পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় : পেশায় পুলিশ, নেশায় অনন্য এক ভাস্কর

দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ জাঙ্ক-স্কাল্পচার ‘রাইজিং হাই’ তাঁরই বানানো

সারাদিন খাকি উর্দি পরে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সার্কেল ইন্সপেক্টর হিসেবে অপরাধ-অপরাধীর সন্ধান করে বেড়ানোর পর শিল্পকর্মের সাধনা বিরল এবং বিস্ময়কর। এই মনস্তত্ব সাধারণ নয়। পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় (Pabitra Kumar Ganguly) আশ্চর্য এক মানুষ। নাহলে, পুলিশে চাকরির পাশাপাশি কেই বা ভাস্কর (Sculptor) হতে চায়!

ছোটোবেলায় ছবি আঁকার ঝোঁক ছিল না তা নয়, কিন্তু আর পাঁচজন সাধারণ ঘরের সন্তান হিসেবে তাঁকে সুনিশ্চিত করতে হয়েছিল তাঁর জীবিকা। পড়াশোনা শেষ করে যখন পুলিশের চাকরি নিয়ে শান্তিনিকেতনে পোস্টিং, সেই সময় টের পেলেন মনে মনে আজন্ম এক শিল্পীকে লালন করে চলেছেন। রামকিংকরের ভাস্কর্য তাঁর এই চেতনাকে উস্কে দিয়েছিল। সারা রাত ডিউটির সময় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন রামকিংকরের হাতে গড়া এক একটা মূর্তির সামনে। ভোর হয়ে আসতো, অপলক বিস্ময়ে কখন যে সময় কেটে যেত টের পেতেন না। সেই সময়ই সাক্ষাৎ কে জি সুব্রামনিয়ম ওরফে তাঁর গুরুদেব ‘মানিদা’র সঙ্গে। তাঁর কাছেই শিল্পচর্চার শুরু।

পুলিশের চাকরির পাশাপাশি ভাস্কর্য বিষয়ে এক বছরের ডিপ্লোমা করে নেন পবিত্রবাবু। আর ছবি আঁকার হাতেখড়ি হয় শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক সেলিম মুনশি’র সান্নিধ্যে। এছাড়াও শান্তিনিকেতনে সঙ্গ করেছেন বহু শিল্প-ব্যক্তিত্বের। চন্দনা হোড়, যোগেন চৌধুরী, সনৎ কর সহ অনেক গুণী শিল্পীরই স্নেহাশীষ পেয়েছেন।

শিল্পী সনৎ কর ও যতীন দাসের সঙ্গে পবিত্রবাবু

‘অপরাধীদের অন্ধকার দিকটা নিয়ে তোমার কাজ। তা বলে নিজের মনটাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে দিও না।’ পবিত্রবাবু মনে করিয়ে দেন ‘সোনার কেল্লা’ ছবির সিধু জ্যাঠার এই অমোঘ বাণীটি। তিনি যখন সালানপুর থানার আইসি পদে কর্মরত, সেই সময় থানা চত্বরেই বাজেয়াপ্ত হওয়া বাইক, সাইকেল দিয়ে গড়ে তোলেন একের পর এক ভাস্কর্য। থানা চত্বরেই গড়ে তোলেন ‘স্কাপচার স্ট্রিট’। থানার ক্যান্টিনের দেওয়ালে ফুটিয়ে তোলেন শিল্পকর্ম ‘ট্রাঙ্কুইলিটি’। ‘জাঙ্ক’ ব্যবহার করে লকডাউন, শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা তুলে ধরেন। মূলত ফেলে দেওয়া, বাতিল, অকেজো সামগ্রী নিয়ে নতুন সৃষ্টিই হল জাঙ্ক স্কাল্পচার।

পেশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কীভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন শিল্পচর্চা, কয়েকটি ঘটনার কথা বললেই তার খানিকটা আন্দাজ পাওয়া যাবে।

পড়ুয়াদের নিজের ভাস্কর্য ঘুরে দেখাচ্ছেন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়

পবিত্রবাবু তখন ঝাড়খণ্ড লাগোয়া একটা প্রান্তিক জায়গায় পোস্টিং। ২০২০ সালের শেষের দিকে, তাঁদের কাছে নির্দেশ আসে, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। সেইমত পাঠানোর প্রস্তুতি নেন তাঁরা। এই পাঠানোর কাজ যখন চলছে, একদিন এক পরিযায়ী দম্পতির সঙ্গে দেখা হয় পবিত্রবাবুর। ভদ্রমহিলার কোলে একটা বাচ্চা। কিন্তু যেকোনও কারণেই হোক তাঁর স্বামীকে দেশে ফেরত পাঠাতে পারেন না পবিত্রবাবুরা। বাসে ওঠার আগে স্বামীর হাত জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে স্ত্রী। তিনি কিছুতেই তাঁর স্বামীকে ছেড়ে যাবেন না। এ অবস্থায় গলার স্বরে মৃদু কাঠিন্য এনে পবিত্রবাবু তাঁকে বাসে উঠে যেতে বলেন। স্বামীর হাত ছেড়ে বাচ্চাকে নিয়ে বাসে উঠে পড়েন তিনি। দুজনের চোখেই তখন জল। অনিশ্চিত শুন্যতার মাঝে একে অপরকে ছেড়ে যাওয়া।

চোখের জল আড়াল করার জন্য পবিত্রবাবুও তখন বিহার রোড ধরে হাঁটতে শুরু করেছেন। ডানদিকে তাকিয়ে দেখেন দুটো সরু গাছ পরস্পরকে জড়িয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। বাস ছেড়ে চলে যায়।

এর বেশ কিছুদিন পর সেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে আবার দেখা হয় পবিত্রবাবুর। মহিলার চোখে জল নেই। কপালে সিঁদুর নেই। পরনে রঙিন শাড়ি নেই।

পবিত্রবাবুর বানানো ভাস্কর্য—‘দ্য ইন্টারউইনিং’ (THE INTERTWINING)-এর নেপথ্যে রয়েছে এই ঘটানাই। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (২০২৩) থেকে কলকাতার বিড়লা একাডেমিতে RAD-এর যে গ্রুপ এক্সহিবিশন হয়ে গেল, সেখানে পবিত্রবাবুর বানানো এই ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যটি প্রদর্শিত হয়েছিল।

‘দ্য ইন্টারউইনিং’

তিনি প্রশাসনিক কর্মী। আইনের কাছে তিনি দায়বদ্ধ। পুলিশ হিসেবে লকডাউনে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা দূর থেকেই প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল তাঁকে। এর কিছুদিন পরই তাঁর শিল্পভাবনায় তৈরি হয় ভাস্কর্য ‘লকডাউন’। সেই ভাস্কর্যে তিনি দেখালেন এক শয্যাশায়ী মানবদেহে উপর থেকে নেমে আসছে ক্ষয়ে যাওয়া তীক্ষ্ণ বেলচা-কোদাল।

‘লকডাউন’

লকডাউনে যখন পরিস্থিতি কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে, মাইথনে পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয়েছে, সেই রাস্তাতেই থাকা ট্রাফিক পার্কে প্রেমের বার্তা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘ডুয়েলিং অফ হার্ট’। অন্যদিকে, সালানপুর থানার গা ঘেঁষেই রয়েছে সালানপুর স্টেশন। পূর্বরেলের মূল রেলপথের পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘রাইজিং হাই’। ভাস্কর্যটির উচ্চতা ৩৯ ফুট, চওড়ায় ২০ ফুট। ৩৪৩টি সাইকেলের রঙ দিয়ে গড়ে তোলা স্থাপত্যকীর্তি। পবিত্রবাবুর দাবী, দেশের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ জাঙ্ক স্কাল্পচার। রিং-এর উঁচু-নীচু পথ বেয়েই সাইকেল চালিয়ে উঠছে এক স্কুলপড়ুয়া এক মেয়ে। যেসব ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে যায় সাইকেলে চড়ে তাদেরকে উৎসর্গ করেই এই কাজ। এই কাজের প্রেরণা জুগিয়েছিল তাঁর স্কুলপড়ুয়া মেয়ে, যে স্কুলে যায় সাইকেল চালিয়ে।    

‘রাইজিং হাই’

কমবেশি তাঁর সমস্ত শিল্পকর্মের নেপথ্যেই এরকম কিছু ঘটনা, স্মৃতিকথার উল্লেখ পাওয়া। যেমন- ‘দ্য ট্যুইস্টার’। বাতিল সাইকেলের চাকার সঙ্গে আরও কিছু ধাতব উপাদান মিশিয়ে প্রকাণ্ড (২৪x১০x১০) এই ভাস্কর্যটি বানিয়েছেন পবিত্রবাবু। “অধ্যাপক অনন্য ভট্টাচার্য, বাংলা সাহিত্য পড়ান। তখন আমরা দু’জন একসঙ্গে বাংলা পড়তাম শ্যামসুন্দর মহাবিদ্যালয়ে। মাঝে মাঝেই কলেজ পালিয়ে চলে যেতাম বর্ধমানে, সিনেমা দেখতে। কত যে সিনেমা দেখেছি দু’জনে! এইরকম একটা সিনেমা ছিল ‘TWISTER’। বর্ধমান লোকসংস্কৃতি মঞ্চে সেই সিনেমাটা দেখার পর আমার মনে হয়েছিল ঘূর্ণিঝড় নিয়ে একটা স্কাল্পচার  বানানো যায়। পরবর্তীকালে দীঘায় উত্তাল সমুদ্র ও ঘূর্ণিঝড়কে খুব কাছ থেকে দেখি। সেই নিয়েই তৈরি করলাম ‘THE TWISTER’, শ্রী সৌমেন মিত্র আইপিএস স্যারের সৌজন্যে।” বলছিলেন পবিত্রবাবু। ভাস্কর্যটি এখন রয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনার ব্যারাকপুরের ‘স্বামী বিবেকানন্দ স্টেট পুলিশ একাডেমি’-তে।

‘দ্য ট্যুইস্টার’

পবিত্রবাবুর আঁকা একটি ছবি

কখনও পরিযায়ী শ্রমিক, কখনো প্রান্তিক কোনও মানুষের ছাপোষা যাপন, শ্রমিক-জীবন, কখনও মাঝরাতে মেছুনির জাল ফেলা, কখনও নিজের মেয়ের স্কুল থেকে বাড়ি ফেরা, কখনও উদ্দীপনাময় ঘোড়ার গতিবিধি তাঁর ভাস্কর্যে, ছবিতে ভাষা পেয়েছে। যখন যেখানে যেমন উপকরণ হাতের কাছে পান, তাই দিয়ে কাজ শুরু করে দেন। নিজের শিল্পচর্চার পাশাপাশি অপরাধীদের মধ্যে শিল্প চেতনার উন্মেষ ঘটানো, নানান সমাজ সচেতনমূলক পথনাটক-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা – এই ভাবেই প্রতিমুহূর্তে জীবন আর শিল্পকে মিলিয়ে দিচ্ছেন পুলিশ অফিসার পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁকে দেখে প্রতিমুহূর্তে আপনার মনে হবে, রবীন্দ্রনাথ যে উদ্দেশ্যে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, মননে মুক্তধারার জোয়ার আনতে চেয়েছিলেন, তার সার্থক দৃষ্ঠান্ত তিনি।

___________

কৃতজ্ঞতাঃ

পবিত্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায়

দেবকুমার সোম, পুবের কলম

Developed by DXDasia