
যুগলস্ আয়োজিত এই উৎসবে রকমারি মিষ্টির পাশাপাশি থাকবে বাংলার মিষ্টির ইতিহাস
খাওয়ার শুরুটা শাক-শুক্তো অথবা মাছ-মাংস দিয়ে হলেও শেষটা হয় সেই মিষ্টিমুখেই। গোটা বাংলা জুড়ে রয়েছে নানান সব মিষ্টির ইতিহাস। কলকাতা জুড়ে রয়েছে প্রাচীন সব মিষ্টির দোকানের সন্ধান। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সবুজ মাঠ ছেড়ে আপনার মন যদি বাংলার সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং রন্ধনপ্রণালীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়, বুঝতে নিতে হবে চমৎকার কিছু ঘটতে চলেছে। হ্যাঁ, বাংলার মিষ্টি নিয়ে বিশ্বে এই প্রথম ‘লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল’ শুরু হতে চলেছে কলকাতায়। নক্ষত্রখচিত এই সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করেছে যুগলস্।
তিনদিন ব্যাপী এই উৎসবটি অনুষ্ঠিত হবে ৯ থেকে ১১ ডিসেম্বর। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভারতের বাইরে অন্যান্য দেশে বসবাসকারী বাঙালিদের জন্যও ‘মিষ্টি’ যে ডিএনএর একটি অংশ হয়ে উঠেছে, সেকথাও আলোচিত হবে। আজকের বাহারি মিষ্টি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গার বিখ্যাত সব মিষ্টির গল্প এমনকি বাংলার প্রথম মিষ্টি তৈরির ইতিহাস, সবকিছু নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হবে এই অনুষ্ঠানে।
আরও পড়ুন: বাংলার মিষ্টির ইতিউতি
বাংলার মিষ্টির ইতিহাস আজকের নয়। প্রায় কয়েকশো বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যের গন্ধ রয়েছে। অতীতে বাংলার মিষ্টির মূল উপকরণ, ছানার প্রছলন শুরু হয় পর্তুগিজদের হাত ধরে। বাংলার মিষ্টি তৈরিতে ব্যবহৃত ছানা তৈরি করা শিখিয়েছিল পর্তুগিজরাই। মিষ্টি নিয়ে রয়েছে এরকম বিস্তর গল্পগাথা। ডিসেম্বরের ‘লিট ফেস্ট’ সেই গল্পগুলোকেই আবার উস্কে দিয়ে যাবে এ কথা হলফ করে বলা যায়। এই ফেস্টে বিশ্বব্যাপী কলকাতাবাসীদের পাশাপাশি ইতিহাসবিদ, খাদ্য অনুরাগী, সিনেমা ও থিয়েটার জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গেরও সমাগম হবে বলে জানা গিয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী বাড়ি থেকে শুরু করে আর্ট গ্যালারি এবং আধুনিক প্রতিষ্ঠান সব মিলিয়ে মোট ১০টি জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে মিষ্টির উৎসবটি। জানা গিয়েছে, ৬০টিরও বেশি আলাদা আলাদা ধরনের মিষ্টি পরিবেশন করা হবে এই উৎসবে। এ অনুষ্ঠান যে বিশ্বের ইতিহাসেও রেকর্ড গড়বে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। আকর্ষণীয় উৎসবটির ভাবনা প্রথম এসেছিল যে মানুষটির মাথায়, তাঁর নাম লহনা ঘোষ। ৩০ বছর বয়সী লহনা বাংলার মিষ্টি শিল্পকে ভালোবেসে বিদেশের আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন কলকাতায়। শিকড়ের টানকে বাঙালির মধ্যে জাগিয়ে তুলতেই এই অভিনব পদক্ষেপের কথা ভাবেন।

ইতিমধ্যেই লহনা বাংলার মহিলাদের নিয়ে তৈরি করেছেন মিষ্টি তৈরির রান্নাঘর। তাঁর উদ্যোগেই বাংলার মাটিতে পথ চলা শুরু হয়েছে সর্বপ্রথম মহিলা চালিত মিষ্টির হেঁশেল। এতদিন যাবৎ ময়রা বলতে আমাদের ধারণা ছিল একজন পুরুষ। সেই প্রচলিত ধারণাকেই ভেঙ্গে ফেললেন তিনি। শিল্পের ওপর থেকে একচেটিয়া পুরুষ আধিপত্যকে সরিয়ে দিয়ে ছক ভাঙলেন লহনা।
কলকাতার বিখ্যাত শতাব্দী প্রাচীন মিষ্টির দোকান যুগলস্-এর কর্ণধার যুগল কিশোর ঘোষ হলেন লহনার ঘোষের দাদু। বর্তমানে কলকাতায় রয়েছে ২ লক্ষেরও বেশি মিষ্টির দোকান, এ উৎসবে মেলবন্ধন ঘটবে গোটা ময়রা সমাজের। জানা যাচ্ছে, উৎসবটিতে মিষ্টিকে ঘিরে আলোচনায় উঠে আসবে বিভিন্ন লোককাহিনি, চলচ্চিত্র, গল্প, বই ইত্যাদি।
মিষ্টি নিয়ে ভাগাভাগি হবে নানা তথ্য। যেমন ধরুন, ‘প্রদোষ চন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদার প্রিয় মিষ্টি কী?’ –এর উত্তরে উঠে আসবে মিহিদানার কথা। অথবা সত্যজিৎ রায়-এর লেখা ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ কোন মিষ্টির উল্লেখ ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরে, ‘বেনারসের কচোরি গলিতে হনুমান হালুইকরের রাবড়ি’র স্মৃতি উস্কে যাবে। জানা যাবে আরও অনেক অজানা কথা। ১৬ শতকে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখা চণ্ডীমঙ্গল বইটিতেই যে প্রথম রাবড়ির উল্লেখ করা হয়েছিল, জানা যাবে সে কথাও। এমনকি চণ্ডীমঙ্গলের প্রথম লিখিত উল্লেখ যে মোহাম্মদ-বিন-হাসান-আল-বাগদাদির লেখা ১৩ শতকের রান্নার বইটিতে ছিল, এসব নানা আলোচনা উঠে আসবে এই অনুষ্ঠানে। ফলে, এ উৎসব যে প্রকৃতপক্ষে শিক্ষণীয় হতে চলেছে তা বলতেই হচ্ছে।

লহনা ঘোষ বলেন, “এটি কেবল মিষ্টি নিয়ে বিশ্বের প্রথম সাহিত্য উৎসবই নয়, খাবার নিয়েও এটিই প্রথম সাহিত্য উৎসব। খাবারই একমাত্র মাধ্যম যেখানে কোনো বৈষম্য নেই। একজন আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ লোক যেমন ভারতীয় খাবার উপভোগ করেন ঠিক তেমন একজন কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয় লোকও বার্গার এবং ফ্রাই-এর স্বাদে দিব্যি মজে যান। ধরুন, আমরা যখন জমিয়ে বিরিয়ানি খাই, তখন কি আমরা খাবারের উৎপত্তি, বা যিনি এটি তৈরি করেছেন তার ধর্ম দেখতে যাই? নিশ্চয়ই না। ইতিহাস, ধর্মীয় প্রভাব, অথবা যিনি এটি তৈরি করেছেন তাঁর সম্প্রদায় বিবেচনা করে আমরা কখনোই খাবার খেতে দ্বিধা করি না।” উৎসবের লক্ষ্য হল বিভিন্ন সংস্কৃতি কীভাবে আমাদের খাদ্যের উপর প্রভাব ফেলেছে এবং আমরা বিনা অভিযোগে কীভাবে আমাদের খাবারে সেই প্রভাবগুলিকে গ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্ত করেছি সে সম্পর্কে একটি কথোপকথন শুরু করা। লহনা ঘোষ আরও বলেন, “খাবারই পারে একটি অবিভক্ত সমাজ গঠনে সাহায্য করতে”।
হলিউডের প্রিয় শেফ আসমা সাইদ খান, ভারতের একমাত্র মহিলা পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও, যিনি পাকিস্তান, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন, বিশ্বের শ্রদ্ধেয় খাদ্য নৃতত্ত্ববিদ এবং কানাডিয়ান লেখক ডক্টর কলিন টেলর সেন, পদ্মশ্রী ইতিহাসবিদ পুষ্পেশ পান্ত সহ বিশ্ব তারকাদের একটি মিলনস্থল হয়ে উঠবে এই উৎসব। এছাড়াও এ উৎসবে ভারতের ইতিহাস, সাহিত্য এবং লোককাহিনিতে মিষ্টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর কুনাল বসু, সুইডেনে ইন্ডিয়া ফেস্টিভ্যালের প্রতিষ্ঠাতা সঞ্জু মালহোত্রা, শিল্পী যোগেন চৌধুরী, এমপি জওহর সরকার প্রমুখ।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মালপোয়ার প্রাচীন ইতিহাসের গল্প। চিনির সিরায় ভেজানো এই ভাজা মিষ্টিটির পথ চলা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৩৫০০ বছর আগে। ঋক বেদে এটিকে বলা হতো ‘অপুপা’। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, অপুপা আরও অনেক সাংস্কৃতিক প্রভাবকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। ডিম এবং মাওয়া সহযোগে এই মিষ্টির একটি ভিন্ন সংস্করণ ইসলামিদের জনপ্রিয় মিষ্টি হিসেবে প্রচলিত ছিল। এমনকি পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরে ভোরবেলার ভোগ হিসেবে এখনও মালপোয়ার বিকল্প কিছু নেই।
ফেস্টিভ্যালের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ঐন্দ্রিলা রায় কাপুর বলেন, “এই উৎসবে আমি কলকাতার আসল নির্যাস ব্যবহার করতে চলেছি – উৎসবে ডিজাইনের ক্ষেত্রে রয়েছে সেই স্বাধীনতা। আমরা যেমন চিন্তায়, ধারণায়, প্রতিবাদে স্বাধীনতার উদযাপন করি, ঠিক তেমনই শিল্পকলার ক্ষেত্রেও উদার চিন্তাভাবনার প্রভাব থাকা বাঞ্ছনীয়। সে শিল্প, সাহিত্য হোক বা সিনেমা অথবা থিয়েটার। আমি এই উৎসবের নেপথ্যে কলকাতার পটভূমিকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। কলকাতার স্থাপত্য, ইতিহাসের পুরোনো দুর্গ থেকে আধুনিক স্থাপত্যের বিস্ময় সবকিছুকে নিয়ে সাজিয়ে তুলবো এই উৎসবটি।” পাশাপাশি জানা যাচ্ছে, এই অভিনব উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন বিশ্ববিখ্যাত ফটোগ্রাফার ও সংবাদকর্মী কৌন্তেয়া সিনহা, এই উৎসবের অন্যতম একজন পরিচালক।
মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ক্লিক করুন।
