খরচ কমাতে তোপ বন্ধেরও নিদান হেঁকেছিল ইংরেজরা

কলকাতায় পা রাখার পরে লাভের চাইতে ক্ষতির মুখই বেশি দেখতে হয়েছিল লালমুখোদের

লর্ড ক্লাইভ তখন কলকাতার গভর্নর জেনারেল। কলকাতাও তখন লালমুখো ব্রিটিশদের বড়ো প্রিয় শহর। শহর জুড়ে কালো-কালো মানুষ, রোগ-অসুখ-বিসুখ-মহামারী, অস্বাস্থ্যকর জলবায়ু—তবু প্রিয়। এতটাই প্রিয়, যে শহরের নাম বদলে ‘আলিনগর’ করতেও রাজি হয়নি ব্রিটিশরা। এমনকি, মীরজাফরকে দিয়ে লিখিয়েও নিয়েছিল আলিনগরকে ‘ক্যালকাটা’ করতে তাঁর অমত নেই। পলাশীর যুদ্ধের খবর পাঠানোর চাইতেও ক্যালকাটা নাম বহাল রাখার খবরটা দেশে পাঠাতেই তাদের উৎসাহ ও উদ্যোগ ছিল বেশি। অথচ, কলকাতা বা ক্যালকাটা নাম কিন্তু ব্রিটিশদের দেওয়া নয়। তাহলে, শহরের নাম নিয়ে এমন স্পর্শকাতরতা কেন? সে বড়ো রহস্যময় প্রশ্ন। অবশ্য, নামের মধ্যেই মুনাফা মিশে থাকলে কে আর নাম বদল চায় বলুন? যাহোক, সে গপ্প পরে হবে’খন।

আপাতত নাম নয়, আমরা বরং খানিক দরদাম, খরচাপাতির হিসেব কষব। শুকনো হিসেব নয় কো মোটে। অনেকসময়, সংখ্যাতত্ত্বের ভিতরেও ইতিহাস ঘাপটি মেরে বসে মুচকি মুচকি হাসে তো। এই যেমন ধরা যাক, কলকাতার নতুন কেল্লা থুড়ি নতুন ফোর্ট উইলিয়ামের কথা। পলাশীর যুদ্ধের পর কেল্লা গড়ার কাজ শুরু হল। উদ্যোক্তা খোদ লর্ড ক্লাইভ। কাপ্তেন ব্রোহিয়ার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে। কেল্লা তৈরি করতে ইট লাগবে, ইট তৈরির লোকও লাগবে। তাই বিলেত থেকে লোক আনা হল ইট গড়ার জন্য। অথচ, তাদের অনেকেই খোদ গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে বেইমানি করে কোম্পানির কাজ ছেড়ে লেগে পড়ল স্থানীয় ধনকুবেরদের কাজে। শিল্পবিপ্লবের দেশের উন্নত শ্রমিক বলে কথা। এদিকে কেল্লা তো সময়মতো তৈরি করতেই হবে। তাহলে উপায়? হাজারো ঝামেলার পর এ দেশের গ্রাম-গঞ্জ থেকে দেশীয় শ্রমিকদের ধরে আনা হল। তাদের শ্রমেই ১৭৮১ সালে শেষ হল কেল্লার কাজ। অবশ্য, বিলিতি লেবাররা ভেগে যাওয়ায় আসলে ভালোই হল ব্রিটিশ-হুকুমতের। অনেকটা সস্তায় মিটল কাজ। এমনিতে, হাজার ইটের দাম তিন টাকা মোটে। একশো মণ জ্বালানির দাম দশ টাকার বেশি নয়। আর, দেশীয় শ্রমিকরা তো বিলিতি লেবারদের তুলনায় দেদার সস্তা। মাত্তর দশ পয়সা মজুরি মানুষগুলোর। খরচ কম হলে অনেক লাভ।

শাসন করতে গেলে কর্তার কেল্লা বা প্রাসাদ লাগবেই। কতকটা প্রয়োজনে, কতকটা ক্ষমতা-প্রতিপত্তি বোঝাতে। ওয়েলেসলি বলেছিলেন না, শাসন করতে হলে কুঁড়েঘর থেকে করলে চলবে না। তার জন্যে প্রাসাদ চাই। আর সেই বিনিয়োগটুকু তো করতেই হবে। এইসব বিনিয়োগ-খরচাপাতি উসুল করে নেওয়ার জন্যই তো কত ফন্দি-ফিকির-যুদ্ধ-দখল… অবশ্য যুদ্ধেও কম খরচ হয় না। এবং, ভাঁড়ারে টান পড়লে গোলা-বারুদেও রাশ টানতে হয়। ১৭৫৯ সালে, পলাশীর যুদ্ধের দুবছর পরেই যেমন হুকুম হয়েছিল—তোপের বদলে জয়ধ্বনি দেওয়ার। কারণ, বারুদ বাঁচাতে হবে। পলাশীর যুদ্ধে দেদার বারুদ, অর্থ ক্ষমতার ভোগে গেছে। সেই যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত লাভের কাঞ্চনমূল্য তখনো ইংরেজদের হস্তগত হয়নি। মানে, তখনো লসে রান চলছে। হয়তো পরে মেগা হিট হবে বিনিয়োগের ফল। কিন্তু, সে তো পরের কথা। আপাতত, খরচ কমানোই ভালো। তাছাড়া, দেদার বিনিয়োগের পরেও দীর্ঘদিন লাভের মুখ না দেখার কষ্টও কিন্তু হিসেবি ব্রিটিশরা ভালোই জানে। আর জানে বলেই, এই গোটা ভূখণ্ডকে গিলে, হজম করে, মুনাফা উগড়ে, সেটাকেও ফের গিলে, ফের হজম করতে তাদের অসুবিধে হয়নি।

১৬৯৮ সালে ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিম বার্ষিক তিন হাজার টাকার চুক্তিতে সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলকাতার জমিদারি স্বত্ব লিখে দিলেন ইংরেজদের। সাবর্ণ চৌধুরীরা খানিক আপত্তি জুড়লেন। ইংরেজরা তেরো হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁদের সঙ্গেও চুক্তি করল। অথচ, এই তিনখানা গাঁয়ের দখল পেতে তাদের নাকি মোট খরচ হয়েছিল তিরিশ হাজার টাকা। বাকি টাকা খরচ হয়েছিল মুগল সম্রাটের সম্মতিপত্র খরিদ করতে। নগদ খরচ নয় কিন্তু। উপঢৌকনের খরচ। সেকালের বিচারে নেহাত কম বিনিয়োগ কম নয়। এরপর ১৭১৫-তে মাত্র ৮,৮৩৬ টাকার বিনিময়ে ফারুখশায়ারের হাত থেকে হুগলীর দুই তীরের আটত্রিশটা গ্রামের অধিকার মিলল ইংরেজদের। জলের দরে বললে অত্যুক্তি হয় না। অথচ, হিসেবি লালমুখোরা এর আড়ালের খরচটিও লিখে রেখেছিল খুঁটিয়ে। এই অধিকার আদায়ের ভেট হিসেবেই খরচ হয়েছে ছেচল্লিশ হাজার টাকার উপহার। পরে দূতবাহিনীর সঙ্গে আরও তিরিশ হাজার পাউন্ডের উৎকোচ। তাছাড়া, আরো খরচ আছে। বাদশাহকে সঙ্গ দেওয়ার মূল্যও ধরা আছে। এছাড়া, বাৎসরিক খাজনা আছে। খাজনার সঙ্গে এগারোশো টাকার মোমবাতি, সাড়ে পাঁচশো টাকার আয়না, মোট তিন হাজার টাকার ভেট। সব মিলিয়ে টাকার অঙ্কটা দলিলে লেখা সংখ্যার চাইতে অনেকটাই বড়ো।

অথচ, এত এত খরচার পরেও ১৭০০ সালের গোড়ায় কলকাতা থেকে কোম্পানির মোট আদায় সাকুল্যে বারোশো টাকা। লাভের মুখ দেখতেই কেটে গেল বেশ কয়েক বছর। যেটুকু লাভ, সেটুকুও কোম্পানির অন্যান্য খরচাপাতির অগাধ জলে তলিয়ে যায়। শহর গড়ার খরচ, রাস্তা-ঘাট-অফিস। সঙ্গে কর্মীদের বেতন। রাজস্বের লাভ তখন অণুবীক্ষণ যন্ত্রেও দেখা যায় না।

এই বিপুল ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে তবেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থায়ী হয়েছে এই শহরে। সেই স্থায়ীত্বের গর্বিত ঘোষণার জন্য কেল্লা গড়া হয়েছে, লাট সাহেবের প্রাসাদ উঠেছে। বারুদের খরচ কমিয়ে, ঘড়ির দামের হিসেবও লিখে রাখা ব্রিটিশরা ক্রমশ গিলে নিয়েছে গোটা ভারত-ভূখণ্ডকে। সেখানে আরো কত যুদ্ধ, আরো কত উৎকোচ, আরো কত চুক্তি, আরো কত খরচ, বিনিয়োগ… এবং, সেইসব উসুল করেই কত কত মুনাফার সাম্রাজ্য।

খুঁটে খুঁটে হিসেব রেখে, ক্ষতির কুটির-বাস না করলে এমন সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হওয়া যায় না হয়তো। 

তথ্যসূত্রঃ 
C R Wilson, the buildings of the present Fort William, Calcutta Rivew, No-237, July, 1904
Ed. Foster William, English Factories in India

Developed by DXDasia