
শীতকাল মানেই কমলা রঙের ফল, কবিরা তাকে জায়গা দিয়েছে তাঁদের কবিতায়
কবি স্বদেশ সেন তাঁর ‘রাখা রয়েছে কমলালেবু’ কবিতায় লিখেছিলেন, “একজন সারাদিন ও সব জায়গার মানুষ/ ছাল মাংস নয় সকালবেলার শরীর/ এখানে জল, এখানে আরেকবার জল/ এক ওষুধ ও গোটা জামা/ আস্তে ধীরে আনন্দ গলগল শব্দ/ আজ আমার এক ঘরে সমস্ত সেবা/ আমার রাখা হয়েছে কমলালেবু/ আজকের আলোয় দেখে আজকের লেখা।” – এই অমোঘ এক একটি উচ্চারণ শীতকাল কেন্দ্রিক। যে শীতকাল কবিদের কাছে তুমুল রং ছেটানোয় মেতে থাকে। মনে রং ঢালে, চেতনায় ঢালে, দেহেও। তাই শীতকাল এলেই যে যে উপকরণগুলি আমাদের বিশেষত বাঙালিদের মনে পড়বে, তার মধ্যে অন্যতম কমলালেবু। একটি কমলা রঙের ফল। যাকে ঘিরে বাসা বাঁধে শীতকালীন আবেগ।
এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড়ো খবর হল, পাহাড়ি বক্সা থেকে শীতকালীন কমলালেবু নেমে এল সমতল ডুয়ার্সে। পাঞ্জাব, নাগপুরের লেবুকে টেক্কা দিয়ে অধিক দামে বিক্রি হচ্ছে বক্সা পাহাড়ের লেবু। সেই লেবুর বর্তমান দাম ৬০-৬৫ টাকা। কমলালেবু মিষ্টি নয়? তাতে কী! শীতে বাড়িতে কমলালেবু না থাকলে হয়! উত্তরবঙ্গের বাজারে বাজারে তাই ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে কমলালেবু। কোভিড সমস্যা খানিক মিটলে বক্সা পাহাড়ের কমলালেবু ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশ, অসম এবং ত্রিপুরায়। ১৯৮৬ সালের পর বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প ঘোষণা হয়। সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় টাইগার রিজার্ভের ভেতর চাষবাস। এরপর ১৯৯৩ সালে বন্যার আগে-পরে নষ্ট হয়ে যায় প্রচুর গাছ। জেলা কৃষি দপ্তর এবং রাজাভাতখাওয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে ২০১৬–র পরই উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয় চাষবাসের। মাত্র তিন বছরেই ফল হাতেনাতে। সেই কমলালেবুই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে উত্তরবঙ্গের পাহাড় থেকে সমতলে। দক্ষিণবঙ্গেও চলে আসবে আর কিছুদিনের মধ্যে।
শীত ঋতু নিয়ে বাঙালি কবিদের আদিখ্যেতার শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে ভাস্কর চক্রবর্তী অনেকের কবিতাতেই ঘুরে ফিরে এসেছে শীতকালীন মেজাজ। রবীন্দ্রনাথ ‘উদ্বোধন’ কবিতায় লিখছেন, “ডেকেছো আজি, এসেছি সাজি, হে মোর লীলাগুরু-/ শীতের রাতে তোমার সাথে কী খেলা হবে শুরু!/ ভাবিয়াছিনু গতিবিহীন গোধূলিছায়ে হল বিলীন/ পরাণ মম, হিমে মলিন আড়ালে তারে হেরি?/ উত্তরবায় কারে জাগায়, কে বুঝে তার বাণী-/ অন্ধকারে কুঞ্জদ্বারে বেড়ায় কর খানি।”
আরও পড়ুন: শক্তি চট্টোপাধ্যায় — ছবি আঁকে, ছিঁড়ে ফ্যালে
অন্যদিকে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শীতভাবনায় ঢুকে পড়েছে ‘অমল যোনি’, ‘নিঃস্ব স্বর্গচূড়’, ‘উজ্জ্বল ঊরু’র প্রসঙ্গ। তিনি লিখছেন, “শীতের সমূহ পাখি ক্ষিপ্ত লাফ/ দিয়েছে তোমারই অমল যোনির পানে।/ একটি স্বর্ণপাত পুড়ে উত্তরোত্তর ঘন-ধোঁয়া/ ঠামহীন নিঃস্ব স্বর্গচূড়ে যায়/ নীলিম বরফে বন্ধ অনাদিকালের সাইবেরিয়া-/ পায়ের উপর থেকে ক্রমে শাল উড্ডীন মরালসম।/ তোমার উজ্জ্বল ঊরু দেখে মনে হয় মরে যাবো।” (বৃক্ষের প্রতিটি গ্রন্থে)
শীত আছে, অথচ কমলালেবু নেই, এ তো হতে পারে না। উত্তরবঙ্গের কমলালেবুর ছোঁয়া তখন সমতল পেরিয়ে ঢুকে পড়ছে বাঙালি কবিদের যাপনে। কমলালেবুর প্রতি বাঙালির প্রেম চিনিয়েছেন বাঙালি কবিরাই। তাঁদের হাতের জাদুতে নতুন মাহাত্ম্য পেয়েছে এই কমলা রঙের ফল। ঠিক যেমন জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘কমলালেবু’ কবিতায় লিখেছিলেন, “একবার যখন দেহ থেকে বা’র হ’য়ে যাব/ আবার কি ফিরে আসব না আমি পৃথিবীতে?/ আবার যেন ফিরে আসি/ কোনো এক শীতের রাতে/ একটা হিম কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে/ কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।”
