১৯৫৩ সালে একটি দুর্ঘটনায় মারা যান ৫৩ জন
অনিরুদ্ধ মৈত্র
দমদমে বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা প্রায় ভুলেই গেছি সেই দুর্ঘটনাগুলো। কলকাতার সব থেকে বড় বিমান দুর্ঘটনা ২ মে, ১৯৫৩। ৪৩ জন মারা গিয়েছিল সেই সিঙ্গাপুর-লন্ডন ফ্লাইটে।
মাত্র ১০০০০ ফুট উপর দিয়ে যাচ্ছিল প্লেন। কালবৈশাখীতে শেষ। এই প্লেনটির যাওয়ার কথা ছিল কলকাতা থেকে দিল্লি, তার পর লন্ডন। এটা B.O.A.C এর কমেট প্লেন। B.O.A.C পরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েস এর সাথে এক হয়ে যায়। এই রুটটি ছিল প্রথম কমার্শিয়াল এয়ার রুট। কমেট এয়ার ক্রাফট ছিল পৃথিবীর প্রথম কমার্শিয়াল এয়ার ক্রাফট।
এর আগে সিঙ্গাপুর-লন্ডন ফ্লাইট ছিল ২ দিন আর ১২ ঘন্টার। এই নতুন কমেট এয়ার ক্রাফট সেই দূরত্ব কমিয়ে এনেছিল মাত্র ৩৬ ঘন্টায়। দূর প্রাচ্যের এটাই ছিল প্রথম B.O.A.C কমার্শিয়াল রুট।
তাই এই দুর্ঘটনা বেশ ঐতিহাসিক। প্রথমে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে দুর্ঘটনার কারণ খারাপ আকাশ আর পাইলটের ভুল। পরে, অনেক পরে ধরা পড়ে যে কমেট-এর ডিজাইনেই ক্রুটি ছিল। দমদমের দুর্ঘটনা কমেট প্লেনের কফিনের একটা পেরেক।
সেই দুর্ঘটনার খবর বেরিয়েছিল অনেকগুলো কাগজে। দেশ-বিদেশের অনেক কাগজের প্রথম পাতার খবর ছিল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ছাপিয়েছিল প্রথম পাতার প্রথম খবর হিসেবে।
না, কোনো ভারতীয় ছিলেন না সেই দিনের ফ্লাইটে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কলকাতা থেকে কারা উঠেছিলেন তাঁদের তালিকা দিয়েছিল। তাতে ১০ জনের নাম। সবাই ইউরোপিয়ান। বেশ বোঝা যায়, স্বাধীনতার ৭ বছর পরেও কলকাতায় ছিলেন অনেক ইউরোপিয়ান। এই কমার্শিয়াল রুটগুলো দমদম থেকে যে চলত হয়ত এই ইউরোপিয়ানদের জন্যই।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে যে প্লেনের টুকরো মিলেছে প্রায় ৬২ মাইল জায়গা ধরে। প্রায় মুর্শিদাবাদের কাছেও মিলেছে প্লেনের ধ্বংস হবার চিহ্ন। বিকেলেপ্লেন ছেড়েছিল প্রায় ৪টে ৩০ নাগাদ। ২ ঘন্টা ২০ মিনিট লাগত দিল্লি যেতে। রাত ৯টা ৩০ পর্যন্ত দিল্লিতে প্লেন না আসাতে শেষ পর্যন্ত শুরু হল খোঁজাখুজি।
প্রথম দিনের দুর্ঘটনার খবর কিন্তু পরের দিনেই চলে গেল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের দ্বিতীয় পাতার একটা কোণে। পরের দিনের খবরে দেখা যাচ্ছে একটা তদন্ত দল তৈরি হচ্ছে। ব্রিটিশ নিউজপেপার কী বলছে, তাও দিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
আরও পড়ুন
বরফমানব ওটজি আর কয়েকটি আশ্চর্য মৃত্যু
‘দ্য টেলিগ্রাফ’ বলছে, দুর্ঘটনা হলেও কমেট চালিয়ে যাওয়া উচিত। কমেট মানুষের উন্নতির একটা চিহ্ন। বিমান দুর্ঘটনায় সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জের ৪ জন মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের স্মৃতিতে ৪ মে সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জও অর্ধেক দিন বন্ধ ছিল।
পরের দিনের কাগজে বেরিয়েছিল ১৪ বছরের একটি ছেলের দুর্ঘটনা দেখার বিবরণ। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, সেই সঙ্গে কালবৈশাখীর প্রবল ঝড়। আচমকা একটা আগুনের গোলা নেমে এল সবুজ আমবাগানের উপর দিয়ে। পড়ল গিয়ে কাদামাখা মাঠের ভিতর। তখনও আজকের মতো উদ্ধারের ব্যবস্থা থাকলে হয়তো কিছু লোকের প্রাণরক্ষা হত। গ্রামের মানুষ চেষ্টা করেছিল কাদা ছুঁড়ে ছুঁড়ে আগুন বন্ধ করার। সেই দুর্ঘটনায় দমকল এসেছিল প্রায় ২৪ ঘণ্টা পরে। ততক্ষণে সবকিছু জ্বলে খাক।
রিপোর্ট বলছে, সেই প্লেনের প্রধান ধ্বংসাবশেষ মিলেছিল দমদম থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে একটা নালাতে। এছাড়াও সেই ৩১ পাতার বিস্তারিত রিপোর্টে রয়েছে ম্যাপ, যাত্রীদের নাম, প্লেনের দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ। ম্যাপ দেখে মনে হচ্ছে আজকের সন্তোষপুরের কাছ থেকেই প্লেনের টুকরো পাওয়া গিয়েছিল। এই রিপোর্টে আরো মিলবে পাইলটের এক্সপেরিয়েন্স রেকর্ড।
তবে দমদমে বিমান দুর্ঘটনা আরো আছে। ১৯৫১ সালের ২২ নভেম্বর। শীত পড়ছে। কলকাতায় আজকের মত সেদিনও হত কুয়াশা। ১৭ জন যাত্রী নিয়ে পাইলট দমদমে নামতে গিয়ে ভুল করে নামল মানিকতলাতে। মানিকতলা তখন গ্রাম। প্লেন গ্রামের মাঠে গিয়ে ধাক্কা খেল। একজন যাত্রী ছাড়া সবাই মারা গেলেন।
এই সব ঘটনাগুলোই বিমান দুর্ঘটনা। একটা জিনিস সবক’টি ঘটনাকে যোগ করে রেখেছে – সবগুলোই দমদম বিমানবন্দর বা দমদমের চারপাশে ঘটা। এই লিস্টের কিছু কিছু নিয়েই আলোচনা করা যাক। তখনকার কাগজ কী কী বলেছে তা দেখা যাক।
জুন ১২, ১৯৬৮। এই প্লেন আসছিল ব্যাংকক থেকে। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের কথা ঠিক বুঝতে পারেনি। প্লেন দমদমে নামার ঠিক আগে ধাক্কা মারে একটা গাছে।
এর ২ বছর পরের ঘটনা। এটিই বোধ হয় দমদমের কাছে ঘটা শেষ দুর্ঘটনা। রাশিয়ান প্লেন আসছিল ঢাকা থেকে। সাইক্লোন হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে এর কিছু দিন আগেই। রাশিয়ান প্লেন সেই সাইক্লোনের রিলিফ পৌঁছাতে গিয়েছিল। আগুন ধরে গিয়েছিল। এই প্লেনটা শেষ চেষ্টা করেছিল পানাগড়ে নামার। দুর্ভাগ্য। শেষ রক্ষা হল না। ১৭ জন যাত্রীর মধ্যে থেকে বাঁচেননি একজনও।;
(ঋণ – কলকাতারইতিহাস ডট ব্লগস্পট ডট ইন)