
আজ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা উদযাপনের দিন!
আজ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা তথা মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ইংরেজিতে ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা উদযাপনের দিন। ভালো। কিন্তু…
আমাদের দেশে সাংবাদিকতার সঙ্গে ‘স্বাধীনতা’র সম্পর্ক কোথায় এসে ঠেকেছে, তা এখানে না বলে দিলেও চলবে। আমি বরং বলি, মিডিয়া ওয়াচডগ ‘রিপোর্টারস স্যানস ফ্রন্টিয়ারস’ (‘রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস’ বলেও পরিচিত) বা আরএসএফ-এর ২০২১ সালের বার্ষিক রিপোর্ট ‘ইন্ডিয়া’ সম্পর্কে কী বলছে। ভারত সম্পর্কে তাদের রিপোর্টে খুব স্পষ্ট লেখা রয়েছে, ‘সাংবাদিকতার জন্য বিপজ্জনক দেশ’।
এখানেই থেমে থাকেনি তারা। স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করা দেশগুলির মধ্যে ভারত রয়েছে ১৪২ নম্বর স্থানে। ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আরএসএফ জানিয়েছে, "শুধুমাত্র স্বৈরাচারী দেশগুলিই নয়, উত্তরোত্তর গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানরাও আর সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে চাইছেন না। দেখছেন প্রতিপক্ষ হিসেবে এবং খোলাখুলি বিরাগ, বিতৃষ্ণা প্রকাশ করছেন। রাজনৈতিক নেতারা খোলামেলা ভাবে সংবাদমাধ্যমের প্রতি এই শত্রুতাকে মদত দিচ্ছেন।”
ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইন্ডেক্স অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ছিল ১৩৩ তম। ২০১৭ সালে তিনধাপ নেমে স্থান হয় ১৩৬, ২০১৮ সালে আরও দু’ধাপ নেমে ১৩৮, যা ২০১৯ সালে হয় ১৪০। ২০২০-তে আরও নীচে নেমে ১৪২, যা ২০২১-এ অপরিবর্তিত রয়েছে।
ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো’র পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৯২-২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশে ৭০ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে খুন হন ন’জন। ২০১৭ সালেই খুন হন ত্রিপুরার সুদীপ দত্ত ভৌমিক ও শান্তনু ভৌমিক, উত্তর প্রদেশের নবীন গুপ্তা ও কর্ণাটকের গৌরী লঙ্কেশ। ২০১৮ সালে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ সাংবাদিকেরই মৃত্যু-রহস্য পরিষ্কার হয় না। ২০১৭ সালে সাংবাদিক ও সম্পাদক গৌরী লঙ্কেশেকে গুলি করে খুন করে হিন্দুত্ববাদীরা। দলিতদের পক্ষে দাঁড়ানো, উগ্র হিন্দুত্বের সমালোচনা, নারী স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করার অপরাধে বহুদিন ধরেই হিন্দুত্ববাদীরা তাঁর উপর খড়্গহস্ত ছিল। এই ঘটনায় সারা দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী হত্যা আগেই শুরু হয়েছিল। ২০১৩ সালের আগস্টে জাতপাতবিরোধী সামাজিক কর্মী ও নাস্তিক নরেন্দ্র দাভোলকরকে খুন করে হিন্দুত্ববাদীরা। ২০১৫ সালে খুন হন উগ্র হিন্দুত্বের সমালোচক গোবিন্দ পানসারে এবং প্রথিতযশা পণ্ডিত এমএম কালবুর্গি। ভারতে যুক্তি, মুক্তবুদ্ধি, উদারতার যে আর কোনও স্থান নেই, একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সে কথাই যেন বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে হত্যাকারীরা।
স্বাভাবিক ভাবেই ছাড় মেলেনি সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের। একের পর এক সাংবাদিককে ধর্ষণ ও খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, সরকারের ও কর্পোরেটের মনঃপূত খবর হয়নি বলে সরে যেতে হয়েছে হিন্দুস্তান টাইমসের সম্পাদক ববি ঘোষ, ইপিডব্লিউ’র সম্পাদক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, এবং দ্য ট্রিবিউনের হরিশ খারের মতো প্রবীণ সম্পাদককে।
নিউজ ওয়েবসাইট দ্য কুইন্টের সাংবাদিক দীক্ষা শর্মা ও মহম্মদ আলি, সংবাদসংস্থা এএনআই-এর অভয় কুমার, ফার্স্টপোস্টের দেবব্রত ঘোষ, এনডিটিভি’র সোনাল মেহরোত্রা কাপুরকে এমনই হুমকির মুখে পড়তে হয়। ধারাবাহিক ভাবে চূড়ান্ত হেনস্থার শিকার রানা আয়ুব, সাগরিকা ঘোষ, রভীশ কুমারের মতো নামজাদা সাংবাদিকরাও।
না, তালিকা এখানেই শেষ নয়। আরএসএফ-এর রিপোর্টে বলা হচ্ছে, এই হুমকির ফলে সংবাদমাধ্যমে সেলফ-সেন্সরশিপ বাড়ছে। গ্রামীণ এলাকার সাংবাদিকদের অবস্থা আরও করুণ। তাঁদের না আছে নিরাপত্তা, না আছে ভালো বেতন। শারীরিক নিগ্রহ, মৌখিক শাসানি, অনলাইনে হেনস্থার উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ফলে সাংবাদিকতার ক্ষেত্র বিষিয়ে ওঠার কারণেই ভারত আরও দু’ধাপ নীচে নেমে এসেছে।
ভারতের নীচে নামার আর এক কারণ কাশ্মীর। আরএসএফ রিপোর্টে কাশ্মীরকে ‘খবরের কৃষ্ণগহ্বর’ বলে বর্ণনা করেছে। একেই বিদেশি সাংবাদিকদের ভারতে আসার ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। কাশ্মীরে যাওয়ার তো প্রশ্নই নেই। এক ফরাসি সাংবাদিককে গ্রেফতারও করা হয়। প্রতিনিয়ত সরকারি বাহিনীর রোষ ও হেনস্থার মুখে পড়তে হয় সাংবাদিকদের, বিশেষ ভাবে চিত্রসাংবাদিকদের। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘মৌন সম্মতি’ আছে বলেই সেনা ও আধাসামরিক বাহিনী সাংবাদিকদের হেনস্থা করতে পারে বলে মনে করে আরএসএফ। বার্ষিক রিপোর্টে অবশ্য আর কোনও রাজ্য সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়নি।
‘প্রেস ফ্রিডম ডে’ নিয়ে কবি-সাংবাদিক মৃদুল দাশগুপ্ত বলছেনঃ
“বিন্ধ্য পর্বতের অরণ্যঘেরা শহরগুলি থেকে ক'টি সংবাদপত্র বের হয় বা ওই অঞ্চলে কিছু লোকাল চ্যানেল আছে কিনা, আমি তো বলতে পারব না। তাই আমি সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে প্রেস ফ্রিডম বা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের স্বাধীনতা বিষয়ে কিছু বলতেও পারব না। বাংলার পোর্টাল হিসেবে আপনারা ৩ মে আন্তর্জাতিক প্রেস ফ্রিডম পালনে ব্রতী হয়েছেন। এতে আমার মনে অট্টহাসির উদ্রেক হয়েছে।অতি সম্প্রতিই এক বিদেশি কার্টুনিস্ট ভারতীয় সাংবাদিকতার প্রতীক হিসেবে একটি চেন বাঁধা কলমকে কুকুরের রূপ দিয়ে দেখিয়েছেন। অথচ জরুরি অবস্থাকালে এই ভারতীয় সাংবাদিকতাই আন্তর্জাতিক করতালি পেয়েছে। সেসময় কলকাতার সংবাদপত্রগুলিও সেন্সরশিপ সম্পর্কে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করত প্রথম পৃষ্ঠার সিংহভাগ শূন্য অর্থাৎ সাদা রেখে। যদিও সে সময় অনেকগুলি বণিক সঙ্ঘ ইন্দিরা-বিরোধী বা জরুরি অবস্থা-বিরোধী ছিল। আমি ৪০ বছরের অধিক সময় সাংবাদিকতা করেছি, একাধিক সংবাদপত্রে। আমি সাহসী, স্বাধীনচেতা পূজনীয় অগ্রজদের দেখেছি। আবার আত্মসমর্পণকারী হাঁটু মুড়ে বসা মানুষজনও দেখেছি। সবিস্তারে বলার ক্ষেত্র এটি নয়। লিখব, কাগজ কোথায়? বাংলায় এই মুহূর্তে কোনও স্বাধীন প্রেস নেই। 'ফ্রিডম অফ প্রেস' দিবস পালন তাই অট্টহাসি জাগাচ্ছে।
দুটি খুচরো তামাশা করি, যা সাম্প্রতিক।
আচ্ছা, নন্দীগ্রামে ভোটপ্রচারে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফের ১৪ মার্চের ঘটনার কথা ভাসিয়ে দিয়ে চটি পুলিসের প্রসঙ্গ আনলেন। বিতর্ক তুলে দিলেন। অভিযোগ মুক্তির উল্লাসে মাতলো সিপিএম। আমি অবাক ! কোনও সাংবাদিকের ইচ্ছে জাগলো না, যাই লক্ষণ শেঠকে গিয়ে জিগ্যেস করি, আসলে ওইদিন, ১৪ মার্চ, ঠিক কী ঘটেছিল ?
আবার, সিপিএম ঐশী, ইপ্সিতা, মীনাক্ষী, পৃথা, সৃজনদের প্রার্থী করে চমক দিল, কোনও সাংবাদিকের নজরে পড়ল না কুখ্যাত তপন -সুকুরের তপন ঘোষকেও প্রার্থী করা হয়েছে!
বামনদশা চলছে সাংবাদিকদের। খর্বকায়, নতমুখ, পরাধীন। ”
আরও পড়ুন: ভোট শেষ, তারপর?
তবে, মৃদুলবাবুর কথার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বলতে চাই। এই মুহূর্তে বাংলায় কোনও স্বাধীন প্রেস নাই থাকতে পারে, প্রযুক্তিগতভাবে স্বাধীন কিছু মাধ্যম আমরা পেয়েছি। মৃদুলবাবু অথবা অনেক সাংবাদিকই এখন বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের মতামত রাখেন, তা বহুসংখ্যক না হোক কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছয়; মৃত আত্মার শান্তিকামনায় পিণ্ডদানের মতো হলেও এটা স্বাধীন সাংবাদিকতা নয় কি? হতে পারে সেটুকু স্বাধীনতাও একদিন হারিয়ে যাবে। তখন আবার আমরা নতুনের আশা করবো। আসলে আশায় মরে চাষা, সেই অর্থে এখন আমরা প্রত্যেকেই চাষা। ‘আমরা’ কিনা জানি না, তবে আমি এখনও আশা করছি, লাল-নীল-গেরুয়া কিংবা হলুদ, ‘রঙ’ ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া একদিন আর কঠিন মনে হবে না। কোন খবরটা ‘খাচ্ছে’, সেটাই শেষ কথা হবে না। ‘ব্রেকিং’ আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে না সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা থাকবে না সাংবাদিকদের। আসল সত্যি এবং নিরপেক্ষ সাহসের নাম হবে ‘সংবাদ’!
