যখন শিশুদের ঘুম ভাঙে গুলি-গোলার আওয়াজে

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শিশুদের বর্তমান-ভবিষ্যৎ

রীক্ষার খাতায় রচনা লিখতে বলা হয়। বিষয়— যুদ্ধ নয় শান্তি চাই। ছাত্রটি বেবাক তাকিয়ে থাকে জানলা পার করা ওই বুড়ো অশ্বত্থটার দিকে। ভাবতে ভাবতে সে দ্যাখে ক্লাসের সবাই ছুটোছুটি করছে। একদল তাদের ঘিরে ধরেছে। ছাত্রটির কান ঝাঁঝালো হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ চলতে থাকা বন্দুকের গুলিতে। পরীক্ষায় খাতায় বন্ধুদের চাপ চাপ রক্ত। তার সামনে শুধুই অন্ধকার।

এ মহাবিশ্বে যুদ্ধের খেলা আজকের নয়। পৃথিবী অনেক দেশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত তকমা দিয়েছে। মানুষের তাই সয়ে গেছে। যেন, এমনটা তো হয়েই থাকে! যে কোনো যুদ্ধেই জেতে একপক্ষ, হেরে যায় অন্যরা। আর মাঝে পড়ে থাকে শিশুদের দল, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ থাকলেও সে মনে জমে থাকে দগদগে ক্ষত। যা আজীবন বয়ে নিয়ে বেড়ায় শিশুটি। রাজনৈতিক টালমাটালে কোনো পক্ষই শিশুদের মনস্তত্ব নিয়ে ভাবে না। শৈশব, পড়াশোনা, স্কুল, মায়ের আদর সর্বস্ব জলাঞ্জলি দিয়ে শিশুটি বড়ো হয় আর গুমরে মরে। শিশুরা যুদ্ধের জাঁতাকলে পিশে এক অবর্ণনীয় অসহায় অবস্থার শিকার হয়। পৃথিবীর এখনও অনেক দেশ আছে যেখানে শিশুদের ঘুম ভাঙে গুলি-গোলার আওয়াজে। এমনকি শিশুদের খেলার মধ্যেও ঢুকে পড়েছে যুদ্ধ। পাশাপাশি রয়েছেন প্রবীণরাও। অবসাদ ঘিরে থাকে তাঁদেরও। আর নারীরা? বীরভোগ্যা বসুন্ধরায় ধরিত্রীর সঙ্গে লুণ্ঠিত, ছিন্নভিন্ন হন তারাও।

যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল নিয়ে প্রভূত আলোচনা হয়, অথচ যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেন, সেইসব সৈনিকদের কথা লেখা হয় কতটুকু! যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরেও অনেকের মনে রয়ে যায় বীভৎসতার দগদগে ক্ষত। শিকার হন পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডির। ‘১৯১৭’ ছবিতে আমরা দেখেছি যুদ্ধের ময়দানে বন্ধুত্ব ও একইসঙ্গে বন্ধুবিয়োগের গল্প। একপক্ষে যুদ্ধ করতে করতে বন্ধু হয়ে যায় দুই সৈনিক, ভাগ করতে থাকে পরিবারের কথা, সন্তানের কথা কিংবা কোনো প্রিয় প্রেমের সম্ভাবনার কথা। বীভৎস সেই প্রেক্ষাপটে ভেসে শিশুর কান্না, সদ্য ফুটে ওঠা এক শিশুর পেটে খিদে। আবার যুযুধান দুই দেশের সীমান্তে দুই সৈনিকের ছবি ফুটে ওঠে পরিচিত সেই গানে, “একটা থালায় চারটে রুটি একটু আচার একটু ডাল,/ একই থালায় দুজন খাবে, যুদ্ধ হয়তো আসছে কাল”।

‘আমি আদু’ ছবিতেও দেখি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রেমের আর্তনাদের ছবি। স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা আর যাবতীয় স্বপ্ন কেমন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় দুই দেশের যুদ্ধে। সুদূর দেশ থেকে স্বামী রেকর্ডার উপহার পাঠায় স্ত্রীকে, তা থেকে ভেসে আসে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে প্রেমের উচ্চারণ।

শিশুরা যুদ্ধের জাঁতাকলে পিশে এক অবর্ণনীয় অসহায় অবস্থার শিকার হয়। পৃথিবীর এখনও অনেক দেশ আছে যেখানে শিশুদের ঘুম ভাঙে গুলি-গোলার আওয়াজে। এমনকি শিশুদের খেলার মধ্যেও ঢুকে পড়েছে যুদ্ধ।

লড়াই, সংঘাত, যুদ্ধ – এসব মানব সভ্যতার আগে থেকেই সমাজে বিদ্যমান ছিল। তাত্ত্বিকভাবে মনে করা যেতে পারে, সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ-লড়াই কমতে থাকবে। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে এ ঘটনা ভিন্নতর হয়েছে। মানুষ পরিধান ও আসবাবগতভাবে যত বেশি সভ্য হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে বন্য।

যুদ্ধের প্রভাব পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের জন্য যে কী মারাত্মক হতে পারে, তা নিয়ে আমরা বিশেষ ভাবার ফুরসৎ পাই কই! প্রাণহানির পাশাপাশি যে বিপুল সম্পদহানি বা অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় তা পূরণ করতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। এ কারণে প্রায় প্রতি সময়েই যুদ্ধের পরে অবধারিতভাবে দুর্ভিক্ষ আসে, অনেক সময় দেখা দেয় মহামারী। যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের মাঝে যে বিভেদ-বিদ্বেষ আর সন্দেহ-অবিশ্বাসের জন্ম হয়, তা সহজে দূর হয় না। অনেক সময় যুগ যুগ ধরে এমনকি শতাব্দী ব্যাপী এই হিংসা ও বিদ্বেষ মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

সেভ দ্য চিলড্রেন-এর রিপোর্ট অনুযায়ী গাজার প্রতি পাঁচ জন শিশুর মধ্যে চারজনই অবসাদ, শোক ও আতঙ্কে ভুগছে।

১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর শেষ হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সে শান্তিচুক্তি আমরা আজও বয়ে বেড়াই। এরপর কেটে গিয়েছে একশোরও বেশি বছর। অথচ এ পৃথিবীতে যুদ্ধ থামেনি আজও। যুদ্ধ হয়। হয়তো একপক্ষ জিতে যায়। হেরে যায় মানুষ। সম্প্রতি যুদ্ধের দামামা বেজেছে ইজরায়েল আর প্যালেস্টাইনের (ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন যুদ্ধ) মধ্যে। তথ্য বলছে, ফিলিস্তিনের গাজার জনসংখ্যা ২৩ লক্ষ। এর প্রায় অর্ধেকই শিশু। বছরের পর বছর নানা অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে মানসিক সমস্যায় ভুগছে তারা। সেভ দ্য চিলড্রেন-এর রিপোর্ট অনুযায়ী গাজার প্রতি পাঁচ জন শিশুর মধ্যে চারজনই অবসাদ, শোক ও আতঙ্কে ভুগছে। এমনকি শিশুদের খেলার মধ্যেও ঢুকে পড়েছে যুদ্ধ। এই অবস্থায় শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব কি তাহলে একমাত্র তাদের বাবা-মায়েদের হাতেই?

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা অবলম্বন করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে করে যুদ্ধবাজদের প্রতি, “তুমি কে, তুমি কি গ্রহান্তরের দলছুট?/ তোমার কখনো ছিল না কি শৈশব?/ তুমি কি কখনো দেখোনি মাটিতে ঘুমন্ত কোনো শিশু?/ জানলার ধারে দাঁড়ানো, একলা, শূন্যদৃষ্টি নারী?/ কার দিকে তুমি গুলি ছুঁড়ছো হে, এখানে সবাই মানুষ!”

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Developed by DXDasia