স্থানবদলের পর কেমন আছে বইমেলা

মেলা এবার সামান্য ছোটো হলেও সম্ভার কমেনি বিন্দুমাত্র

ইতিমধ্যে তিনদিন কেটে গেল ৪২তম কলকাতা পুস্তকমেলার। ঠাঁইনাড়া হয়ে মেলা এবছর এসে দাঁড়িয়েছে সেন্ট্রাল পার্কের আশ্রয়ে। সল্টলেকের মতো একটি সাজানো গোছানো জায়গায় যতটা শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে আশা করা যায় তার থেকেও বেশি শৃঙ্খলে চলছে এই মেলা। দু’পা অন্তর গেট এবং বেরোলেই বড় রাস্তা। মেলার মাঠের বাঁ-পাশ ঘেঁষে রয়েছে করুণাময়ী বাসস্ট্যাণ্ড। অঢেল বাস ছুটে চলেছে সারাদিন কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে। বর্ধমান বা সিউড়ির মতো দূরপাল্লার বাসও পাওয়া যায় এখান থেকে সারাবছর। যাতায়াতের দিক থেকে এই মেলা মিলনমেলাকে অন্তত দশগোল দিয়ে রেখেছে প্রথমেই। এছাড়া রয়েছেন অজস্র পুলিশ, যাঁরা মানুষকে বিব্রত নয়, বরং সাহায্য করছেন প্রাণপণ। এ এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী থাকছে কলকাতা। সল্টলেকের মতো একটি পরিমিত যানচলাচলের অঞ্চলে এমন বিশালাকৃতি জনসমাগম তিনদিনে কোনো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেনি সেভাবে।

এবার আসা যাক মেলার আসল অংশে, প্রসঙ্গে ফিরতে গেলে আমাদের একমাত্র সম্বল বই। তৃতীয়দিনের শেষে এসে এখনও মেলা গুছিয়ে উঠতে বেশ হিমশিম খেয়েছেন কর্তৃপক্ষ। প্রথমদিন সারাদিন চলে গেছে স্টল তৈরিতে, বাঁশ আর পেরেকের মধ্যে ঘুরেফিরে গেছেন হতাশ পাঠকেরা। দ্বিতীয়দিনের শেষেও কিছু স্টলে আলো জ্বলেনি। তৃতীয়দিনে এসে কাজ শেষ হয়েছে বলা চলে। এখনও সারা মাঠ জুড়ে পেরেক পড়ে আছে। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ মেলার প্রথম দুটো দিন জলে গেছে বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না হয়তো।

মেলার পরিবেশ মিলনমেলার থেকে অনেকাংশে সুন্দর। পাশে বিরাট জলা জমি এবং প্রচুর গাছপালা থাকায় একবারও মনে হবে না এই মেলা প্রাণহীন। 

একটি অনস্বীকার্য অসুবিধার বিষয় হচ্ছে ভিড়, যা একেবারেই পাওয়া যায়নি এই বছর। প্রথম তিনদিনে বিক্রির অবস্থাও ভীষণই দুর্বল অন্যবারের তুলনায়। লোক আসছেন, কিন্তু ভিড়ের হাতে বই থাকছে খুব কম। অথচ এমন নয় যে পৌঁছানো খুব অসুবিধাজনক এই মেলায়। 

এবারের মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, ভিস্যুয়াল মিডিয়ার স্টলে সেই কান ফাটানো চিৎকার গত তিনদিনে কানে আসেনি সেভাবে। বইয়ের বাইরে অন্যান্য দ্রব্যাদির আধিক্য নেই মেলায়। সরু একটি লম্বা ফালির এই জমিতে মেলাকে ভাগ করা হয়েছে চারটি জোনে। মণ্ডপগুলির ভিতর যথারীতি বেশ গুমোট হলেও তেমন ভিড় না হওয়ায় বেদনাদায়ক হয়ে ওঠেনি। 

লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ান এবার চারদিক খোলা। টেবিলের সাইজও বাড়ানো হয়েছে সামান্য। জায়গা ও ব্যবস্থা নিয়ে তাঁরা খুশি। যদি মিলনমেলাকে রেফারেন্স হিসাবে ধরি তবে কিছু সুবিধার দিক ও কিছু অসুবিধার দিক থেকেই যাচ্ছে এই মেলায়। যেমন সুবিধার দিক বলতে যাতায়াত ব্যবস্থা, আপনি এক ব্যাগ বই কেনার পর যখন টার্মিনাস থেকে বাসে উঠে একটা সিট দখল করে বাড়ি ফিরছেন তখন একবার মিলনমেলার থেকে ফেরার সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য মনে পড়বেই। অসুবিধার দিক বলতে সল্টলেক জনবসতিবহুল জায়গা না হওয়ায় এখানে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা সবটাই অফিসভিত্তিক এবং সীমিত। বইমেলার ভিতরের খাওয়া যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ। খাবার জলের ব্যবস্থা প্রতিবারের মতো এবারেও রয়েছে অঢেল। গেটে চেকিং-এর ব্যবস্থা কড়া হলেও তা বিরক্তিকর নয়। সমস্ত গেট দিয়ে ঢুকতে এবং বেরোতে দেওয়া হচ্ছে রাত অব্দি। ঘনঘন সিগনাল বন্ধ করিয়ে রাস্তা পার করাচ্ছেন পুলিশ। 

এই সবের পরেও কিছু থেকে যায় বাকি। পাঠক সমাগম। মেলা এবার স্কেলের মাপে সামান্য ছোটো হলেও সম্ভার কমেনি বিন্দুমাত্র। পাঠকের আশায় সেজে উঠেছে প্রতিটা স্টল প্রতিটা টেবিল। বহু ভালো ভালো বই এবছরের তালিকায় নাম তুলেছে নিজেদের। এছাড়া বইমেলার যে আন্তরিকতা তা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয়নি। সবই রয়েছে, আবার কিছু কিছু নেই এই মেলার কাছে। যেমন একজন মণীন্দ্র গুপ্ত নেই, নেই একজন রবিশংকর বল। তবু সব নিজের নিয়মেই চলে। চলছেও। আপাতত মেলা শান্ত হয়ে আছে, ঠিক যে স্তব্ধতা চোখে পড়ে বড় ঝড়ের আগের মুহূর্তে। আজ শনিবার, মেলার প্রথম ছুটির দিন, সপ্তাহান্তে এক বিরাট ঝড়ের অপেক্ষায় বসে রয়েছে ৪২তম কলকাতা পুস্তকমেলা। সমস্ত উদ্বেগের দেখা হয়ে যাক এই একফালি মাঠে।
 

Developed by DXDasia