
আমেরিকাবাসী এই দুই শিল্পী আমেরিকা থেকে উত্তরবঙ্গে এসে শুরু করেছেন শিবির
একজনের আমেরিকার লস এঞ্জেলসে বিয়ে হয়েছে ৩৪ বছর। আরেকজনের বাবা-মা এই বাংলার হলেও এখন থাকেন আমেরিকায়, তবে তাঁর জন্ম আমেরিকাতেই। একজন গুরু, আরেকজন শিষ্যা। এই দুই অনাবাসী ভারতীয় নৃত্যশিল্পী ও গুরুশিষ্যা এখন উত্তরবঙ্গে। তাঁরা উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া চা বাগানের আদিবাসীদের মধ্যে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য শিবির শুরু করেছেন। বছরে একবার করে সুদূর আমেরিকা থেকে দেশের টানে উত্তরবঙ্গে এসে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য আরও বেশি করে ছড়িয়ে দিতে চাইছেন তাঁরা।

প্রাচী দীক্ষিত ও সোনিয়া চৌধুরী। প্রাচীর বাড়ি আগ্রায়। সেখান থেকেই তাঁর ছোটবেলায় কত্থক ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের ঝোঁক বাড়ে। এরপর বিয়ে হয়ে ৩৪ বছর আগে চলে যান আমেরিকায়। বিদেশের মাটিতে স্বামী সংসার করার পাশাপাশি ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের নেশা ছাড়তে পারেননি। খুলে বসেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য শিক্ষা কেন্দ্র। আর সেই শিক্ষা কেন্দ্রে অনাবাসী ভারতীয়রা ছাড়াও আমেরিকার বাসিন্দা নতুন প্রজন্ম থেকে শুরু করে জাপান, মেক্সিকো সহ পৃথিবীর অন্য দেশের মানুষেরাও নৃত্য শিখছেন। আনে নামে আমেরিকার একজন তো তার কাছ থেকে ভারতীয় নৃত্যকলা শিখে ফ্লোরিডাতে একটি নৃত্য শিক্ষা কেন্দ্র খুলেছেন। পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি ছেড়ে আমেরিকানদের একটা অংশের মধ্যে যেভাবে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে তাতে অবাক প্রাচী দীক্ষিত।
এই সময়ে প্রাচী দীক্ষিতের সঙ্গে উত্তরবঙ্গে আসা তাঁর শিষ্যা, নৃত্যশিল্পী সোনিয়া চৌধুরীও রয়েছেন। আমেরিকাতেই জন্ম সোনিয়ার। আট বছর বয়স থেকে গুরু প্রাচীর কাছে নাচের তালিম শুরু তাঁর। এখন গুরু শিষ্যা মিলে আমেরিকায় আলাদা আলাদাভাবে নাচের স্কুল খুলে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রচার শুরু করেছেন। দুজনের কাছে একশোর বেশি ছাত্রছাত্রী নাচ শেখেন। এর কুড়ি শতাংশ বিদেশি।
আরও পড়ুন
চা শ্রমিক থেকে নৃত্যশিল্পী
শিলিগুড়ি মাটিগাড়ায় সঙ্গীত কলা আকাদেমি ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য, সঙ্গীত, তবলা প্রভৃতি নিয়ে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে রবিবার। সেখানে অনেক চা বাগানের আদিবাসী শিল্পী থাকবেন। তাদের মধ্যে ঐ দুই অনাবাসী ভারতীয় শিল্পী কিছু নৃত্যের দিক মেলে ধরবেন। তাঁদের কথায়, আমেরিকার বাসিন্দাদের মধ্যে দিনকে দিন ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য ও সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি, তাঁদের নিজেদের পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির প্রতি কমছে আগ্রহ। অথচ ভারতীয় নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাশ্চাত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এটা ভাল দিক নয়। ভারতীয় সংস্কৃতি মূল্যবোধের কথা বলে। ভারতীয় সংস্কৃতি সুস্থ জীবনবোধ বা রুচির কথা বলে।
উত্তরবঙ্গের চা বাগানে আদিবাসীদের মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতি আরও বেশি করে ছড়াতে চান প্রাচী ও সোনিয়া। তাঁরা বলতে চান, বিদেশিরাও যখন ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য বা সংস্কৃতি গ্রহণ করছে, খাস ভারতীয়রা কেন তাদের ঐতিহ্য ছেড়ে দেবে? আগ্রায় প্রাচীন কলা কেন্দ্রে শুরু হয়েছে তাজ মহোৎসব। সেই উপলক্ষেই তাঁদের এবার ভারতে আসা। আর আগ্রা থেকেই কদিনের জন্য তাঁরা উত্তরবঙ্গে এসেছেন। স্থানীয় বিখ্যাত তবলা শিল্পী সুবীর অধিকারী তাঁর সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে রয়েছেন সঙ্গীত শিল্পী পিন্টু অধিকারী।

উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত আদিবাসী নৃত্য শিল্পী তথা চা শ্রমিকের কন্যা সুচিতা কুজুর জানান, ঐ দুই অনাবাসী ভারতীয় নৃত্য শিল্পী যেভাবে উত্তরবঙ্গে এসে আদিবাসীদের মধ্যে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য প্রচারের কাজে নামছেন তাতে তিনি বেশ খুশি। তাঁর তরফে কোনো সহযোগিতার দরকার হলে তিনি আছেন। তবলা শিল্পী সুবীর অধিকারীও বলেন, তিনি ভবিষ্যতে ঐ দুই শিল্পীর মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া আদিবাসী ও জনজাতিদের মধ্যে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংস্কৃতি প্রচারের শিবির করতে সহযোগিতা করতে চান। ঐ দুই শিল্পী জানান, নৃত্যচর্চা শুধু মনকে ভালই রাখে না, অনেক স্ট্রেস দূর করতেও সাহায্য করে।
