
শশাঙ্ক কি আদৌ হত্যা করেছিলেন রাজ্যবর্ধন-কে
ভূভারতে ‘শশাঙ্ক’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই যে কোনও মানুষের মনেই ভেসে আসে সেই সার্বভৌম মহারাজের কথা, যিনি সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় পূর্ব ও উত্তর ভারতে বিরাট সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে উঠেছিলেন। মৌর্য বা গুপ্তদের বিরাটত্ব বিশিষ্ট মগধের সঙ্গে একমাত্র তুলনা হতে পারে গৌড়রাজ শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের বিশালত্বের। গৌড়রাজ শশাঙ্কের সাম্রাজ্যবাদের বিরাটত্ব তাঁর আগে বা পরেও অঙ্গ, বঙ্গ, দন্ডভূক্তি বা পুণ্ড্রবর্ধনের কোনও সম্রাটও ছুঁতে পারেননি। বাংলার প্রাচীন ইতিহাসে এক এবং অদ্বিতীয় সম্রাট, যিনি নিজের ভাগ্য নিজেই লিখেছিলেন। যাঁর সম্পর্কে আমরা প্রথম জানতে পারি রোটাসগড় আবিষ্কৃত একটি শিলমোহর থেকে, যেখানে লেখা ছিল – "শ্রীমহাসামন্ত শশাঙ্ক দেবস্য" অর্থাৎ শশাঙ্ক একজন মহাসামন্ত ছিলেন। আবার রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে মগধের অখ্যাত গুপ্তসম্রাট মহাসেন গুপ্তের পুত্র বা ভ্রাতুষ্পুত্র বলে ধারণা করেছেন। আবার কেউ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন তিনি মহাসেন গুপ্তের অধীনে একজন মহাসামন্ত ছিলেন। এ বিষয়ে সুনিদিষ্ট প্রমাণ না পাওয়া গেলেও মহাসেন গুপ্তের মৃত্যুর পর তিনি গৌড়ের সঙ্গে মগধেরও অধিপতি হন। সেই সময় শশাঙ্ক খণ্ড খণ্ড গৌড়কে একত্রিত করে বিরাট শক্তিশালী এক গৌড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার রাজধানী কর্ণসুবর্ণে স্থাপন করেন।
ভাস্কর ভর্মার 'দুবী' তাম্রফলক থেকে জানা যায়, অখণ্ড গৌড়ের অধিপতি হয়েই শশাঙ্ক প্রথম পূর্বের দেশ কামরূপ আক্রমণ করেন এবং কামরূপের ভগদত্ত বংশের রাজা সুস্থির বর্মার দুইপুত্র সুপ্রতিষ্ঠিত বর্মা ও ভাস্কর বর্মাকে পরাজিত ও বন্দি করেন। অবশ্য এর আগেও মহসেনগুপ্ত কামরূপ সুস্থিত বর্মাকে পরাজিত করেন কিন্তু রাজা সুস্থিত বর্মা আবার নিজেকে স্বাধীন কামরূপ রাজ্যকে প্রতিষ্ঠা করেন, পরে অবশ্য তা শশাঙ্কের আয়ত্তাধীন হয়, আমরা আফসাড় শিলালিপি থেকে এসব তথ্য জানতে পারি। উত্তরবঙ্গকে তিনি আগেই গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তা চোখ বুজে বলা যায়, পরে তিনি মান রাজাকে হারিয়ে বর্তমান দক্ষিণবঙ্গ বা দন্ডভুক্তিকে জয় করেন তারপরই কলিঙ্গদেশের দিকে যাত্রা করেন এবং তৎকালীন উড়িষ্যার কঙ্গোদরাজকে পরাজিত করে উড়িষ্যার চিল্কা পর্যন্ত তাঁর রাজ্যসীমানা প্রসারিত করেন।
এপ্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, শশাঙ্কের জন্মের অনেক আগে থেকেই গৌড়ের অধিকার নিয়ে প্রায়শ মগধ ও মৌখরিদের মধ্যে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলেছে। তাই মগধের গুপ্তরা নিজেদের শক্তিবর্ধনের জন্য থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশের রাজা প্রভাকর বর্ধনের সাথে তাদের কন্যার বিয়ে দেন এবং এই বিবাহের দানের ক্ষেত্রে মূল মস্তিষ্কটি ব্যবহার করেছিলেন মহাসেনগুপ্তের পিতা। এদিকে আবার মৌখরিরাজ অবন্তী বর্মার পুত্র গ্রহবর্মার সঙ্গে থানেশ্বররাজ প্রভাকরবর্ধনের নিজ কন্যা রাজশ্রীর বিয়ে দেন। এতে থানেশ্বর-মগধ-মৌখরিরা কেউ কাউকে আর আক্রমণ করে না,তারা নিজেদের মধ্যে আত্মীয়তা বজায় রাখে। এমন সময় দেবগুপ্ত মালবের রাজা হন এবং শশাঙ্ক তাঁর সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে। ইতিমধ্যে মৌখরিদের সাথে গুপ্তদের শত্রুতা শুরু হলে শশাঙ্ক তার সুযোগ তুলতে যেন তৈরিই ছিলেন। গৌড়কে অধিকারের চেষ্টায় রত মৌখরি কথা মনে পড়তেই শশাঙ্কের মন তীব্র বিষানলে ভরে উঠত তাই তিনি দেবগুপ্তের সাথে মিলিত হয়ে যৌথ বাহিনী পাঠান মৌখরিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে। ঠিক এইসময়েই প্রভাকর বর্ধনের মৃত্যু হয় এবং এই মৃত্যুর সুযোগে শশাঙ্ক মৌখরিদের রাজধানী কান্যকুব্জ পৌঁছানোর আগেই দেবগুপ্ত গ্রহবর্মাকে পরাজিত ও হত্যা করেন, তার সাথে রাজশ্রীকে বন্দী করেন। এরপরেই দেবগুপ্ত পুষ্যভূতিদের রাজধানী থানেশ্বরের দিকে অগ্রসর হন কিন্তু সেখানে তাঁর সামনে রুখে দাঁড়ান প্রভাকরবর্ধনের পুত্র রাজ্যবর্ধন। রাজ্যবর্ধনের সাথে দেবগুপ্তের বিশাল যুদ্ধতে দেবগুপ্ত নিহন হন এবং পরে শশাঙ্ক কনৌজের দিকে অগ্রসর হলে রাজ্যবর্ধনের সাথে সাক্ষাৎ হয় ও শশাঙ্ক তাঁকে হত্যা করে। তারপর আর শশাঙ্ক এগিয়ে যাননি। পুষ্যভূতিদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা হর্ষবর্ধন ও কামরূরাজ ভাস্কর বর্মা তাঁর রাজধানী আক্রমণ করতে পারে, এই শঙ্কায় তিনি সত্বর গৌড়ে ফিরে আসেন। পথে ভাস্করবর্মার দূত হংসবেগের সাথে সাক্ষাৎ ও ভাস্করবর্মার সাথে মৈত্রী স্থাপিত হলেও এই মৈত্রী বেশিদিন স্থায়ী হয়নি কারণ ভাস্করবর্মার মনে জ্বলছে তখন গৌড়রাজ শশাঙ্কের বিরুদ্ধে রোষানল এবং তাতে ঘি ঢেলে দিয়ে হর্ষবর্ধন এগিয়ে আসেন বন্ধুত্বের প্রস্তাব নিয়ে, পরে তাঁরা যৌথভাবে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দেন। এসময় হর্ষবর্ধন প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি শশাঙ্ককে হত্যা করে দাদা রাজ্যবর্ধনের হত্যার প্রতিশোধ নেবেন কিন্তু হত্যা তো দূরের কথা হর্ষবর্ধন ও ভাস্করবর্মার মিলিত বাহিনীতেও গৌড়ের বিরুদ্ধে তেমন প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেননি।
আরও পড়ুন
আটশো বছরের পুরনো বল্লাল ঢিপি
তারপরও শশাঙ্ক কিছুদিন রাজত্ব করেন কিন্তু কীভাবে তিনি মারা যান, এই তথ্য নিয়ে ঐতিহাসিকরা দ্বিধাবিভক্ত। হিউয়েন সাঙের ভ্রমণবিবরণ অনুযায়ী শশাঙ্ক কনৌজ থেকে কর্ণসুবর্ণ ফেরার পথে বুদ্ধগয়াতে বৌদ্ধমন্দির ধবংস করেন, বোধিবৃক্ষ উৎপাটিত এবং বুদ্ধমূর্তি অপসারিত করেন এবং এই পাপেই নাকি তিনি কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হিউয়েন সাঙ আরও লিখেছেন তাঁর বুদ্ধগয়া আসার আগেই শশাঙ্কের মৃত্যু হয়। বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্পেও এই একই তথ্য আছে। অথচ বুদ্ধগয়া হয়ে হিউয়েন সাঙ যখন গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণে আসেন তখন তিনি কর্ণসুবর্ণের বিখ্যাত রক্তমৃত্তিকা বৌদ্ধবিহারকে দেখেছিলেন, তাঁর ভ্রমণবিবরণীতেও সে কথা –' Beside the capital was the Lo-to-wei chih monastery,a magnificent and famous establishment ", এই লো-টো-উই আসলে রক্তমৃত্তিকা বৌদ্ধবিহার, যে বৌদ্ধবিহারে দশটি সংঘরামে চার হাজারেরও বেশি বৌদ্ধসন্ন্যাসী বাস করতেন, তাহলে প্রশ্ন হল যে রাজার রাজধানীতে চার হাজার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বাস করতেন, সেই রাজাই কীভাবে বুদ্ধগয়া ধ্বংস করেন নিজের হাতে! একজন লেখকের একই বিবরণীতেই দুরকম দিক দেখে আমাদের অবাক হতে হয়। আমাদের অবাক হতে হয় হর্ষবর্ধনের সভাকবি মহাকবি বাণভট্টের কাব্যনিন্দা দেখে। কবি বাণভট্ট লিখেছেন – ''গৌড়াধিপেন মিথ্যোপচারোপচিত বিশ্বাসং মুক্তশস্ত্রমেকানিং বিশ্রদ্ধাং স্বভবন এব ভ্রাতরং ব্যাপদিতমশ্রৌবীৎ" অর্থাৎ শশাঙ্ক নিজের আবাসে নিয়ে গিয়ে রাজ্যবর্ধনকে তার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে একাকী, নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করে। হাজার বছর পরে হর্ষচরিতের টীকাকার শঙ্কর তার লেখায় জানালেন যে গুপ্তচর মারফত শশাঙ্কের কন্যার সাথে বিবাহের জন্য আমন্ত্রণ পেয়ে যখন শত্রুশিবিরে আহারে মত্ত ছিলেন তখন তাঁকে শশাঙ্ক হত্যা করে। অথচ কবি বাণভট্ট এ-কথা কোথাও বলে যাননি, তাই এই তথ্যটিও সত্য নয় বলেই ধরা হয়। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর History of Ancient Bengal গ্রন্থে অভিমত পোষণ করেছেন যে কনৌজের পথেই শশাঙ্কের সাথে রাজ্যবর্ধনের যুদ্ধ হয় এবং রাজ্যবর্ধন পরাস্ত ও নিহত হন। পরে এই তথ্যটি রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রমাপ্রসাদ চন্দ্র প্রমুখ ঐতিহাসিকরাও মেনে নেন।
দিনের শেষে আমরা এখানেই উপনীত হতে পারি যে উত্তর ভারতের দুই পরাক্রান্ত শক্তির যুগ্ম অভিযানেও যিনি অটল ছিলেন, যিনি গৌড়-বঙ্গ, উড়িষ্যা, মগধ, বারাণসী পর্যন্ত তাঁর সীমানাকে বাড়িয়ে বিরাটকায় রাজত্বের অধিকারী ছিলেন, তাঁর সম্পর্কে স্রেফ হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট এবং শুভাকাঙ্ক্ষী হিউয়েন সাঙের লেখার ভিত্তিতে বিশ্বাস রাখতে পারি না, কারণ তাঁরা দুজনেই ছিলেন গোঁড়া বৌদ্ধ অথচ শশাঙ্ক শুধুই শৈবই ছিলেন না, ছিলেন বৌদ্ধধর্মের একজন সহৃদয় শুভাকাঙ্ক্ষী, তাই তিনি যুগের পর যুগে পেরিয়েও এক ও অনন্য এবং এই অনন্যতাও ভেঙে পড়ে সাম্রাজ্যের সাথে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর। আর্যমঞ্জুশ্রী মূলকল্প অনুযায়ী শশাঙ্কের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মানব মাত্র আট মাস পাঁচদিন গৌড়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তারপর বাংলার বুকে নেমে আসে চরম অরাজকতা এবং বিশৃঙ্খলার ঢেউ আর তাতেই গৌড়দেশ ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়, যাকে আমরা মৎস্যন্যায় বলেই ইতিহাসে পরিচিত।
