
সেদিন ভোরবেলা ভুবনডাঙার আকাশ ভরে গিয়েছিল সঙ্কীর্তনে
পৃথিবীতে কোনো কোনো মানুষ আসেন দৃষ্টান্ত হয়ে। ছকে বাঁধা জীবনচর্যা তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে না। সাধারণের জীবনের গল্প অতিক্রম করে অনেক যুগ পরেও সময়ের আরশিতে আলো ঝলমল করে উঠবে এইসব মানুষের জীবনের আদর্শ, তাঁদের স্বপ্ন। এমনই এক মানুষ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। তারপর সেই স্বপ্ন যেন এক বিরাট মহীরূহের মতো হয়ে উঠবে। ছায়া দেবে অগুনতি পথিককে। ৭ পৌষ দিনটি দেবেন্দ্রনাথের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ (১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর) দেবেন্দ্রনাথ এবং আরো কুড়িজন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। এরপর একেশ্বরবাদী সাধনার এই মত গ্রহণ করেন প্রায় পাঁচশো জন। দেবেন্দ্রনাথেরই প্রেরণায়, মাত্র দুই বছরের মধ্যে। আজকের দিনে এই ঘটনাটি শুনতে যতটা সহজ, পরিস্থিতি ততোটাও স্বাভাবিক ছিল না। প্রবল হিন্দুত্ববাদের পাশাপাশি সম্পূর্ণ অপৌত্তলিক ধর্মমত গড়ে তোলা যথেষ্ট সংগ্রামের বিষয় ছিল। দেবেন্দ্রনাথ পেরেছিলেন এবং নিজেই প্রায় হয়ে উঠেছিলেন একেশ্বরবাদী প্রতিষ্ঠান। ব্রাহ্মধর্ম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার পর দেবেন্দ্রনাথ মনে মনে একটি মিলনমেলার পরিকল্পনা করলেন। আসলে তখন ব্রাহ্মদের মধ্যে খুব মেলামেশার খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। পারস্পরিক ভাববিনিময় ও ধর্মালোচনা ব্রাহ্মধর্মের প্রচারের জন্য আবশ্যিক। দেবেন্দ্রনাথ পৌষমাসে একটি ব্রাহ্মমেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল —পরস্পরের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ, সদ্ভাব বৃদ্ধি ও ধর্ম বিষয়ে আলোচনা। এই কারণেই ১৭৬৭ সালের ৭ পৌষ পলতায় গোরিটি বাগানে এমন এক মেলা হয়।
কলকাতা থেকে আট নয়টা নৌকায় করে সব ব্রাহ্মকে নিজে নিয়ে গিয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। ভোরবেলা সূর্যোদয়ের পর ব্রহ্মের জয়ধ্বনি, গাছের ছায়ায় বসে ঈশ্বর উপাসনার মাধ্যমে শুদ্ধ হয়েছিলেন ব্রাহ্মরা। এই ছিল প্রথম ৭ পৌষের ইতিহাস। দেবেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের সন্ধান পাবেন আরো অনেক পরে,১৮৬২ সালে। হয়তো দেবেন্দ্রনাথের স্বপ্ন সফল করতেই তৈরি ছিল ছাতিমতলা — প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি। ১৮৮৮ সালের ৮ মার্চ মহর্ষির ট্রাস্ট ডিড তৈরি হয় এবং শান্তিনিকেতন আশ্রম সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। শান্তিনিকেতনের খরচ চালানোর জন্য তাঁর জমিদারির ১৮, ল৪৫২ টাকার সম্পত্তি নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। ওই ট্রাস্ট ডিডেই শান্তিনিকেতনে পৌষমেলা করার নির্দেশ ছিল “ধর্মভাব উদ্দীপনের জন্য ট্র্যাষ্টীগণ বর্ষে বর্ষে একটি মেলা বসাইবার চেষ্টা ও উদ্যোগ করিবেন। এই মেলাতে সকল ধর্মসম্প্রদায়ের সাধুপুরুষরা আসিয়া ধর্মবিচার ও ধর্মালাপ করিতে পারিবেন। এই মেলার উৎসবে কোনোপ্রকার পৌত্তলিক আরাধনা হইবে না ও কুৎসিত আমোদ উল্লাস হইতে পারিবে না। মদ মাংস ব্যতীত এই মেলায় সর্বপ্রকার দ্রব্যাদি খরিদ বিক্রয় করিতে পারিবে। যদি কালে এই মেলার দ্বারা কোনো রূপ আয় হয়, তবে ট্র্যাষ্টীগণ ঐ আয়ের টাকা মেলার কিংবা আশ্রমের উন্নতির জন্য ব্যয় করিবেন।” এই নির্দেশ মেনে শান্তিনিকেতনে পৌষমেলার আয়োজন হয় ১৮৯৪ সালে। তার আগে উপাসনা মন্দির স্থাপিত হয়েছিল। সেদিন ভোরবেলা ভুবনডাঙার আকাশ ভরে গিয়েছিল সঙ্কীর্তনে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবনাথ শাস্ত্রী, চিন্তামণি চট্টোপাধ্যায়, উমেশচন্দ্র দত্ত প্রমুখ ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্ররা সেদিন উপস্থিত ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলায়। সকলে এসে দাঁড়িয়েছিলেন মহর্ষির উপাসনা বেদির সামনে। বক্তৃতায়, গানে, আবেগে সেদিন আসলে এক ইতিহাস রচনা করছিলেন কোনো এক অদৃশ্য রচনাকার। এরপর ১৮৯৪ সালে ভুবনডাঙার আকাশের নিচে পসরা সাজিয়ে বসল পৌষমেলা। ছাতিমতলা আর মন্দিরের উত্তরের মাঠ—এই ছিল মেলা প্রাঙ্গণ। তবে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই মেলার কথা শুনলেও স্বচক্ষে দেখেননি। প্রথম দিকের পৌষমেলার আমেজই ছিল আলাদা। ঘণ্টার ধ্বনিতে প্রভাত হত। প্রার্থনা সংগীতে ভরাট হত তিনটি ভুবন। দরিদ্র মানুষকে ভোজ্য উৎসর্গ করা হত। চারিদিকে দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসে, হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান গান করে গাওয়া চলছে। সন্ধ্যা নামলেই আতশবাজির উৎসব। প্রথম পৌষমেলার জন্য নির্দিষ্ট হয়েছিল ১৭৩২ টাকা ১০ আনা।
আরও পড়ুন: লালমাটির ভুবনডাঙায় জাপানি ক্যাফে
রবীন্দ্রনাথ যে বছর ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন সে বছরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল পৌষমেলা। বাউলদের গান ও নাচ সেবার ভরাট করে রেখেছিল মেলা প্রাঙ্গণ। আশ্রমবাসীদের কাছে পরম পবিত্র পুণ্য দিন। নাগরদোলা, ঘোড়দৌড়ের মঞ্চ,পশুপাখির খেলা, তালপাতার টুপি, হাতপাখা, মুখোশ, মণ্ডা, মিঠাই পাঁপড়ভাজা, সাঁওতালদের নৃত্য, যাত্রার আসর—পৌষমেলার অলংকার ছিল। অনেকসময় সন্ধ্যার উপাসনায় সব কলরোল ছাপিয়ে ভেসে আসত রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে — ‘যো দেবোহগ্নৌ মন্ত্র’। রাতের বেলা আশ্রমের শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে বাজি পোড়ানো দেখতে যেত রতনকুঠির মাঠে। বাজির কারিগরদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হত। মেলা প্রাঙ্গণে সে এক নতুন উন্মাদনা। ফুল দিয়ে সেজে উঠত উপাসনাগৃহ। বেজে উঠত হরগৌরী রাগিনী। দুপুরবেলা যাত্রাগান শুরু হত। রাত গভীর হলেই বাজির উৎসব। ৮ পৌষ আশ্রমের প্রাক্তন ছাত্রদের উৎসব হত। ৯ পৌষ এক অন্যরকম দিন। আশ্রমের যেসব ছাত্র, অধ্যাপক, আশ্রমিক পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তাঁদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এই দিনটির উৎসব পালন হত। স্মরণ উৎসব।
রবীন্দ্রনাথ আজীবন এই মেলার সমৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। কোনো কোনোসময় বিদেশে থাকাকালীন মানসভ্রমণ করেছেন মেলা প্রাঙ্গণে। একবার শুধু শারীরিক অসুস্থতার কারণে শান্তিনিকেতনে থেকেও মেলায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। সেই নিয়ে তাঁর অনুশোচনাও ছিল। এরপর রবীন্দ্রনাথের তিরোধান, মন্বন্তর, দেশভাগ মেলার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। পৌষমেলা আবার জেগে ওঠে ১৯৪৭ সাল থেকে।
সময় গড়িয়ে চলে নিজের নিয়মে। শীতের কুয়াশার আড় ভেঙে নিয়ম করে ভুবনডাঙায় আজও বসে পৌষমেলা। বাউল, কীর্তনীয়ার দল গান গায় সহজিয়া সুরে। পসরা সাজায় দোকানিরা। লাল মাটির দেশে ভিড় জমায় সাধারণ মানুষ। এইসবের মধ্যেই রয়ে যায় অনেক বছর আগের এক আশ্চর্য মানুষ দেবেন্দ্রনাথের স্বপ্ন।
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়
ছবি সৌজন্যেঃ
পর্যটন বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার
