
বৌদির দুধের শিশুটা মরে গেল গলায় দুধ আটকে আর সেজদির মেয়ে গেল অপুষ্টিতে
আমরা উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতায় আসিনি, কিন্তু আমাদের আত্মীয়-স্বজন অনেকেই তখন উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতায় এসে ভিড় করছে। তাদের কেউ কেউ শিয়ালদা স্টেশনে ঠাঁই নিয়েছে, কেউ আবার নানা ক্যাম্পে আশ্রয় পেয়েছে। উদ্বাস্তুদের ভিড়ে কলকাতা তখন গিজগিজ করছে। সন্ধে হতে না হতেই কলকাতার অনেক ফুটপাতই দেশহারা, ঘর-বাড়ি-হারা মানুষদের অধিকারে চলে যেত। ভোরে কর্পোরেশনের কর্মচারীরা হোসপাইপ দিয়ে যখন রাস্তা ধুতে শুরু করত, তখন বাধ্য হয়ে ঐ মানুষগুলো রাতের শয্যা গুটিয়ে কলকাতা শহরের ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে যেত।
মাঝেমাঝেই শহর দাঁপিয়ে উদ্বাস্তুদের মিছিল বের হত। সেই মিছিল থেকে স্লোগান উঠত- ‘আমরা কারা? বাস্তুহারা!’, ‘বাস্তুহারা করল কারা? গদিতে বসে আছে যারা।’ মিছিল কখনও কখনও জঙ্গি চেহারা নিত আর সেই জঙ্গিরূপকে দমন করতে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত পুলিশ। এই ছিল তখনকার কলকাতার অধিকাংশ দিনের চেহারা।
সেই উদ্বাস্তু আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেই আমাদের বাড়িতে এসে ভিড় করত। দাদা-বৌদিকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে এইসময়ে। একে দাদার নিজেরই রোজগার বেশি না। থাকার মধ্যে একচিলতে ঘর। সেখানেই কোনমতে মাথা গুঁজে, ভরপেট না খেয়ে থাকা। সেই আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে বৌদির ভাই ও দিদির ছেলেমেয়েরাই ছিল সংখ্যার দিক থেকে বেশি। দাদা এদের কাউকেই নিরাশ করত না। দাদার দুই শালা তো দীর্ঘদিন আমাদের ঘরের স্থায়ী বাসিন্দায় পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীকালে, তাদের বাড়ি গড়ে দেওয়া থেকে শুরু করে বিয়ে-থা দেওয়া পর্যন্ত দাদা তাঁর জামাইবাবুর ভূমিকা পালন করে গেছে হাসিমুখে।
বাজারে তখন চালের ভীষণ অভাব। রেশনেও চালের সরবরাহ নেই। আমাদের গম ভাঙিয়ে আটা-রুটি দিয়েই প্রায় দু’বেলা খিদে মেটাতে হয়। এর মধ্যেই বৌদির বাচ্চা হল। প্রসব হয়েছিল মেডিকেল কলেজে। বাচ্চাকে বাড়ি নিয়ে আসবে জেনে আমার আর ছোটদির আনন্দ দেখে কে! দাদা আগের দিন ছোটো ছোটো বালিশ, কোলবালিশ, মশারি কিনে আনল। দাদার চোখেমুখ থেকে আনন্দ ছিটকে বেরোচ্ছে। কিন্তু, পরেরদিনই বদলে গেল সবটা। দাদা বৌদিকে নিয়ে বাড়ি এল। সঙ্গে কাপড়-জড়ানো একটা মরা বাচ্চা! বুকের দুধ খাওয়াতে গিয়ে বৌদি ঠিকমতো খাওয়াতে না পারায় গলায় দুধ আটকে নাকি বাচ্চাটা মারা গেছে। বৌদির ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না, দাদারও চোখে জল। আমার আর ছোটদির কান্না তখন থামছেই না।
কিছুদিনের মধ্যে সেজদি আর সেজজামাইবাবু তাদের বছর তিনেকের মেয়েটাকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসে উঠল। জামাইবাবু পানিহাটির বেঙ্গল কেমিকেলস কারখানায় কাজ করতেন। সেখানে প্রচুর শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। জামাইবাবুও তাদের মধ্যে একজন। ছাঁটাইয়ের খবরটা এতদিন গোপনই রেখেছিলেন। কিন্তু, এই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে সংসার আর চালাতে না পেরে বাধ্য হয়েই এখানে এসে উঠেছেন। দাদা বললে, ‘থাকো এইখানে, আর কী করা যাইবো। একটা কাজকম্মের চেষ্টা করো! আমিও দেখি, কিছু করা যায় কিনা!’
জামাইবাবুর সেই সময়ের অবস্থাটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। চেহারা শুকিয়ে কাঠ। লজ্জায় চোখ তুলে কারও দিকে তাকাতে পারেন না। কাজের খোঁজে সকালে ঘুম থেকে উঠে সকলের সঙ্গে এক কাপ চা ও দুটি আটার রুটি খেয়ে বেরিয়ে যান। রাত দশটা-সাড়ে দশটা নাগাদ মাথা নিচু করে ঘরে ঢোকেন। হাতমুখ ধুয়ে দুটো রুটি চিবিয়ে শুয়ে পড়েন। বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন। সেজদির অবস্থা তো চোখে দেখা যায় না।
এরই মধ্যে সেজদির মেয়েটা অসুখে পড়ল। জামাইবাবুর দাদা সকলকে নিয়ে গেলেন তালতলায় নিজের ভাড়া বাড়িতে। মেয়েটাকে ডাক্তার দেখানো হল। ডাক্তার রায় দিলেন—পুষ্টির অভাবে অবস্থা শেষ পর্যায়ে। এখন আর কিছু করার নেই।
দাদা একদিন রাতে বাড়ি ফিরে বৌদিকে চিৎকার করে বলল- ‘শুনছ, সন্তোষবাবুর লগে ট্রাম কোম্পানিতে একটা চাকরির বন্দোবস্ত কইর্যা আইলাম!’ সন্তোষ আমার সেজজামাইবাবুর নাম।
বৌদির চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দাদাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘সত্যি কইতাছো তো?’
দাদা বললে– ‘হা না তো মিছা নাকি? আমাগো ওষুধের দোকানে ট্রাম কোম্পানির এক বড়ো বাবু নিত্যি ওষুধ কিনতে আসে। ওর কাছেই সন্তোষবাবুর কাজের জন্য দরবার করেছিলাম। আইজ তিনি আমার হাতে এই কাগজখান ধরাইয়্যা দিয়া কইছেন: শীঘ্রই আপনার ভগ্নিপতিকে আমাদের পার্ক সার্কাস ডিপোয় এই কাগজখানা নিয়ে দেখা করতে বলবেন। ট্রাম কন্ডাক্টরের চাকরি।’
পরের দিন দাদা কাগজখানা নিয়ে জামাইবাবুর দাদার বাড়ি গিয়ে দেখেন, চারদিক থমথমে। কেমন যেন নিশ্চুপ!
সেজদি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দাদাকে দেখেই হাউহাউ করে কেঁদে উঠল দাদাকে জড়িয়ে ধরে। ‘স্বপ্নাকে আর বাঁচানো গেল না রে দাদা!’
চোখের জল সামলে দাদা কোনও মতে জিজ্ঞেস করতে পেরেছিল, ‘সন্তোষবাবু কই?’ দিদি তখন ঘরের জানলা দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আকাশের দিকে। ‘কাজের ধান্দায় হেই হক্কালেই বাইরাই গ্যাছে। কহন আইবো কে জানে!’
দাদা সেজদির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে, ‘কান্দিস না, কান্দিস না! সন্তোষবাবুর একটা কাজের জোগাড় কইর্যা আইছি। এই কাগজখান উনি বাড়ি আইলেই হাতে দিয়া বলবি—কাইলই যেন আমার সঙ্গে দেখা করেন।
দিদি তখনও কেঁদেই চলেছে। বুকে দুরমুশ-করা শোক। দাদাও আটকে রাখতে পারছে না চোখের জল। দুই ভাই-বোনের চোখের জলে ঘরের মেজেতে ভাঙা দেশের একটা মানচিত্র আঁকা হয়ে যায়।
(ক্রমশ)
