আমুদে বাঙালির জীবনচর্যায় ‘আম’-এর দাপট

আমের কথা এলেই মনে পড়বে কল্যাণী দত্তের “থোড় বড়ি খাড়া” বইটির কথা

ফলের রাজা আম। সেই আম নিয়ে আমুদে বাঙালির কতই না গপ্প-কেচ্ছা। বৈশাখ আসছে। কালবৈশাখীও আসছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ঋতু বৈচিত্র্য নিয়ে। আগে বলা হত ছয় ঋতুর মধ্যে একমাত্র হেমন্ত, যাকে চোখ দিয়ে দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়। হেমন্ত একটা ধূসর রঙের ঋতুর ডাকনাম। এখন কোথায় হেমন্ত! কোথায় বা বসন্ত! গ্রীষ্মপ্রধান দেশে সারাবছর গরম ছাড়া আর কীই বা দেখা যাবে। গরম বলতেই বাঙালির একবার হলেও মনে আসবে আমের নাম। আহা! সে কত কত নাম তার। ফজলি, গোপালভোগ, আম্রপালি, সুবর্ণরেখা, মিশ্রিদানা, বারোমাসি, তোতাপুরি, কারাবাউ, সূর্যপুরি, কলাবতী, অরুণা, খিরসা, মল্লিকা না জানি আরও কত কি। বৈশাখ মাসে আমের কথা এলেই মনে পড়ে কল্যাণী দত্তের “থোড় বড়ি খাড়া” বইটির কথা। যেখানে আম নিয়ে একটা দীর্ঘ অধ্যায় লিখেছেন লেখিকা।

কলকাতার মেয়েদের জীবনের যেসব খুঁটিনাটি লোকচক্ষের আড়ালেই থেকে গেছে, তার মধ্যে রয়ে গেছে সামাজিক ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। কল্যাণী দত্ত জনশ্রুতি, ব্যক্তিগত স্মৃতি, পুরোনো দুষ্প্রাপ্য বই থেকে সযত্নে সংগ্রহ করেছেন সেই সম্পদের একটা বিরাট আকর। শুধুমাত্র সম্পদের মূল্যেই নয়, তাঁর ভাষার সাবলীল আড্ডাধর্মী প্রসাদগুণেও মূর্ত হয়ে ওঠে এই শহরের এক প্রায় অজ্ঞাত ইতিহাস। কলকাতার আরেক ইতিহাসকার পূর্ণেন্দু পত্রী তাঁর ছবিতে আরও ভরাট করে তোলেন সেই ইতিহাসের পাতা। নিতান্ত সাধারণ গৃহস্থ ঘরের যে বিপুলসংখ্যক মেয়ে, তাঁদের বলবার মতো কথা অনেক ছিল। কিন্তু তাঁদের আঙুলে অক্ষর জোটেনি কখনও। তাঁদের কথা শুনে, অত্যন্ত কুশলতা ও বস্তুনিষ্ঠায় তা লিপিবদ্ধ হয়েছে এই বইয়ে।

সেসময় আম খাওয়া আর খাওয়ানো, দুই নিয়েই ছিল এলাহি ব্যাপার। কোনো বন্ধুর বাগানের আম জালতি দিয়ে পেড়ে ঘরে এনে পাতার শয্যায় শুইয়ে পাশ ফিরিয়ে ফিরিয়ে আমকে আরও সুস্বাদু করা হত। তুলোয় মোড়া চালানি আম থাকত শুধু জামাইদের জন্য। মেয়েরা আম কাটতেন বাঁখারি কিংবা নারকেলের ‘বালদোর’ ছুরি দিয়ে। কারণ লোহার ছুরি বা বঁটি দিয়ে কাটলে আমে দাগ ধরত এবং স্বাদ নাকি নষ্ট হয়ে যেত। বোঁটা কেটে মুখে গুনে গুনে চারটি দাগ দিয়ে ভেজানোর সময় মেয়েরা একনম্বর দুইনম্বর করে খোসার গায়ে চিহ্ন করে দিতেন। কলকাতার বড়োবাজারের ফলপট্টি থেকে শুরু করে বেলেঘাটা, বাগবাজার, ভবানীপুর, বকুলতলা অবধি নানা রঙের আম গড়াগড়ি খেত। এই বইটিতে এসে পড়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গ। কারণ রবি ঠাকুর যে কী পরিমাণে আমভক্ত ছিলেন, তা কম-বেশি আমরা অনেকেই জানি। তাঁর নানা চিঠিপত্র বা কবিতায় “বেতের ডালায় রেশমি রুমালটানা সোনার বরন আমের” সুবাস ছড়িয়ে আছে। আম খেতে এবং খাওয়াতে ভালোবাসতেন কবি ভারতচন্দ্র, ঈশ্বর গুপ্ত, হেমচন্দ্র; ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-সহ অনেক পণ্ডিত মানুষ। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এ সুন্দর বিয়ের পরে যখন কাঞ্চিপুরে ফিরে যেতে চাইলেন, তখন বিদ্যা বললেন, “জ্যৈষ্ঠ মাসে পাকা আম এ দেশে বিস্তর/ সুধা ফেলে খেতে আশা করে পুরন্দর।” এখানে যে আমার কথা বলা হয়েছে তা প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে কালীঘাট বাজারে আসত। রমরমিয়ে বিক্রি হত সেই আম।

কল্যাণী দত্ত লিখছেন, “গরমের দিনে যারা আম-দুধ খেতেন তাঁদের জন্যে কালো পাথরের ব্যবস্থা থাকত। মাংসের পাতে গুরুজনেরা আম খেতেন না। আম ছিল অনেকের জীবনে অন্যতম উপভোগ্য জিনিস। তাই থালাভরা আম ও ক্ষীর নিয়ে প্রাচীনরা কখনো বাজে কথা বলতেন না।” প্রবাদপ্রতিম নৃত্যশিল্পী উদয়শংকরের স্ত্রী অমলাশংকর যখন তাঁর বাবার সঙ্গে প্রথম বিদেশ যান, তখন একজন ফরাসি বৃদ্ধা তাঁকে শুকনো আমের আঁটি দেখিয়ে বলেছিলেন, “এই দেখ, তোমাদের ভারতবর্ষের ফলের বিচি, যার তুল্য ফল জীবনে আর খাইনি।”

বাঙালিরা কি আম খেতে ভুলে যাচ্ছি! ভুললে চলবে কী করে! আম আমাদের রক্ত মাংস মজ্জায়। আমুদে বাঙালি কিনা! ভারতবর্ষের প্রতিটা পরিবারতন্ত্রে আম বছরের পর বছর প্রতি গ্রীষ্মে রাজত্ব করে এসেছে। আগামী দিনেও যে এই রাজত্ব বজায় থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। 

গ্রন্থঋণ- থোড় বড়ি খাড়া (কল্যাণী দত্ত)
প্রথম সংস্করণ- ১৯৮২
প্রকাশক- থীমা
মুদ্রিত মূল্য- ২০০ টাকা

Developed by DXDasia