
পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র্য পর্ষদের অভিনব সব বই
বাংলার জীববৈচিত্র্যের অজানা কাহিনি নিয়ে কয়েক বছর আগেই একগুচ্ছ ‘মেঠো বই’ প্রকাশ করেছিল পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র্য পর্ষদ। বাংলার সাপ, বাংলার মাছ, গ্রাম বাংলার বন্যজন্তু, বাংলার প্রজাপতি, বাংলার ঝোপঝাড়, বাংলার মাকড়সা এমনই নানা বৈচিত্র্যে ভরা সেই সব বই। এ সবই আমাদের দামি সম্পদ। বাংলার মাঠে-ঘাটে, বনে-জঙ্গলে যারা কাজ করেন সেই শিক্ষক-গবেষক-বিজ্ঞানীরাই এই বইগুলির লেখক। শুধু বাংলা নাম নয়, রয়েছে বৈজ্ঞানিক নামও। ছাত্র-ছাত্রী-পর্যটক থেকে যে কোনও আগ্রহী সাধারণ মানুষদের জন্য এ এক বড়ো পাওনা। একে ফিল্ড গাইডও বলা যেতে পারে। সাধারণের কথা ভেবে এমন উদ্যোগ এত ব্যাপকভাবে হয়তো এর আগে কখনও চোখে পড়েনি। কীভাবে বইগুলি আমাদের কাজে লাগবে, কোথা থেকে মিলবে আরও খবর, সাপে কামড়ালে কী করা উচিত, বন্যপ্রাণ আইনটাই-বা-কী এমন – এইসব তথ্যও পাওয়া যাবে বইগুলি থেকে।

বাংলার মাছ
শোল মাছের নাম আমরা জানি। কিন্তু, শাল মাছ! কেমন তার আকার-গড়ন, কী বা তার রং? থাকে কোথায় খালে না বিলে? স্বভাবই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে বাংলার মাছ বইটিতে। মোট ৫৭টি প্রজাতির মাছের পরিচয় পাওয়া যাবে এখান থেকে। যার মধ্যে ৪৯টি-ই এ রাজ্যের পুকুর, ডোবা, খালের মাছ। অর্থাৎ, মিষ্টি জলের মাছ। পরিচয় রয়েছে অধুনা দুর্লভ হতে থাকা মাছেরাও। যেমন, শাল, চ্যাং, ন্যাদোস, শিঙি, দেশি ট্যাংরা। যাদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। যার একটি কারণ জলা-খাল-বিল ভরিয়ে অপরিকল্পিত উন্নয়ন। লেখকঃ শীলাঞ্জন ভট্টাচার্য।

বাংলার সাপ
সাপ বললেই অধিকাংশ মানুষ চোখ কপালে তোলেন। কেউ কেউ তো নাম শুনেই ভয়ে আঁতকে ওঠেন। প্রায় সকলেই ভাবেন সাপে কামড়ালে মৃত্যু অবধারিত। এছাড়াও আছে নানা সংস্কার। ভারতে পাওয়া যায় মোট ২৭৮টি প্রজাতির সাপ। তার মধ্যে ৬২টি প্রজাতির সাপের বিষ আছে। যার মধ্যে অল্পসংখ্যকই তীব্র বিষধর। বাংলায় দেখা মেলে ৯৫টি প্রজাতির সাপের। বইটিতে উল্লেখ রয়েছে ৩১টি প্রজাতির কথা। যার মধ্যে ন’টি উগ্র বিষধর। যেমন, কেউটে, কালাচ, গোখরো। ছ’টি মৃদু বিষধর। যাদের কামড়ে মৃত্যুর কোনও আশঙ্কা নেই। যেমন- কালনাগিনী, লাউডগা। বাকিরা বিষহীন। যেমন, পুঁয়ে সাপ, দাঁড়াশ, অজগর, ঘরচিতি। রয়েছে তাদের বিবরণ, স্বভাব, কোথায় থাকে এ সবই একটি মলাটের মধ্যে। লেখকঃ অরিজিৎ চ্যাটার্জি, সৌম্য সরকার, মরুৎ দেব।
বাংলার মাঠে-ঘাটে, বনে-জঙ্গলে যারা কাজ করেন সেই শিক্ষক-গবেষক-বিজ্ঞানীরাই এই বইগুলির লেখক। শুধু বাংলা নাম নয়, রয়েছে বৈজ্ঞানিক নামও। ছাত্র-ছাত্রী-পর্যটক থেকে যে কোনও আগ্রহী সাধারণ মানুষদের জন্য এ এক বড়ো পাওনা। একে ফিল্ড গাইডও বলা যেতে পারে।

বাংলার ভোজ্য ছাতু (মাশরুম)
চলতি ভাষায় আমরা বলি ব্যাঙের ছাতা। কিন্তু, মাশরুম শব্দটি এখন সর্বত্রই চালু। গ্রাম বাংলায় নোনা মাটির বাদাবনে, পাহাড়ে কিংবা লাল মাটির জঙ্গলে, পচা লতাপাতা, কাঠের গুঁড়ি, মরা গাছের উপর মেলে নানা জাতের ছাতু বা ছত্রাক। সাধারণ মানুষের অতি প্রয়োজনীয় প্রোটিন, মিনারেল, ফ্যাট, সুগার জোগায় স্যাঁতসেঁতে স্থান থেকে কুড়িয়ে পাওয়া এই ছাতু। শহরে বেশ দাম দিয়ে কিনতে পাওয়া যায়। সব ছাতু অবশ্য খাওয়া যায় না। আর যা খাওয়া যায় তাদেরও কত বিচিত্র নাম। মৌ ছাতু, কুড়কুড়া ছাতু, পরচুল ছাতু, লিভার ছাতু, কাঠ ঝিনুক ছাতু, মুরগি ছাতু, দুর্গা ছাতু আরও কত কী। বাংলায় ৬৫টির মতো খাওয়ার ছাতু মেলে। বইটিতে ৪২ ধরনের ছাতুর পরিচয় পাওয়া যাবে। লেখকঃ কৃষ্ণেন্দু আচার্য।

বাংলার ঝোপঝাড়
টোপাকুল তো আমাদের শোনা। বরকুল, শিয়াকুল, সেকুল! কেমন দেখতে চিয়ন গাছ, অসামলতা কিংবা তেলাকুচা, ঝুমকো লতা, তিতকোঙা? কী-ই-বা তাদের বৈশিষ্ট্য, পাওয়া যায় কোথায়? চেনার উপায় বা কী? কোনটা বিলুপ্তপ্রায় আর কোনটা নিকট ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবে তারও সুলুক-সন্ধান রয়েছে বাংলার ঝোপঝাড় বইটিতে। এই ঝোপঝাড়, লতা-গুল্মে, ছোট্ট-ছোট্ট গাছে জড়ানো-মড়ানো এলাকায় তো নানা সাপখোপ, পাখি-প্রজাপতি, ছোটখাটো বন্যজন্তুর আড্ডাখানা। লেখক বলছেন, এগুলো হল ‘স্থানীয় হটস্পট।’ এরা না থাকা মানে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়া। আমাদের সঙ্গে এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ – যা আমরা প্রায়শঃই বুনো ঝোপঝাড় বলে কেটে উড়িয়ে দিই-পুড়িয়ে দিই। এই হটস্পটের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন গবেষক অনির্বাণ রায়।

বাংলার মাকড়সা
ভোরবেলা মাকড়সার জালে মুক্তোর মতো শিশির। কাব্য। আবার বাথরুম কিংবা ভাঁড়ার ঘরে মাকড়সা দেখে চিল চিৎকার। এই মাকড় ভীতিও ঘোর বাস্তব। আবার বাস্তব এই যে, মাকড়সা আবার চাষিদের বন্ধু কীটও বটে। কারণ মাকড়সা ধানের পোকার শত্রু বা ফুলকপি ধ্বংসকারী মথ নাশ করে। আবার ঘরের মশা-মাছিও জালে পড়ে। সাপ, ব্যাঙ, পাখি খায় এমন মাকড়সাও রয়েছে। এই জাতের মাকড়সার বিষ তীব্র। আঠালো রেশমি সুতোর মতো জাল আর সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা দিয়ে তারা শিকার করে। সাধারণভাবে মাকড়সার বিষ কিন্তু পিঁপড়ে, বোলতা বা মৌমাছির চেয়ে জোরালো নয়। ভারতে প্রায় ১৫০০ প্রজাতির মাকড়সা দেখা যায়। এই মেঠো বইটিতে ৫০টি মাকড়সার পরিচয় দেওয়া রয়েছে। রেখাচিত্র ও রঙিন ছবির সাহায্যে দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় বর্ণনা। লেখকঃ সুমিত চক্রবর্তী।

গ্রাম বাংলার বন্যজন্তু
আদুর বাদুর চালতা বাদুড়, ভোঁদরের নাচ, কিংবা শিয়াল পণ্ডিতের গল্প – এ সবই আমাদের ছোটোবেলাকে উসকে দেয়। বাংলার গ্রাম জীবনের চিরকালের অঙ্গ তারা। আছে আরও, কাঠবেড়ালি বেজি, ভাম, গন্ধগোকুল, মেছো বিড়াল, বাঁদর, হনুমান…। গ্রামের, ঝোপঝাড়, বাঁশবাগান, জলা এই সব ছোটোখাটো বুনোদের ঘরবাড়ি। মানুষের সঙ্গেই তাদের ওঠা বসা। বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করা। বিজ্ঞানীরা বলেন, এরা হল ‘গ্রামের বাস্তুতন্ত্র অর্থাৎ ইকোসিস্টেমের অবিচ্ছ্যদ্য অংশ, স্থান পেয়েছে বাংলার ছড়া, লোককথা, ব্রত-পার্বণে।’ এ হেন বুনোরা কিন্তু গ্রাম বাংলার সমাজ আর অর্থনৈতিক জীবনের পালা-বদলের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে। যা এক আশঙ্কার কারণ বৈকি! মেঠো বইয়ে এই স্তন্যপায়ীদের স্বভাব, পরিচয় শুধু নয়, কী পরিবেশে কেমন আছে তারা, তারও বর্ণনা দিয়েছেন জীববিজ্ঞানী শীলাঞ্জন ভট্টাচার্য।
_______
কলকাতার কলেজস্ট্রিট অঞ্চল থেকে দে'জ, দে বুক স্টোর বা অন্যান্য বিভিন্ন দোকানে এই বইগুলি পেতে পারেন। এছাড়া প্রকাশনীর মূল অফিস প্রাণী সম্পদ ভবন (সল্টলেক, সেক্টর ৩)-এও পাওয়া যাবে।
