপি কমেছিল ২৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইরাকে দারিদ্র বেড়ে হয় ২৩ শতাংশ। এই সমস্তই বাস্তুহীন হওয়ার সমস্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। উদ্বাস্তুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ে ক্ষুধা, অপুষ্টি। UNHCR-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে একদেশ ছেড়ে অন্যদেশে পাড়ি দেওয়ার পথে মৃত্যু হয়েছে ৩২০০ জনের। গ্রিসের উদ্বাস্তু ক্যাম্পে থাকা ২৭০০ জন বাচ্চা শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছে (২০২১ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী)। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে অগনিত মানুষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন। ভাষা সমস্যা, দক্ষতার তারতম্য, চিকিৎসার অভাব, বিভিন্ন সমস্যায় দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা।
ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী একশোর বেশি ছিটমহলে মানুষ মিথ্যে হয়ে বেঁচেছিল বছরের পর বছর। ভারত না বাংলাদেশ? কোনটা তাঁদের দেশ? প্রশ্নের উত্তর হাতড়াতে হাতড়াতে পরবর্তী প্রজন্মের কাঁধে রেখে যেতেন সেই প্রশ্নের ভার। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, যোগাযোগ, ভোটাধিকার এসবের কোনওটাই তাঁদের জন্য নয়, এটাই ছিল সবথেকে বড়ো সত্যি। ২০১৫ সালে ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পরে স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিলেন মানুষগুলো। কিন্তু এখনও বদলায়নি অনেককিছুই। পরিযানে যাওয়া শ্রমিকের দল করোনা অতিমারির সময় শুধু নিজেদের বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন। রাতজাগা পরিযায়ী ভারতবর্ষ হেঁটেছিল কয়েকহাজার কিলোমিটার। কিন্তু তাঁদের পথ বাড়ি পর্যন্ত না পৌঁছে আটকে গিয়েছিল ভিনরাজ্যের সীমানায়। মালবাহী ট্রাক আর মালগাড়ি ছুঁয়ে দিয়েছিল তাঁদের। আর তাঁদের পরিযানকে অন্তহীন সত্যি করে মৃত্যুর দেবতা বিছিয়ে দিয়েছিলেন অন্ধকারের আঁচল। তাঁদের ঘরে না পৌঁছানো, এখন ধুলো হয়ে যাওয়া লাশগুলোর গায়ে বোধহয় দূর্বাঘাস জন্মে গেছে। কোন পুজোয় লাগবে কে জানে?

উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণা প্রতিদিনের শান্ত জীবনে যে তীব্র অভিঘাত তৈরি করে, তাকে চেষ্টা করেও সরিয়ে রাখা যায় না। দেশ, ঘর হারানো মানুষের মৃত শরীর খুঁজে পায় সাগরের ঢেউ। কখনও গ্রিসে, কখনও মায়ানমারে। কখনও সে খ্রিস্টান, কখনও রোহিঙ্গা মুসলমান। কখনও শিশু, কখনও প্রাপ্তবয়স্ক। ভারত-পাকিস্তানের সীমান্তে নো ম্যানস ল্যান্ড (No Man’s Land)-এ পড়ে থাকেন নিথর টোবা টেক সিং। নন্দর মা আসলে কোন দেশে যান? কোন দেশ ছেড়ে যান? “পেরিয়ে পেরিয়ে উঁচুনিচু ঢালু মাঠ,/ শিশিরে ভেজানো কাঁটাতার, গাছপালা”? মানুষ আসলে গাছ হতে চায়। চায় শান্তি, সুস্থিতি। তাই শিকড় ছিঁড়ে গেলে “কলস ভাসে এ ঘাট থেকে অন্য ঘাটে প্রভু, জল মেলে না তবু।” তবুও স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা করে, উদ্বাস্তু মানুষেরা একসঙ্গে এসে দাঁড়াচ্ছেন, খুঁজে পাচ্ছেন ভিটে, সমাজ, আলো। লিওনেল মেসিকে ভালোবেসে ফুটবল খেলার অপরাধে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া ছোট্ট মোর্তাজা খেলতে খেলতে এগিয়ে চলেছে, আর তার ড্রিবলে ধরাশায়ী হচ্ছে কাঁটাতার, যুদ্ধের আগুন, ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট। যদিও এই স্বপ্ন শুনতে অবাস্তব, তবু “আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি,/কার তাতে কী?”
