শীতের নরম আলোয় বো ব্যারাক আর নারকেল প্যাটির গল্প

বছরটা শেষ হয়ে এল, কৃষকদের জিতে যাওয়ার বছর, আর রইল শীতের সন্ধেয় বো ব্যারাক

একটা গান শুনতে শুনতে যেমন অন্য একটা গানের কাছে চলে যাই, সেই গানের সঙ্গে মিশে থাকা স্মৃতি ভিড় করে আসে, ঠিক তেমন হয় খাবারের ক্ষেত্রেও। বছরের এই সময়টায় বো ব্যারাককে বেশ সুন্দর লাগে৷ এখনও ভিড় কম, টুপটাপ আলো, লাল বাড়িগুলোর সামনের রোয়াকে স্থানীয়রা সেজেগুজে গল্প করছেন৷ চারদিক আলো আলো, শান্ত, নরম। বড়ুয়ার দোকানে ছানার কেক কিনে শুনলাম, চিকেন প্যাটি শেষ, তবে আমি চাইলে নারকেলের প্যাটি খেতে পারি৷ বড়ুয়ার সবকিছুরই বড্ড কম দাম, আর বেশ খেতে৷ আমি এর আগে নারকেল প্যাটি খেয়েছি খুব কম। নিলাম৷ মুচমুচে, গরম, মিষ্টি মিষ্টি… কী যে ভালো লাগল!

বো ব্যারাকে গেলে পুরোনো আলাপিদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় মাঝে মাঝে৷ তাদের কত রকম পেশা! খোঁচর, দালাল, দাঁতের ডাক্তার, ফুটবল কোচ, মাস্টারমশাই, ছোটো দোকানদার৷ সে সব গল্পে ভাসতে ভাসতে অনিবার্য ফিয়ার্স লেনে, না গিয়ে উপায় নেই, একশো বছরের অ্যাডামসের সুতা কাবাব অপেক্ষা করে আছে। বন্ধুদের সঙ্গে কথায় কথায় মেঘ করে আসে, মেঘ কেটে যায়। চারপাশ তো খুব সুবিধের নয় নিশ্চয়, তা বলে মুখ গোমড়া করে থাকলেই বা চলবে কেন? এই আশ্চর্য শহর, আমাদের শহর, এখনও পুরোপুরি বেহাত বা হয়ে যাওয়া কলকাতা সব মনখারাপ শুষে নেয়। কোনও না কোনওভাবে ঠিক আলো জ্বলে ওঠে টানেলের শেষ। হাঁটা না থামালেই হল…

কলুটোলা থেকে ফের পথে দুম করে মনে পড়ল হায়দ্রাবাদের গ্র্যান্ড হোটেলের কথা। মনে পড়ল মানে একদম কামড়ে ধরল। যাকে বলে এতোলবেতোল বিরহ। গলার কাছটা টনটন করে যেমন করে মনে পড়লে, ওই রকম। এক্ষুনি যেতে হবে, এই এখনই- পরের মোড়টায় পেরিয়েই ট্যাক্সিকে বলতে হবে, দাদা ঘুরিয়ে নিন…

খুব বেশি তো যাইনি ওখানে, কিন্তু কী আশ্চর্য মায়া দোকানটায়। অনেক পুরোনো দোকান৷ চাকচিক্য নেই। রেস্তোরাঁ নয়, বড়ো ইটারি বলা চলে। সক্কাল থেকে রাত অবধি খোলা৷ ঢেউয়ের মতো মানুষ আসছে আর যাচ্ছে। হরেক রকমের মানুষ। একদম গরীবগুর্বো, অটোচালক, সুর্মা আঁকা চোখ, ধ্যাবড়া সিঁদুর, কমবয়সী প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধুমানুষ, উকিল, রাজনৈতিক কর্মী- সব্বই। সকালবেলা আমি একা গিয়ে বসতাম, চা আর পাফ নিয়ে। অকল্পনীয় কম দামে চমৎকার ডিমের বা চিকেনের পাফ, সদ্য তৈরি কুকি, কেক- এই সব মিলত তখন। বেলা বাড়লে বিরিয়ানি, মাংস, রুটি।

গ্র্যান্ড হোটেলের এগ পাফ খেতে ভালো লাগত। খবরের জন্য যাঁদের সঙ্গে দেখা করার কথা, অধিকাংশকেই ওখানে ডেকে নিতাম। মুচমুচে এগ পাফ খেতে খেতে এক প্রবীণ অ্যাক্টিভিস্ট আমায় তেলেঙ্গানা আন্দোলন আর কমিউনিস্ট কবি মকদুমের গল্প শুনিয়েছিলেন৷ মকদুমও নাকি ওই দোকানেই বসতেন তাঁর কমরেডদের সঙ্গে। আর এক বন্ধু শুনিয়েছিলেন জর্জ রেড্ডির গল্প। আরেকজনের কাছে শুনেছিলাম, পেড্ডাপল্লির গ্রাম থেকে যে পথ হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, মধ্য ভারত হয়ে আছড়ে পড়েছিল আমার বাংলার পশ্চিমপ্রান্তে, সেই পথের চড়াই উৎরাই। তর্ক করেছিলাম তাঁর সঙ্গে৷ তিক্ত তর্ক। আবারও হয়তো করব৷ কিন্তু জীবন তো এই সব তর্ক পেরিয়েই তাকাতে শেখায় শেষতক। 

বছরটা শেষ হয়ে এল। কৃষকদের জিতে যাওয়ার বছর। শীত শীত সন্ধেবেলায় বো ব্যারাকে নারকেলের প্যাটি খেতে খেতে ওই প্রবীণ বন্ধুদের কথা মনে পড়ছিল৷ এগ পাফ খাওয়ার ফাঁকে আমাকে বেঁচে থাকার পাঠ দিচ্ছিলেন তাঁরা, তাঁদের মতো করে।

মানুষের উত্তাপ ছুঁয়ে বাঁচতে পারলে বো ব্যারাকের নরম আলোর মতো ঝলমল করে প্রতিটি দিন। প্রতিটি আগামীকালকে অনন্ত সম্ভাবনাময় বলে মনে হয়।

Post Tags
Developed by DXDasia