
আজ ২১ জুলাই
জরুরি অবস্থার পর, বা, বোফোর্স দুর্নীতির আভিযোগের ঝড়ের মুখে অতীতে একাধিকবার শাসকদলের বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছিল বিরোধী জোট। কোভিডে ব্যর্থতা, কৃষক আন্দোলন, পেগাসাস, রাফাল নিয়ে ফ্রান্সের নতুন করে তদন্ত, সব মিলিয়ে ফের কি বৃহত্তর বিরোধী মঞ্চের এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে?
শহিদ দিবস উপলক্ষে বুধবার ২১ জুলাই, তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভার্চুয়াল বক্তৃতায়, খুব স্পষ্ট ভাষায় সারা দেশের বিরোধী নেতা-নেত্রীদের উদ্দেশে কিন্তু সেই ডাকই দিলেন। প্রায় ক্লাস নেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘সময় বেশি নেই, আপনারা এখন থেকেই তৈরি হন ২০২৪-এর জন্য। বিজেপির মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লড়াই। শুধু ভোটের সময় চারটি ভাষণ দিয়ে এই যুদ্ধ জেতা যাবে না। এখন থেকেই মাঠে নামতে হবে। সবাইকে এক হতে হবে ব্যক্তিস্বার্থ ভুলে’।
আরও পড়ুন: তৃণমূল কংগ্রেসে তারুণ্যের অভিষেক
কারা শুনলেন? এদিন দিল্লিতে কনস্টিটিউশন ক্লাবে বড়ো স্ক্রিনে তাঁর কথা শুনতে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের পি চিদাম্বরম, এনসিপির শারদ পাওয়ার, সমাজবাদী পার্টির রামগোপাল যাদব। ছিলেন আপ, টিআরএস, আরজেডি, আকালি সহ প্রায় সব ক’টি বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীরা। সারা দেশের গুজরাট সহ বিভিন্ন শহরে জায়েন্ট স্ক্রিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এদিনের বক্তৃতা শুনেছেন নানা ভাষার মানুষ। ফলে এদিন তিনি তাঁর কথা মূলত বাংলায় বললেও, গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিন্দি এবং ইংরেজিতেও বলেছেন।
বিধানসভা ভোটে ২০০ আসন-প্রত্যাশী মোদী-শাহর স্বপ্নকে ৭৭-এ নামিয়ে তিনি যে এই লড়াইয়ে দু’পা এগিয়েই আছেন এবং তিনি যে এই লড়াইয়ে ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছেন, তা বুঝিয়ে দিয়ে মমতা বললেন, ‘আপনারা সামনের সপ্তাহে একটা বৈঠক ডাকুন দিল্লিতে। আমিও থাকব ওই সময় দিল্লিতে’। বললেন, ‘আপনারা আপনাদের দলে আলোচনা করুন কী করে একটা বিরোধী ফ্রন্ট গড়ে তোলা যায়। এই কাজ ফেলে রাখবেন না। এখনই সবাই মিলে শুরু করতে হবে’।
নেতৃত্বে কে থাকবেন? মমতার কথায়, ‘আপনাদের মধ্যে অনেক সিনিয়র নেতা আছেন, আপনারা এগিয়ে আসুন, দায়িত্ব নিন, আমি একজন কর্মীর মতো যে নির্দেশ আপনারা দেবেন, তা পালন করব’। এই কথার মধ্যে দিয়ে মমতা যদিও বুঝিয়ে দিলেন তিনি লক্ষ্য নিয়ে ভাবছেন, নেতৃত্ব নিয়ে নয়, তবুও আজকের বক্তৃতার মধ্যে একটা বিষয় স্পষ্ট ছিলই, বোঝা যাচ্ছিল, তাঁর মঞ্চটা উপস্থিত নেতা-নেত্রীদের থেকে একটু উঁচুই। প্রকাশ্যে এই ভাবে ফ্রন্ট তৈরির ডাক দেওয়ার ফলে বিরোধী সব দলের উপরেই বিজেপি সম্পর্কে, প্রস্তাবিত ফ্রন্ট সম্পর্কে, প্রকাশ্যে একটা অবস্থান নেওয়ারও দায় বর্তালো। এর মধ্যে দিয়ে, আড়ালে নয়, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইকে মানুষের চোখের সামনে এনে ফেললেন তৃণমূলনেত্রী।
বুধবার শহিদ দিবসের বক্তৃতায় ফোন-ট্যাপিং নিয়ে মমতা বলেন, ‘বিজেপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, বিরোধীদের উপর ‘স্পাইগিরি’ করছে। আমরা ভয়ে ফোনে কথা বলতে পারি না’। তিনি নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের ফোনের ক্যামেরা প্লাস্টার দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। সেই ফোন দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘দিল্লির সরকারকেও এই ভাবে প্লাস্টার দিয়ে মুড়ে দিতে হবে’। মমতা সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে আবেদন জানিয়ে বলেন, ‘বিচার ব্যবস্থাই পারে এই সংকটে গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দিতে’, তাই তাঁর আবেদন, মহামান্য প্রধান বিচারপতি ‘সুয়োমোটো’ পেগাসাস মামলা গ্রহণ করুন বা সুপ্রিম কোর্টের অধীনে তদন্তের ব্যবস্থা করুন।
আরও পড়ুন: বাংলার ভোটে বাঙালির ঐতিহাসিক ভূমিকা
এ বারের বিধানসভায় তৃণমূলের একটি স্লোগান ছিল ‘খেলা হবে’। মমতা বলেন, খেলা চলবে এবার সারা দেশ জুড়ে। যতক্ষণ পর্যন্ত না দেশ থেকে বিজেপিকে বিতাড়িত করা যাচ্ছে। তিনি ঘোষণা করেন, আগামী ১৬ অগস্ট হবে ‘খেলা দিবস’। প্রসঙ্গত, ১৯৯০-এর ১৬ আগস্ট সিপিএমের হাতে তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন হাজরার মোড়ে।
শহিদ দিবসের ভার্চুয়াল বক্তৃতায় দলের কর্মীদের উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘আন্দোলনে নেমে পড়ুন, পেট্রোপণ্যের আকাশ ছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে নিয়মিত মিছিল করুন। সৎ, কর্মঠ, সাহসী হন। মনকে সুন্দর, পবিত্র রাখুন। উন্নততর তৃণমূল গড়ে তুলুন। তাহলেই উন্নততর বাংলা গড়ে তোলা যাবে’।
