আটশো বছরের পুরনো বল্লাল ঢিপি

এই ঢিপির নীচে বল্লাল সেনের আমলে নির্মিত প্রাসাদ ছিল বলে অনুমান করা হয়

বাংলায় প্রত্নতত্ত্ব শব্দটি "প্রত্নপ" ও "তৎত্ব" ধাতু দুটির সমষ্টি, যার অর্থ হল পুরাতন বিষয়ক জ্ঞান বা চর্চা। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হল ARCHAEOLOGY,  ARCHAEOLOGY শব্দটি এসেছে গ্রীক "ARCHAIA" ও"LOGOS" শব্দটি থেকে যার অর্থ বাংলার অনুরূপ হল পুরাতন বিষয়ক জ্ঞান।  

এককথায় বলতে গেলে, কোনও অতীতের পুনঃনির্মাণ করার বিজ্ঞানকেই প্রত্নতত্ত্ব বলে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ মাটির নিচে থাকা পুরানো বস্তুকে খোঁজে বের করে,  যে সমীক্ষা বা পরীক্ষা করা হয়। এবং অনেক তথ্যও জানা যায়, একেই প্রত্নতত্ত্ব বলা যেতে পারে। প্রত্নতত্ত্ব আছে বলে আমরা পুরানো দিনের কথা জানতে পারি। যাঁরা প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন তাঁদের বলে প্রত্নবিদ। আর মাটির তলা থেকে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু যেমন পোড়া মাটির পাত্র, টেরাকোটা, দেউল, মাটির মূ্র্তি, কষ্টি পাথরের মূর্তি ও বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা ইত্যাদি প্রত্নবস্তুগুলিকে সংরক্ষিত করে রাখা হয় কলিকাতা জাদুঘরে, এটি ভারতের বৃহত্তর মিউজিয়াম। এটি স্থাপিত হয় ১৮১৪ সালে। আরেকটি মিউজিয়াম রয়েছে রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। এটি স্থাপিত হয় ১৯৬২ সালে কলকাতার বেহালায়।

তবে যাইহোক ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিভিন্ন জেলায় এই রকম বহু মূল্যবান প্রত্নবস্তু পাওয়া গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ বাঁকুড়া, বীরভূম, নদীয়া, বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদ এইসব জেলাগুলিতে বহু প্রত্নতত্ত্ব ও পুরাকীর্তি সম্পদ পাওয়া গিয়েছে। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে প্রত্নবিদদের সমীক্ষার ফলে পশ্চিমবঙ্গের নানান জেলায় বিভিন্ন অঞ্চলে ঢিপি আবিষ্কার হয়েছে। এইসব ঢিপিগুলি খনন কার্য ফলে বহু মূল্যবান দ্রব্য পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি ঢিপি আবিষ্কৃত হয়েছে। যেমন :-

১, উত্তর চব্বিশ পরগনায় বেড়াচাঁপা গ্রামে অবস্থিত চন্দ্রকেতুগড়ের ধ্বংসাবশেষ, যা খনা-মিহিরের ঢিপি নামে পরিচিত
২, বর্ধমানে আউষগ্রামে অবস্থিত পাণ্ডুরাজার ঢিপি
৩, পশ্চিম মেদনীপুরে মোগলমারি। তবে এই ঢিপি "শশীসেন ঢিপি" বা "সখিসেনের" ঢিপি বলে পরিচিত। 
৪, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় আটঘরা নামক জায়গায় দমদমা ঢিপি। এটি বর্তমানে ধংসপ্রাপ্ত।
৫, নদীয়ায় বামুনপুকুরে বল্লাল সেনের ঢিপি। 

এইরকম বহু প্রত্নসমৃদ্ধ ঢিপি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে। তবে এতগুলি ঢিপির মধ্যে নদীয়া জেলার বামুনপুকুর বাজারে অবস্থিত রাজা বল্লাল সেনের ঢিপি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতত্ত্ব ক্ষেত্রস্থল।

বল্লাল সেন বাংলার সেন রাজবংশের দ্বিতীয় নৃপতি ছিলেন। তিনি ১১৬০ থেকে ১১৭৯ সাল পর্যন্ত সেনবংশের রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেনের পুত্র এবং উত্তরসূরী। রাজা বল্লাল সেন বাংলার সামাজিক সংস্কার, বিশেষ করে কৌলিন্য প্রথা প্রবর্তনকারী হিসাবে পরিচিত। তিনি সুপণ্ডিত ও লেখক ছিলেন। ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুদসাগর’ তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। বল্লাল সেন তাঁর রাজত্বের সময় বহুদূর পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। যেমন :- বরেন্দ্রভূমি,  রাঢ়, বঙ্গ, এবং মিথিলা প্রভৃতি এইসব অঞ্চলগুলি তাঁর অধীনস্থ ছিল। সেই সময়ের স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে ‘বল্লাল ঢিপি’। এটি অবস্থিত নদীয়া জেলায় বামুনপুকুর বাজারে। 

বামুনপুকুর বাজারে অর্থাৎ ভক্ত চাঁদকাজীর সমাধিস্থল থেকে পাঁচমিনিট উত্তর-পশ্চিম দিকে হাঁটলেই দেখা যাবে সুপ্রসিদ্ধ বল্লাল ঢিপি। একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, বল্লাল ঢিপির পার্শ্বস্থ একটি গোরস্থান রয়েছে। আর এই ঢিপির নীচে বল্লাল সেনের আমলে নির্মিত প্রাসাদ ছিল বলে অনুমান করা হয়। তবে বর্তমানে এটি পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন অনুসারে সংরক্ষিত করা হয়েছে। বল্লাল ঢিপি লম্বায় প্রায় চারশো ফুট ও উচ্চতায় পঁচিশ থেকে ত্রিশ ফুট। দূর থেকে দেখলে পাহাড়ের মত দেখায়। ঢিপিটি সবুজ ঘাসে মোড়া, আর চারিদিক ঘেরা রয়েছে কাঁটাতার দিয়ে।

ঢিপিতে ঢোকার সময় বড় লোহার গেটযুক্ত মূল প্রবেশদ্বার রয়েছে। এই মূল প্রবেশদ্বার থেকে দুই পা এগোলে ইঁটের সিড়ি বেয়ে ওঠা যাবে এই ঢিপির উপর। আর উপর থেকে ডানদিকে সিড়ি বেয়ে নামলে দুদিকে প্রায় ত্রিশ ফুট করে উঁচু দেওয়াল দেখা যায়। তবে এই ঢিপির উপরে বেশিরভাগই পোড়ামাটির ইট, চুন ও সুরকি দিয়ে তৈরি হয়েছে। মূল প্রবেশদ্বারে ভিতরে দিকে গেলেই, ঠিক ঢিপির সিঁড়ি ওঠতে ডানদিকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব একটি বিজ্ঞপ্তিতে নিম্নলিখিত কথাগুলি বর্ণিত রয়েছে দেখা যায় –

"সেন রাজাদের রাজা বল্লাল সেনের নামাঙ্কিত এই বৃহদাকার ঢিপিতে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ ১৯৮২-৮৩ থেকে ১৯৮৮-৮৯ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে উৎখনন পরিচালনা করে। উৎখননের দ্বারা এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে বিস্তৃত প্রাঙ্গনের মধ্যে অবস্থিত বৃহদায়তন ইটের ইমারত যার চারিদিকে ছিল উচ্চ প্রাচীর। উৎখননে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পঙ্খের মূর্তি, পোড়ামাটির মানুষ, জীবজন্তুর মূর্তি, তামা ও লোহার তৈরি নানান জিনিসপত্র, পেরেক ও নানান প্রত্নসামগ্রী। অষ্টম ও নবম শতকের ধংসপ্রাপ্ত পুরাতন স্থাপত্যকীর্তির উপর পুনঃনির্মিত এই সৌধের উপরিভাগ আনুমানিক দ্বাদশ শতকের। বিভিন্ন সময়ে মেরামত, পরিবর্তন ও সংযোজনের নিদর্শনবাহী এই স্থাপত্য দ্বাদশ শতকে একটি বিশাল দেবালয় রূপ পরিগ্রহন করে।" 

বল্লাল সেনের রচিত "অদ্ভুদসাগর" উল্লেখ অনুসারে অনুমান করা হয় যে, বল্লাল ঢিপির প্রাচীনত্ব আটশো বছরের বেশি। আবার অনেকে এটিকে প্রপিতামহ সামন্ত সেনের প্রাসাদের ধংসস্তুপ বলে মনে করেন। তবে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতে বল্লাল ঢিপি সামন্ত সেনের পৌত্র বিজয় সেনের প্রাসাদ।

যাই হোক না কেন, নদীয়ার বামুনপুকুরে এই রাজ প্রাসাদের ধংসস্তূপটি বল্লাল ঢিপি নামেই খ্যাত। এটি পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্র নামে পরিচিত।

Developed by DXDasia